কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ফিলিস্তিন সংকট ও ভূরাজনীতি

ড. মো. মোরশেদুল আলম [প্রকাশিত : জনকণ্ঠ, ২৫ অক্টোবর ২০২৫]

ফিলিস্তিন সংকট ও ভূরাজনীতি

(গতকালের পর)

 

দীর্ঘসময় ধরে চলমান ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংকট নিরসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তই ছিল দুই পক্ষের জন্য আলাদা দুটি দেশ। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে গেছে এবং এক সময়ে ইসরাইলের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক ছিল এমন কয়েকটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশ এখন ইসরাইলে সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করেছে। আবার এলো শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী আমেরিকা সবসময় দ্বিরাষ্ট্রতত্ত্বের কথা বললেও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প  ইসরাইলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে আনার পর ওই তত্ত্বের অপমৃত্যু হয়েছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্র যেদিন জেরুজালেমে তাদের দূতাবাস উদ্বোধন করেছিল, সেদিন গাজা এক রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত হয়েছিল। ইস্তানবুুলভিত্তিক বিশ্লেষক মুরাত আসলান বলেছেন, মিস্টার ট্রাম্প ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনার একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন। দ্বিরাষ্ট্রতত্ত্ব আসলে কোনো সমাধান হয়ে উঠতেই পারেনি। কারণ এখানে এক পক্ষ ডিকটেট করে। এক পক্ষ নিয়ন্ত্রণ করলে সমাধান আসে না।

 

 

 

এ তত্ত্বের যেসব শর্ত আছে সেগুলোই কার্যকর হয়নি বলে তিনি মত প্রদান করেছেন। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিরাষ্ট্রনীতির দরকার নেই বলে মন্তব্য করলেও জো বাইডেন প্রশাসন দ্বিরাষ্ট্রনীতি সমর্থন করেছিল। এর আগে হিলারি ক্লিনটন পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন বলেছিলেন যে, ইসরাইলের স্বার্থেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। হিটলারের ইহুদি নিধনের মতোই গাজায় ইসরাইলের হামলাও নিন্দনীয়। ইসরাইলিদের বর্বরতার প্রতিবাদে ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, চিলি ও কলম্বিয়া ইসারাইলের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেছে। যদিও জর্ডান ও বাহারাইন ছাড়া অন্য কোনো আরব দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করেনি। হামাস ইসরাইলকে আক্রমণ করার সঙ্গে সঙ্গে জো বাইডেন, ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো, ঋষি সুনাক ও জার্মান চ্যান্সেলর তড়িঘড়ি করে ইসরাইলে উপস্থিত হয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন।

 

 

অর্থ, অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে ইসরাইলকে সহায়তা করছে। ন্যাটোও ইসরাইলের পাশে দাঁড়িয়েছে। গাজায় সংঘর্ষ, ইসরাইলের দখলকৃত ভূমিতে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং নিরীহ মানুষের প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে। মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের চরম অভাব রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্র এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। সামরিক ঘাঁটিগুলো মূলত তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণের শক্তি। একমাত্র ইরান ও ইয়েমেন সরাসরি ফিলিস্তিনিদের সহায়তা করছে।

 

 

অথচ আরব দেশগুলোর তেল দিয়ে ইসরাইল যুদ্ধবিমান, যুদ্ধযান ও ট্যাংক পরিচালনা করছে। অথচ মুসলিম বিশে^র সংগঠন ওআইসি শুধু বিবৃতি দিয়ে দায় শেষ করে। ওআইসির অনেক সদস্য দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্যাংশনের শিকার। ওআইসি তেলের স্যাংশন দিলেই ইসরাইলের চাকা বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু ওআইসি সেটি করছে না। তুরস্ক ও আজারবাইজানের তেলের ওপর ভর করেও ইসরাইল বর্বরতা চালাচ্ছে। সৌদি আরব ও ইসরাইলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের চুক্তি রয়েছে। হামাসের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব সেই চুক্তি স্থগিত করলেও বাতিল করেনি। ন্যাটোর সদস্যভুক্ত হওয়ায় তুরস্ক ইসরাইলের ওপর তেলের নিষেধাজ্ঞা দিতে পারছে না। 

 

