কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ফিলিস্তিন সংকট ও ভূরাজনীতি

ড. মো. মোরশেদুল আলম [সূত্র : জনকণ্ঠ, ২৪ অক্টোবর ২০২৫]

ফিলিস্তিন সংকট ও ভূরাজনীতি

ফিলিস্তিন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় একটি ছোট আয়তনের দেশ। ফিলিস্তিন ভূমির পূর্ব সীমানা হলো জর্ডান নদীর পূর্ব তীর। উত্তরে রয়েছে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যবর্তী সীমান্ত। পশ্চিম ভূমধ্যসাগর (গাজা উপকূলসহ) ও দক্ষিণে রয়েছে নেগেভ, যা আকাবা উপসাগর পর্যন্ত বর্ধিত আছে। আয়তনে ছোট হলেও ফিলিস্তিনের গুরুত্ব অপরিসীম। এটির ভেতর দিয়ে মিসর থেকে সিরিয়া পর্যন্ত সড়ক অতিক্রম করেছে। আবার ভূমধ্যসাগর থেকে জর্ডান নদীর অপরাংশের পার্বত্য এলাকা পর্যন্ত যোগাযোগের মাধ্যমও এই ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। অঞ্চলটির কিছু অংশ ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানদের নিকট তীর্থস্থান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। জেরুজালেম শহরের ইতিহাস প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বছরের পুরনো।

 

 

মুসলমান, খ্রিস্টান ও ইহুদি এই তিন ধর্মাবলম্বীদের জন্যই পবিত্র জেরুজালেম শহর বিখ্যাত। খ্রিস্টানদের জন্য ‘হলি সেপুলচার’, ইহুদিদের জন্য ‘ওয়েস্টার্ন ওয়াল’ এবং মুসলমানদের জন্য ‘আল আকসা মসজিদ’ এখানেই অবস্থিত। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য যে ধর্মীয় এলাকা রয়েছে, তার মাঝে রয়েছে হলি সেপুলচার ও কালভারি; যেখানে যিশুকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল।  'The Empty Tomb' যেখানে যিশুকে কবর দেয়া হয়েছিল। ইহুদিদের জন্য পবিত্র স্থান ওয়েস্টার্ন ওয়াল-এ রয়েছে টেম্পল মাউন্ট; যা ইহুদিদের ধর্মীয় স্থান। মুসলমানদের জন্য রয়েছে আল আকসা মসজিদ, যা মুসলমানদের জন্য তৃতীয় ধর্মীয় স্থান হিসেবে বিবেচিত।

 

মুসলিম অধ্যুষিত ফিলিস্তিন এলাকায় ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের জন্মের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকট জটিল আকার ধারণ করে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন অঞ্চল দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তারপর যে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, আজও তা শেষ হয়নি। এরপর গত সাত দশকে ফিলিস্তিনের ৯৫ শতাংশ এলাকা দখল করেছে জায়ানবাদী রাষ্ট্রটি। বর্তমান ফিলিস্তিন বলতে গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরকে বোঝানো হয়। ইসরাইল গাজায় হামলা চালাচ্ছে। এরপর লেবাননেও সামরিক আগ্রাসন শুরু করেছে। 

 


এক বছরের বেশি সময় ধরে ইসরাইলের নির্বিচার হামলায় গাজার বড় অংশই বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছে। ইসরাইলের বর্তমান সরকার ও সেনাবাহিনী সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইউরোপীয়দের সমর্থন ও প্রকাশ্য মদদে যা করছে; তার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। নিউইয়র্ক, লন্ডন, বার্লিনের মতো নগরীসহ বিশ^ব্যাপী শান্তিকামী মানুষ ইসরাইলিদের এই গণহত্যা বন্ধ করার জন্য চাপ দিয়েছে। যদিও এ ব্যাপারে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরব লীগ কিংবা ওআইসির গুরুত্ব ও কার্যকারিতা সম্পূর্ণভাবে অকার্যকর বলে মনে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্সের আধিপত্যের কারণে চলমান এই সংঘাত এখন সম্ভাব্য তৃতীয় বিশ^যুদ্ধের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রকল্প (ইউএনডিপি) প্রদত্ত তথ্যানুসারে, যুদ্ধে গাজার ধ্বংস হওয়া বাড়িগুলোর ধ্বংসাবশেষ সরাতেই ১৫ বছর তথা ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। যুদ্ধনীতির অংশ হিসেবেই ইসরাইল এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে থাক; যা ‘দাহিয়া ডকট্রিন’ হিসেবে পরিচিত। ইসরাইল এই কুখ্যাত যুদ্ধনীতি লেবাননেও প্রয়োগ করেছিল। ইতোমধ্যে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং দেশটির রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ উপকণ্ঠের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে ইসরাইল।

