কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ফিলিস্তিনের বিপন্ন মানবতা নিয়ে আর কত খেলা

ড. ফরিদুল ইসলাম [সূত্র : ইত্তেফাক, ৬ জুলাই ২০২৫]

ফিলিস্তিনের বিপন্ন মানবতা নিয়ে আর কত খেলা


কদল ক্ষুধার্ত মানুষ সারি বেঁধে চলছে খাবার এ সপ্তাহের আশালয় সুলোরও হাসরাইলের
অনুমোদিত খাদ্য বিতরণকেন্দ্র থেকেই খাবার সংগ্রহের জন্য যাচ্ছিল তারা। তাদের অপরাধ ভিড়ের মধ্যে ধরালয়ে হাঁটা। চলল মেশিনগানের গুলি, ঝরল প্রাণ। তাতে কী? তাদের অপরাধ তারা গাজাবাসী! ইসরাইলের চোখে তারা সন্ত্রাসী। তাদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের থোড়াই গ্রাহ্য করে তারা। আর তাই তো আন্তর্জাতিক আইনের চোখে গণহত্যা এবং যুদ্ধপরাধ সংঘটিত হয়েছে-এমনটা জানান দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কর্তৃক ইসরাইলের সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা নেই। একদিকে ধানে, চোখের সামলে নিজেদের বিধানের কোনো আশ্রয়স্থল গুঁড়িয়ে যেতে দেখার নির্মম দৃশ্য, মাথা গোঁজার আশ্রয়ের জন্য দিগবিদিক ছুটে চলা, আর অন্যদিকে মৃত্যু আর ক্ষুধার যুগল লড়াই-বিশ্ববাসী এমন দৃশ্য দেখছে গত পৌনে দুই বছর ধরে। মানুষের জীবন কত তাচ্ছিল্যের, গাজাবাসীর দুর্দশা না দেখলে বোঝা যায় না। ইসরাইলি বাহিনীর নির্বিচার এই গণহত্যায় এ পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে ৫৭ হাজারের বেশি মানুষ। যারা কোনোরকমে পার্শ্ববর্তী দেশে যেতে পেরেছে, তারা অন্তত শরণার্থী জীবনকে বেছে নিতে পেরেছে।

 


মধ্যে ৪২ দিনের যুদ্ধবিরতির নাটকের অবসান ঘটিয়ে আবারও পূর্ণোদ্যমে গণহত্যা শুরু, একপর্যায়ে গাজার পুরো দখল নেওয়ার বিষয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ঘোষণা, একে সমর্থন জানিয়ে গাজার পুনর্গঠনের স্বার্থে গাজা খালি করে গাজাবাসীকে আশ্রয় দিতে প্রতিবেশী দেশগুলোকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আহ্বান এবং সেই সঙ্গে গাজাকে একটি 'রিভেরা (বিলাসবহুল পর্যটনকেন্দ্র)' হিসেবে পরিণত করতে তার পরিকল্পনা-এ সবকিছুই ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রযোজনায় একটি জাতিগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার দিকটিকে নির্দেশ করে। গত ২ জুন জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, গাজার ৮৫ ভাগ এলাকা এখন ইসরাইলের সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, অবশিষ্ট এলাকাগুলোতে যেসব গাজাবাসী রয়েছে, তারা গাজা দখলমুক্ত করতে তেমন কোনো ভূমিকাই পালন করতে পারবে না।

 

 

 

 