 


বর্তমানে ভূরাজনৈতিক বিবেচনায় মধ্যপ্রাচ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানকার সমস্যাও প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিন সংকটকে বর্তমানে জটিলভাবে দেখা হচ্ছে। জেরুজালেম মুসলিম, ইহুদি এবং খ্রিস্টান এই তিন ধর্মের মানুষের নিকট পবিত্র ভূমি হিসেবে বিবেচিত। তাই এখানকার সংঘাত কেবল রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ নয়, এটি ধর্মযুদ্ধও বটে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি ও জাতীয়তাবাদ অবধারিতভাবে জড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক দাবি নিয়ে বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চল হতে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে আসা শুরু করলে এ সংঘাত জটিল আকার ধারণ করে। রাষ্ট্রশক্তির বাইরে এই সংঘাতে শতাব্দীর পর শতাব্দী অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি, রাষ্ট্রীয় জোট, সাম্রাজ্য যুদ্ধ করেছে। এই ইস্যুতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পরিবর্তন হয়নি, এমনকি নিকট অতীতে অনেক প্রভাবশালী দেশের রাজনৈতিক সরকারের পতনও হয়েছে। মানব ইতিহাসে সাম্রাজ্যের পর সাম্রাজ্য এসেছে। রোমান সাম্রাজ্য থেকে অটোমন সাম্রাজ্য সব সাম্রাজ্যেরই লক্ষ্য ছিল জেরুজালেম ও আল-আকসাকে নিয়ে।

 

 

ধর্ম ও রাজনীতির বাইরেও ভূমধ্যসাগরের তীরের এই ভূখণ্ডটির বাণিজ্যিক ও পূর্ব-পশ্চিম যোগাযোগ তৈরির গুরুত্ব রয়েছে। ফলে বিশ^ মোড়ল হিসেবে আগে ব্রিটিশরা এবং বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটির ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে সর্বদাই তৎপর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অতীতের মতো আবারও ইসরাইলকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করবে। আমেরিকা ইতোমধ্যেই অস্ত্র এবং যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়ে ইসরাইলের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স যারা সব সময় যুদ্ধ বাধানোর জন্য সচেষ্ট থাকে, তারাও একটি সুযোগ পেয়ে গেল। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট কমানোর ব্যাপারে অনেক কথা উঠেছিল। এখন মিলিটারি বাজেট কমানোর পরিবর্তে আরও বেড়ে যেতে পারে।

 

 

 বিশে^র বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র দেশ। তবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে দেশটি। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে সৌদি আরবের প্রতিবেশী আরব আমিরাত এবং বাহরাইন ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এছাড়া মরক্কো এবং সুদানও ইসরাইলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্থাপন করে। আরব বিশে^র অন্য দেশগুলো যেটিকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বিশ^াসঘাতকতা হিসেবে বিবেচনা করে।

 

 


উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন হামাসকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করতে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। পুতিন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। রাশিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভায় ঘোষণা দিয়েছে যে, দখলদার ইসরাইলের আত্মরক্ষার কোনো অধিকার নেই। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরাপত্তা পরিষদকে অবশ্যই রক্ষপাত বন্ধ এবং শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর উদ্যেগ গ্রহণের আহ্বান জানায় রাশিয়া। ইয়েমেনের সশস্ত্র গ্রুপ হুতি এক হাজার মাইল দূর থেকে ইসরাইলকে লক্ষ করে অনেক আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

 

 

সৌদি আরবের আকাশসীমা অতিক্রম করে ইসরাইলকে আঘাত করার নিশানা ছিল। কিন্তু সৌদি আরব মাঝপথে তাদের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। হুতিরা মার্কিনিদের সমুদ্রে ভাসমান ক্যান্টনমেন্টের দিকে তাক করেও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। কিন্তু সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা সেগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। মার্কিনিরা ইসরাইলকে রক্ষা করার জন্য তাদের বৃহৎ রণতরীগুলো দিয়ে আরব দেশগুলোকে ঘেরাও করে রেখেছে। আরব দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ এবং অবিশ^াসের কারণে ইসরাইল ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র পরিবর্তনে সফলতা লাভ করতে পারে। ইতোপূর্বে পাঁচবার ইসরাইল যুদ্ধ করেছে। প্রতিবারেই সমুদ্রে ভাসমান মার্কিন ক্যান্টনমেন্টের সহায়তায় ইসরাইল জিতেছে।