 

 
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা এবং লেবাননে ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধ মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ইসরাইল বারবার মধ্যপ্রাচ্যে ত্রাসের সঞ্চার করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরাইলি আগ্রাসন রোধে ব্যর্থ হয়েছে। জাতিসংঘ বহুবারই ইসরাইলকে ‘যুদ্ধ অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপের নিকট মাথা নত করেছে আন্তর্জাতিক এই সংগঠনটি। পশ্চিম এশিয়াতে চলমান এই অশান্তির দুর্ভাগ্যজনক শিকার ফিলিস্তিনের আরব অধিবাসীরা।

 

 

 নিজ বাসভূম থেকে তাদের বলপূর্বক উচ্ছেদ করে ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা আন্তর্জাতিক অনুমোদন পেয়েছিল। ফিলিস্তিেিনর শরণার্থীদের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তাভাবনা করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গোষ্ঠী। বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরগুলোর ওপর ইসরাইলে বিধ্বংসী আক্রমণের সময় নীরব দর্শকের ভূমিকায় থেকেছে বিশে^র বৃহৎ শক্তিবর্গ। তার ওপর মাঝে মধ্যেই আরব রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থপর আচরণ ও তাদের মধ্যকার অনৈক্য ফিলিস্তিনের সংকট আরও জটিল করে তুলছে। ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্বের মাত্রা ও গভীরতা অনেক বেশি। অনেকটা এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করেই পশ্চিমা তাত্ত্বিকরা বিশেষ করে হানটিংটন তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’ উপস্থাপন করেছিলেন। ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ হয়েছিল।

 

 

যদিও যুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো হেরে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চুক্তি করে কোনো কোনো আরব রাষ্ট্র বিশেষ করে মিসর তার হারানো জমি ফিরে পেলেও, এখনো মূল সমস্যা তথা স্বাধীন একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হয়নি। ফিলিস্তিন সংকট একটি সহজ উচ্চারিত অথচ অত্যন্ত জটিল মানবিক সমস্যা। এই সংকটের মূল কথা হলো একই ভূখণ্ডের ওপর আরব ও ইহুদিদের দাবি এবং পরিণামে আরব জাতীয়তাবাদ ও ইহুদি জাতীয়তাবাদের মধ্যে সংঘাত। ১৯১৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ব্রিটিশ জায়ানিস্ট ফেডারেশনের সভাপতি লর্ড রথসচাইল্ডকে প্রদত্ত একটি চিঠিতে ইহুদিদের জন্য একটি আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উল্লেখ করেন; যা ইতিহাসে বেলফোর ঘোষণা হিসেবে পরিচিত। ১৯২২ সালে লিগ অব নেশনসের সভায় ব্রিটেনকে প্যালেস্টাইনের ম্যান্ডেট প্রদান করা হয়। বেলফোর ঘোষণার পরপরই ইউরোপ-আমেরিকা থেকে ইহুদিরা ব্যাপক হারে ফিলিস্তিনে এসে বসতি স্থাপন শুরু করে। ফিলিস্তিনিরা ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি করেছিল। কিন্তু বৃহৎ শক্তিগুলো তাদের সে দাবি প্রত্যাখ্যান করে। জাতিসংঘ কর্তৃক ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত আরব এলাকা বিভক্তির মধ্য দিয়ে যে বৈরিতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখনো অবসান হয়নি।

 

 

 একদিকে জাতিসংঘের প্রতিনিধিবর্গ বিভক্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন, অন্যদিকে বেনগুরিয়ান এবং ফিলিস্তিনের ইহুদি রাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্সিল ১৯৪৮ সালের ১৪ মে তেলআবিবে মিলিত হয় ও ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করে। কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান নতুন রাষ্ট্রের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির কথা ঘোষণা করেন। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের অবসানের পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি গঠিত হওয়ার পরই সদস্য রাষ্ট্রগুলো মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের বিধ্বংসী পরিণতি এবং জার্মানি, ইতালি, স্পেন ইত্যাদি দেশে ফ্যাসিবাদী কার্যকলাপ বিশে^র বিভিন্ন দেশকে আতঙ্কিত করেছিল; যা মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে তাদের সচেতন করে তুলেছিল।

 

 