এককথায় বলা চলে, গাজায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মিশন সফলভাবেই শেষ করতে পেরেছে। আর তাই গত ১ জুন হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে নতুন করে দুই মাসের জন্য যুদ্ধবিরতির ডাক দিয়েছেন ট্রাম্প। ট্রাম্পের এই 'যুদ্ধবিরতির ডাক' থেকে এটাই বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে তিনি যেভাবে চাইছেন সেভাবেই হচ্ছে। তিনি চাইছেন বলেই প্রথম বারের যুদ্ধবিরতি শেষে এর নবায়ন না করে ইসরাইল নতুন করে গণহত্যা শুরু করে দখলদারিত্বের অবশিষ্ট কাজ শেষ করেছে। এখন নিজেকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একজন অগ্রগামীর ভূমিকায় প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, তার ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকানদের কেউ কেউ সাম্প্রতিক ইরান-ইসরাইল যুদ্ধবিরতির কৃতিত্বের জন্য তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য প্রস্তাব করেছেন। এবার গাজায় হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধবিরতির ডাক দিয়েছেন। 'সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না'-অর্থাৎ গাজায় ইসরাইলের লক্ষ্যও পূরণ হলো এবং তিনি তাদের যুদ্ধবিরতিতে
ফিলিস্তিনের বিপন্ন মানবতা নিয়ে আর কত খেলা
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, যখন যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং উভয় পক্ষই এই বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে, এমন অবস্থায় ইসরাইলি বাহিনীর নির্মমতা যেন আরো বেড়ে গেছে। এখন থেকে, অর্থাৎ এই লেখাটি যখন লিখছি, গত ৪৮ ঘণ্টা সময়ে এই নির্বিচার হামলায় তিন শতাধিক ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে
সম্মত করাতে পেরেছেন, বিশ্বশান্তি নিয়ে কী নিষ্ঠুর প্রহসন!

 

 


এবার ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে এ সপ্তাহে ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক নির্ধারিত আছে। হামাসকে এই যুদ্ধবিরতিতে সম্মত করতে কাজ করছে মিশর ও কাতার, তিনি এই দুই দেশকে এর জন্য অভিনন্দন জানিয়েছেন। হামাসের তরফ থেকে ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রে জোরালো কোনো ধরনের অস্বীকৃতির বিষয়ে কখনো কিছু জানায়নি। তারা কেবল এটি যথার্থভাবে কার্যকরের বিষয়ে ট্রাম্পের কাছ থেকে নিশ্চয়তা চেয়েছে। তবে যে মৌলিক দাবিটিকে তারা সব সময় সামনে নিয়ে এসেছে, তা হচ্ছে গাজা থেকে ইসরাইলের সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহার করতে হবে, যা ছাড়া এই যুদ্ধবিরতির আসলে কোনো মুলাই থাকে না। কোন শর্তে এ ধরনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে, ট্রাম্প সেটা স্পষ্ট না করলেও ধারণা করা যাচ্ছে যে, হামাসের কাছে ৪৯ জন ইসরাইলের বন্দির মধ্যে এখনো জীবিত ২২ জন রয়েছে, যার ১০ জনকে ফেরত দেবে তারা, সঙ্গে ১৮ জনের মরদেহ, বিনিময়ে ইসরাইলের কারাগার থেকে একটি নির্দিষ্টসংখ্যক ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি লাভ করবেন। ধারণা করা হচ্ছে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠকের পর বিষয়টি নিয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসতে পারে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, যখন যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং উভয় পক্ষই এই বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে, এমন অবস্থায় ইসরাইলি বাহিনীর নির্মমতা যেন আরো বেড়ে গেছে। এখন থেকে, অর্থাৎ এই
লেখাটি যখন লিখছি, গত ৪৮ ঘণ্টা সময়ে এই নির্বিচার হামলায় তিন শতাধিক ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে, যাদের অনেকেই জীবন বাঁচাতে ত্রাণ সংগ্রহের জন্য যাচ্ছিলেন।

 

 


এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি কার্যকরে কতটা সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে, সংগত কারণেই প্রশ্ন থেকে যায়। এক্ষেত্রে সব পক্ষই এই বিষয়টি নিশ্চিত হতে চাচ্ছে যে, ইসরাইল যে সঠিকভাবে যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো প্রতিপালন করছে, ট্রাম্পকে এটি নিশ্চিত করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এর কতটা নিশ্চয়তা দিতে পারবেন, এটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। আমরা সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধে দেখেছি ট্রাম্পের অনেক হম্বিতম্বিকে পাত্তা না দিয়ে ইসরাইল আপন ইচ্ছায় এই যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। একপর্যায়ে ইসরাইলের ইচ্ছাকে মান্যতা দিয়ে ইরানে হামলা করতে হয়েছে তাকে। এটা থেকে অনেকটা প্রমাণিত হয়েছে, ইসরাইলের বর্তমান নেতৃত্বের ওপর ট্রাম্পের প্রচ্ছন্ন প্রভাব রয়েছে। কাজেই যে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ট্রাম্পের তরফ থেকে দেওয়া হয়েছে, সেটা আসলে ইসরাইলের প্রস্তাবকেই ট্রাম্প নিজের নামে বহন করেছেন মাত্র
ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি খুব একটা ভালো নয়।

 

 

 

প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে অনেক দিন ধরে যুদ্ধবিরোধী জনমতকে উপেক্ষা করে এই হামলা পরিচালনা করতে হচ্ছে। গাজায় হামলার ধারাবাহিকতায় ইরানে হামলা চালিয়ে তিনি নতুন মাত্রা যুক্ত করে কার্যত দেশের মানুষকে এটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, বহিঃশত্রুর হামলা থেকে তিনি দেশ এবং দেশের জনগণকে বাঁচাতে বদ্ধপরিকর, যার মধ্য দিয়ে তিনি আসলে তার
জোট সরকারের ভেতর নিজের অবস্থানকে আরো শক্ত করতে চাইছেন। হামাস, হুতি ও হিজবুল্লাহর মতো সংগঠনগুলো ইরান কর্তৃক সমর্থন এবং আশীর্বাদপুষ্ট-এটা সর্বজনবিদিত।

 

 

 

 তিনি এই সংগঠনগুলোকে উপর্যুপরি আঘাতের মধ্যমে দুর্বল করে পরবর্তীকালে ইরানে হামলা করে জনসমর্থনকে নিজের সপক্ষে টনতে চেয়েছিলেন। ইরানের প্রত্যাঘাত ইসরাইলের অভ্যন্তরে যে অভাবনীয় ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে, সেটা তার কল্পনার বাইরে ছিল। একপর্যায়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চাইলেন এবং তাদের দিয়ে ইরানে হামলা করালেন, যা থেকে এটা অনেক বেশি প্রতীয়মান হয়ে গেল যে, ইরানকে পরাস্ত করতে ইসরাইল এককভাবে সক্ষম নয়। এটা জনমতকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছে। ইরানে হামলার আগে ইসরাইলের ভেতরে যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদসভা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর ইসরাইলের অভ্যন্তরে আবার নতুন করে নেতানিয়াহু এবং যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ কর্মসূচি বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

 


বাস্তবে গাজা যুদ্ধের একটি বিরতি এবং এর মধ্য দিয়ে যুদ্ধ বন্ধ হলেই কি ফিলিস্তিনের নিরীহ মানুষের ওপর ইসরাইলের বর্বর বাহিনীর হামলা শেষ হবে কি না তার কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়ে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় আঘাত করানো, ইরানের প্রক্সিদের সাম্প্রতিক সময়গুলোতে ক্রমাগত হামলার মাধ্যমে দুর্বল করে দেওয়া, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর তাদের সামরিক সক্ষমতায় আঘাত ইত্যাদি ঘটনার মধ্য দিয়ে ইসরাইল কার্যত তাদের রাষ্ট্রের পরিধি ভবিষ্যতে আরো প্রসারিত করার ক্ষেত্রকে প্রস্তুত করেছে যুক্তরাষ্ট্রও এতে সায় দিয়েছে, কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল যত শক্তশালী হবে, তারা মনে করে এই শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক। বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে ইসরাইলের পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির মন্ত্রিসভার সদস্যরা আলোচনা করেছেন। সব দিক দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের আগ্রাসী চরিত্রের মৌলিক কোনো পরিবর্তনের
ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।

 

 

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক
বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়