 

 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতি বছর ৩.২ বিলিয়ন ডলার ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা প্রদান করে। গাজা উপত্যকায় ২০১৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এক বছরে ইসরাইলের জন্য কমপক্ষে ১,৭৯০ কোটি ডলার পরিমাণ সামরিক সহায়তা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ন্যাটো গঠন করে পশ্চিমা বিশ^ এবং তাদের মিত্ররা সমগ্র বিশ^ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আরব দেশগুলোর সরকার ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা চায় না। কারণ ফিলিস্তিনিরা স্বাধীন হলে মধ্যপ্রাচ্যে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ হতে পারে। তেল সম্পদের সিংহভাগ মুসলমানদের হাতে রয়েছে।

 

 

ন্যাটোর আদলে বিশ^ মুসলিম নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত হলে মুসলমানরা হয়তো এমন নির্যাতিত হতো না। ১৯৪৮ সালে অবৈধভাবে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে শান্তি তিরোহিত হয়েছে। ইরান, সৌদি আরব, মিসর, জর্ডান, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতারসহ বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে আরব প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে। এতে ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছিল ইসরাইল এবং তাকে সার্বিক সাহায্য-সহযোগিতা ও সামরিকভাবে মদদ দিয়ে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব, ইরান, আরব আমিরাত এমনকি রাশিয়াও জ¦ালানি সরবরাহের ব্যাপারে এখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

 

 

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এই পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলেছে। এই অবস্থায় চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে নতুন পর্যায়ে সমঝোতা এবং সম্পর্ক স্থাপন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের ফলপ্রসূ কূটনৈতিক পদক্ষেপের কারণে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে সৌদি আরব, ইরান, মিসর, জর্দান ও আমিরাতের মতো পরস্পরবিরোধী আরব রাষ্ট্রগুলো। সৌদি আরব ও আমিরাত তুরস্কের সঙ্গে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। যাতে যৌথ উদ্যোগে উৎপাদিত হবে আধুনিক ড্রোনসহ বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র। তুরস্ক তৈরি করছে বিভিন্ন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে রাশিয়া ভূ-কৌশলগত কারণে বিশেষভাবে সহযোগিতা করছে। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বেড়ে গেছে। গাজার প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস ও লেবাননের গেরিলা বাহিনী হিজবুল্লাহ ইরানের প্রযুক্তিতে গড়ে তুলেছে বিভিন্ন পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সম্ভার। 

 

 

 


আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইহুদিবাদ কোনো ধর্মীয় বিষয় নয়। এটি ইসরাইলের একটি কর্তৃবাদী বিশেষ গোষ্ঠীর বিশ^ব্যাপী প্রভাব-প্রতিপত্তি কিংবা আধিপত্য বিস্তারের একটি রাজনৈতিক, সামরিক কৌশল বা মতবাদ। এ ব্যাপারে বাধাগ্রস্ত হলে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্রদেরও অগ্রাহ্য করতে দ্বিধাবোধ করবে না। তাই ইসরাইলের স্বৈরশাসক বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গণতান্ত্রিক ও মানবিক সব রীতিনীতি কিংবা আদর্শ ভুলে এখন ইহুদি ধর্মের প্রাচীন গ্রন্থ থেকে মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে বলতে শুরু করেছেন, ‘একদিন তাঁরা সমগ্র বিশে^র ওপর তাঁদের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবেন।’ এক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অগ্রাধিকার হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের জর্দান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বর্ধিত করা।

 