 অথচ ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিসে জাতিসংঘের সাধারণ সভা মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি সনদ প্রকাশ করে; যা মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা নামে পরিচিত। প্রাথমিকভাবে এই সনদে ৩০টি ধারা থাকলেও পরবর্তী সময়ে আরও অনেকগুলো ধারা এই সনদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের বিভিন্ন ধারায় স্বাধীনতা, সাম্য ও মর্যাদা সহকারে বাঁচার অধিকার, নিরাপত্তার অধিকার, দাসত্ব থেকে মুক্তির অধিকার, স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার, শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার প্রভৃতি অধিকারের কথা বলা হয়েছিল। তাছাড়া বিভিন্ন জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, অন্যদেশের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অধিকার ইত্যাদিও সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক এই সংগঠনটি ফিলিস্তিনের নাগরিকদের মানবিক সংকট সমাধানে কার্যকর ও স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
ইহুদিদের ফিলিস্তিন আগ্রাসনের শুরুটা হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধ্ব থেকে।

 

 

 মূলত এই সময়টাতেই ইউরোপে অ্যান্টি-সেমিটিজম তথা ইহুদবিদ্বেষ দানা বাঁধতে শুরু করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ইহুদিরা নিজেদের জন্য একটি রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করে। প্রায় সহস্র বছর ধরে বিশে^র বিভিন্ন স্থান থেকে ইহুদিরা বিতাড়িত ও ক্ষেত্রবিশেষে নির্যাতিত হলেও অ্যান্টি-সেমিটিজমের উত্থানের যুগে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের কোনো অধিকার ছিল না। কিন্তু নেপোলিয়ানের ভ্রষ্ট ও আগ্রাসী নীতির অনুসারী ব্রিটিশদের সহায়তায় ইহুদিরা দ্রুতই ফিলিস্তিনে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে। ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ইহুদিদের সহায়তার মূল কারণ ছিল উসমানি খিলাফতের অধীনে থাকা ভূখণ্ডের ভাগ-বাটোয়ারা সম্পন্ন করার সময় মিসরকে নিরস্ত্র রাখা। ১৯৩৩ সালে হিটলারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ইহুদিরা পরিকল্পিতভাবে উপনিবেশের কাজ চালিয়ে গিয়েছিল। ১৯৩২-১৯৪৫ সালের মধ্যে ইহুদিদের বসতি স্থাপনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

 

 

 দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর ব্রিটেনের পরিবর্তে পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। বেলফোর ঘোষণা, পরবর্তী সময়ে জাতিপুঞ্জে এর অনুমোদন এবং মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা আরব ও ইহুদিবাদী এই দুই জাতীয়তাবাদের মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূত্রপাত হয়। ফিলিস্তিন সংকটের মূলে ছিল ইসরাইল রাষ্ট্রের সৃষ্টি এবং সমান্তরালভাবে ফিলিস্তিন সমস্যার যৌক্তিক সমাধান না করে ব্রিটেনের পলায়নপর মনোবৃত্তি। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে সমস্যার প্রারম্ভিক দৃষ্টিভঙ্গি দুইটি। একটি ইসরাইলের পক্ষে এবং আরেকটি ফিলিস্তিনিদের বিপক্ষে। ইসরাইলের যুক্তি এটি তাদের বাইবেল প্রতিশ্রুত রাষ্ট্র যা নিজ প্রয়োজনে তাদের সংঘবদ্ধতা, আলিয়া এবং জমি ক্রয়ের মাধ্যমে তৈরি করেছে। অপরদিকে ফিলিস্তিনিদের যুক্তি হচ্ছে এটি গত প্রায় তেরোশ বছর যাবৎ তাদের অধীনে এবং তা তারা দখল করেছে প্রাচ্য রোমানদের হাত থেকে। কিন্তু বর্তমানে তাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টির মাধ্যমে সমস্যা সৃষ্টি করেছে প্রথমে এককভাবে ব্রিটেন এবং পরবর্তী সময়ে সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্য শক্তি।

 

 

সোভিয়েত ইউয়নিয়নের সঙ্গে বৈরিতায় ও বর্তমান রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় পাশ্চাত্যশক্তি দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অনেকটাই সংযুক্ত বলে মনে করা হয়। প্রকৃতপক্ষে ১৯৮১ সালের ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা চুক্তি এই সম্পৃক্ততার স্বীকৃতি দেয়। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় মূল সমস্যা ছিল তিনটি। প্রথমত, ইহুদিদের চিন্তা-চেতনা ও প্যালেস্টাইনে তাদের আলিয়া বা দলীয় অভিবাসন; দ্বিতীয়ত, ব্যালফোর ঘোষণা; এবং তৃতীয়য়ত, প্যালেস্টাইনি আরবদের বিপরীতে তাদের সংঘবদ্ধতা ও ব্রিটিশ সমঝোতার প্রয়াসকে অগ্রাহ্য করে স্বাধীনতার ঘোষণা।

 


ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়ার পরপরই মিসর, জর্ডান, লেবানন ও ইরাকের সঙ্গে ইসরাইল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালেও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে মিসরের সিনাই আর সিরিয়ার গোলান উপত্যকা দখল করে নিয়েছিল। ইসরাইল ফিলিস্তিনি এলাকা গাজা ও পশ্চিম তীরও দখল করে নিয়েছিল। সেই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণাধীন পূর্ব জেরুজালেম ও সেখানে অবস্থিত আল আকসা মসজিদও ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।

 

 

১৯৭৮ সালে সম্পাদিত ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির মাধ্যমে মিসর সিনাই ফিরে পেলেও সিরিয়া তার গোলান উপত্যকা ফিরে পায়নি। বিশ^সংস্থার মাধ্যমে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের পর থেকেই আরম্ভ হয়। তবে তা সাধারণভাবে যুদ্ধবিরতি এবং প্রস্তাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। শীতল যুদ্ধকালে সাম্যবাদ ঠেকাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের ওপর প্রভাব রাখতে যুক্তরাষ্ট্রই স্থিতিশীলতা রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ব্রিটেন এবং ফ্রান্স ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারালে যুক্তরাষ্ট্র সেই স্থান পূরণ করে। তবে এতদিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মাধ্যমে অথবা দ্বিপক্ষীয় আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে তাদের স্বার্থ রক্ষায় ব্রতী হয়। কিন্তু ইসরাইল-ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র নিবিড় প্রচেষ্টা চালিয়েছে এমন উদাহরণ নেই। কারণ ইসরাইল রক্ষায় তাদের স্বার্থ আছে, কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে তা নয়।

 


১৯৮০ সালে আইন করে পূর্ব ও পশ্চিম জেরুজালেমকে ইসরাইল রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তো বটেই, খোদ জাতিসংঘও এমন সিদ্ধান্তের নিন্দা জ্ঞাপন করেছিল। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তের (সিদ্ধান্ত নং ৪৭৮, ১৯৮০) পরিপ্রেক্ষিতে ইসরাইলকে ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল। ইসরাইল কিন্তু কখনোই জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত মানেনি। একটি বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ধীরে ধীরে জেরুজালেমকে পুরোপুরি গ্রাস করতে চেয়েছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে তারা সফলও হয়েছিল।

 

এর মাধ্যমে জেরুজালেম নিয়ে যে ‘স্ট্যাটাস কো’ ছিল, তা স্পষ্টই লঙ্ঘিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, আরব ও মুসলিম বিশ^, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেউই ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেনি। আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলের ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে নমনীয় মনোভাাব পোষণ করলেও ইসরাইল কখনো তার একগুয়ে মনোভাব পরিত্যাগ করেনি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৪২ ও ৩০৮ নং প্রস্তাব অনুযায়ী, ইসরাইল অধিকৃত আরব এলাকা ফিরিয়ে দেয়ার কথা থাকলেও নিরাপত্তা পরিষদের সেই সিদ্ধান্ত ইসরাইল কখনো কার্যকর করেনি। ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসনের বিষয়ে ১৯৯৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত ওয়াশিংটন চুক্তি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।

 

 

এই শান্তিচুক্তির ফলে ইসরাইল অধিকৃত গাজা ও পশ্চিম তীরের জেরিকো শহরে সীমিত স্বায়ত্তশাসন স্বীকৃত হয়। এর আগে ১৯৯৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ইসরাইল ও পিএলও পরস্পর পরস্পরকে স্বীকৃতি প্রদান করে; এতে দীর্ঘদিনের চলমান বৈরিতার অবসান ঘটেছিল। আন্তর্জাতিক বিধি অনুযায়ী, একটি দেশ যে যে বিধি ভঙ্গ করলে তার ওপর অবরোধ আরোপ করা ন্যায়সঙ্গত বলে বিবেচিত হয়ে থাকে, ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে সেই বিধিগুলো ভঙ্গ করে আসছে। যে বিধি ভঙ্গ করার কারণে পশ্চিমা দেশগুলো ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশকে নিষেধাজ্ঞার আওতায়, সেই একই অপরাধ ইসরাইল করার পরও তার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আসেনি। শুধু তা-ই নয়, ইসরাইলের সঙ্গে এসব দেশ পূর্ণমাত্রায় কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এসব দেশের কাছ থেকে ইসরাইল সর্বাধুনিক অস্ত্র সহায়তা পাচ্ছে।