এদিকে সৌদি আরব-ইসরাইল শান্তি পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। ইরান-সৌদি আরবের সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। চীন সেখানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়েছে। চীনের যে আঞ্চলিক আঁতাতের চেষ্টা, তার গুরুত্ব বেড়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় তার যে জিরো পলিটিক্স, সেটাও অনেক বদলে গেছে। অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায়র ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে অগ্রাধিকার, তা কিছুটা কমে যাচ্ছিল। আর সেই সুযোগটা চীন গ্রহণ করেছিল। চীন এই গালফের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক খুব ভালো করতে শুরু করল, শান্তি স্থাপন করল এবং সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে বোঝাপড়ার ব্যপারে একটা ভূমিকা নিতে শুরু করল। চীনের মধ্যস্থতায় এখন ইরান ও সৌদির পুনর্মিলন, এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুখবর নয়। সৌদি আরব এবং আমিরাত তারা যুক্তরাষ্ট্রের যে স্যাংশন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যে নিষেধাজ্ঞা, তাতে সামিল হয়নি। সৌদি আরব ওপেক ছাড়াও মস্কোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করেছে।

 

 

ওয়াশিংটনের পরামর্শ সেখানে তারা মানেনি। চীন গালফ এলাকায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে। ইসরাইল ফিলিস্তিনের সংঘাতে ভারতের অবস্থান হলো, বৃহৎ শান্তির স্ফটিকে ভারত বিষয়টা দেখতে চায় এবং পশ্চিম এশিয়ায় স্থায়িত্ব চায়। সেই কারণে পশ্চিম এশিয়ার অনেক রাষ্ট্র হামাস ও হিজবুল্লাহকে সমর্থন করে। ভারত এক্ষেত্রে টু স্টেট সলিউশনের পক্ষে। একটা স্বাধীন-সার্বভৌম কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন হোক, ভারত সেটা চায়। ট্রাম্প দ্বিতীয় বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইসরাইলপন্থি ও সাবেক গভর্নর মাইক হাকাবিকে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত এবং ব্যবসায়ী স্টিভেন উইটফকে মধ্যপ্রাচ্যের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। আল জাজিরা জানিয়েছে, ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আরকানসাসের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হাকাবি সবসময় ইসরাইলকে সমর্থন দিয়েছেন। প্রায় সময় তিনি ইসরাইলি অধিগ্রহণ, বসতির প্রসঙ্গ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। ২০১৭ সালে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাকাবি বলেন, পশ্চিম তীর বলতে কিছু নেই। ওই জায়গার নাম জুডিয়া এবং সামাবিয়া (বাইবেল অনুযায়ী)। (অবৈধ ইসরাইলি) বসতি বলতেও কিছু নেই। সেখানে বিভিন্ন শহর, কমিউনিটি রয়েছে। অধিগ্রহণ বলতেও কিছু নেই। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প তার সাবেক কর্পোরেট আইনজীবী জেসন গ্রিনব্ল্যাটকে আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্য বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। 

 

 


মধ্যপ্রাচ্যে আলোচনার জন্য ট্রাম্প তার জামাতা এবং উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ওই সময় ইসরাইলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে স্বাক্ষরিত ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর পেছনে গ্রিনব্ল্যাট ও কুশনার মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন। সৌদি আরবের সঙ্গেও এবার একই রকম চুক্তি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসব চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের অবস্থান যেমন আরও সুসংহত হবে, তেমনি ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার প্রশ্নও একরকম বিলীন হয়ে যাবে। সমালোচকরা বলছেন, কট্টরপন্থিদের নিয়ে এটি ঘোরতর যুদ্ধবাজ প্রশাসনে রূপ নিতে পারে অচিরেই।

 

 

একটি কট্টর অবস্থান বা সামরিক হুমকি অনাকাক্সিক্ষত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে, যার মধ্যে রয়েছে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ, প্রক্সি যুদ্ধ যা ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। মিডল ইস্ট আই-এর মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক ডেভিড হার্স্টের মতে, দ্বিতীয় বার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প যেভাবে তার প্রশাসন সাজাচ্ছেন, তাতে মনে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য পুরোপুরি যুদ্ধের সব প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অথচ নির্বাচিত হওয়ার আগে ট্রাম্প বারবার দাবি করেছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ হতো না।

 

 

‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ তথা ‘শতকীয় সমঝোতা’য় ট্রাম্প বৃহৎ ইসরাইল প্রকল্পের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। প্রস্তাবিত সমঝোতায় লেবানন, জর্ডান, সিরিয়া ও ইরাকে বা অন্য দেশে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের নাগরিকত্ব দিতে বলা হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকারের দাবিকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকার অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের অস্ত্র, সমর্থন এবং সুরক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে এই ধারণাকে বাস্তব রূপ দিতে চাইছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই ফিলিস্তিন সংকটের মূল কারণ খুঁজে বের করে তার সমাধানসহ ইসরাইলি আগ্রাসনের অবসানে সত্যিকারের প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।

 

 

 

ইসরাইল যাতে সকল আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইন এবং জাতিসংঘ রেজুলেশনসহ ২৩৩৪ (২০১৬) সংশ্লিষ্ট অন্যান্য জাতিসংঘ রেজুলেশন প্রতিপালন করতে সম্মত হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। ফিলিস্তিন প্রশ্নে জাতিসংঘে দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা চলমান থাকার অর্থ হচ্ছে ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতার একটি অনুস্বাক্ষর। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে তার ন্যায্য স্থান প্রদানসহ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে ফিলিস্তিন সমস্যার একটি ন্যায়সংগত, দীর্ঘস্থায়ী, ব্যাপকভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিতে কাজ করার জন্য আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে। জাতিসংঘের এবারের ৭৯ তম সাধারণ অধিবেশনে বিশ^ নেতাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল গাজা-ইসরাইল-লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু। 

 


গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর থেকে গত এক বছরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চরমে পৌঁছেছে। গাজা-ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ গত প্রায় দুই বছরে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফিলিস্তিনিদের পক্ষে হুতি বিদ্রোহীদের ছায়া যুদ্ধে প্রভাব পড়েছে বিশ^বাণিজ্যে। সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের মহাসচিবকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানালেও আন্তোনি গুতেরেসের আলোচনা সীমাবদ্ধ সংকটেই। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মধ্যপ্রাচ্য প্রসঙ্গটি বারবার উঠে আসলেও এখনো স্থায়ী কোনো সমাধানে পৌঁছা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনি গুতেরেস বলেন, গাজার সংকট সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের শান্তিকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

 

 

এখন লেবাননও একই অবস্থার দিকে যাচ্ছে। তবে ফিলিস্তিন সমস্যাটি জিইয়ে রাখার সবচেয়ে বড় দায়ভার হচ্ছে ইসরাইলের। কেননা সমস্যাটি রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে ইসরাইল সব সময়ই সামরিক সমাধানের পথ বেছে নিয়েছে। ফিলিস্তিন সমস্যা একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সংকট; যা বছরের পর বছর ধরে বৈশি^ক রাজনীতি এবং মানবাধিকার ইস্যুর কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ইসরাইলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ফিলিস্তিনিদের দ্বন্দ্বের ফলে সৃষ্টি হওয়া রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট আজও সমাধানের অপেক্ষায়।

 

 

ইসরাইলি দখলদার বাহিনী কর্তৃক বাড়িঘর ও অবকাঠামো ভেঙে ফেলা, দখল, বহিষ্কার জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং ফিলিস্তিনিদের রক্তপাত ঘটানোর কারণে ইসরাইল অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পরিস্থিতি অবনতির দিকেই যাচ্ছে। ইসরাইলের এমন কর্মকাণ্ড জাতিসংঘ রেজুলেশন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মানবিক আইনের প্রতি সুস্পষ্ট অবজ্ঞা প্রদর্শন। ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী দ্বিজাতি সমাধান কাঠামোর আওতায় পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন, কার্যকর ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সংগত অধিকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমর্থন দিতে হবে। ফিলিস্তিনের বর্তমান যে বাস্তবতা তা শুধু আরব কিংবা মুসলমানদের জন্যই নয়; বরং সমগ্র মানবজাতির জন্যই শঙ্কা ও উদ্বেগের। তাই দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই ও স্থায়ী শান্তি আনতে পারে। জাতিসংঘসহ সকল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং সম্প্রদায়ের সকলকে এর যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। ফিলিস্তিনি আরবদের পূর্বনির্ধারিত কিংবা জাতিসংঘ স্বীকৃত স্থানে পৃথক রাষ্ট্র গঠনে ইসরাইলকে সম্মত হতে হবে। এজন্য বিশ^ সম্প্রদায়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি, ওআইসি, আরব লীগ ও মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সম্মিলিতভাবে প্রয়োজনে ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।     (সমাপ্ত)

লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়