 

 

  
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তব সত্যটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখন সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসেছে। ১. স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সীমানা নির্ধারণ, ২. জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ এবং ৩. উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিদের নিজ বাসভূমে ফিরিয়ে আসা। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম শাসনামলে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুজালেমকে স্বীকৃতি দিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে দিয়েছেন। তবে বারাক ওবামা প্রশাসন দুই রাষ্ট্রের ফর্মুলা (ইসরাইল ও ফিলিস্তিন) নিয়ে কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৯৩ সালে সম্পাদিত অসলো চুক্তি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়, গাজা ভূখণ্ডে এবং জর্ডানীয় উপত্যকার জেরিকো শহরে ফিলিস্তিনিদের স্বশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। তারপর পর্যায়ক্রমে ওয়েস্ট ব্যাংক-এ ফিলিস্তিনের কর্তৃত্ব ও স্বশাসনের পরিধি বিস্তৃত হবে।

 


১৯৯৬ সালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন দক্ষিণপন্থি লিকুড পার্টি নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অসলো শান্তি প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করার যাবতীয় অপপ্রয়াস চালান তিনি। গাজা এবং বিশেষ করে ওয়েস্ট ব্যাংক থেকে ইসরাইলি সৈন্য প্রত্যাহার করার কোনো চেষ্টাই তিনি করেননি। ইসরাইলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা কোনোভাবেই একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব মেনে নিতে রাজি নয়। অসলো চুক্তি নির্ধারিত দ্বিরাষ্ট্রিক তত্ত্বকে পুরোপুরি খারিজ করাই তাদের লক্ষ্য। ইসরাইল যখনই সুযোগ পেয়েছে তখনই সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ দমনের অজুহাতে গাজা ভূখণ্ডের ওপর সামরিক আঘাত হেনেছে।

 

 

 ২০০৯, ২০১২ ও ২০১৪ সালে গাজার সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ইসরাইল বিধ্বংসী আক্রমণ চালিয়েছে। ২০০৯ সালে ইসরাইল যখন গাজা ভূখণ্ডে ঙঢ়বৎধঃরড়হ ঈধংঃ খধহফ চালায়, তখন বিভিন্ন স্তর থেকে ইসরাইলকে ‘যুদ্ধ অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু একজন ইসরাইলি সামরিক নেতাকেও দোসী সাব্যস্ত করা হয়নি। ২০১৪ সারের ৮ জুলাই গাজা ভূখণ্ড থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার অজুহাতে ইসরাইলি বাহিনী ফিলিস্তিনিদের ওপর হত্যালীলা চালায়। কিন্তু জাতিসংঘ এই গণহত্যা বন্ধ করার জন্য কোনো সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। সে সময়ের মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা ২৭ জুলাই পশ্চিম এশিয়ায় ‘তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী’ যুদ্ধ বিরতির দাবি জানান। যদিও তিনি ভালো করেই জানতেন যে, সেখানে যুদ্ধ নয়, চলছে একপেশে গণহত্যা।

 

 

 ওবামা যুদ্ধবিরতি চাইলেও তাঁর সরকার কিন্তু তখনো ইসরাইলকে অস্ত্র জোগান অব্যাহত রেখেছিল। সেই অস্ত্র দিয়েই ইসরাইল ফিলিস্তিনের সাধারণ নাগরিক, হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন সামরিক ও প্রতিরক্ষা কার্যালয় ‘পেন্টাগন’-এর এক মুখপাত্র ২০১৪ সালের ৩০ জুলাই মন্তব্য করেন, আমেরিকার জাতীয় স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য এবং প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় করার জন্য ইসরাইলের নিরাপত্তা সুদৃঢ় করতে হবে। তবে ওয়াশিংটনের ভূমিকার তিক্ত সমালোচনা করে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধি নাভি পিল্লাই বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাজার সাধারণ নাগরিকদের হত্যা করার জন্য কেবল ইসরাইলকে মরণাস্ত্র সরবরাহ করেননি, উপরন্তু ইসরাইলিদের হামাসের রকেট হামলা থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে একটি লৌহ গম্বুজ নির্মাণের জন্য অতিরিক্তি ১ মিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। অথচ ইসরাইলের আগ্রাসন থেকে ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষিত রাখার বিষয়ে তারা কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।

 


(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
লেখক : অধ্যাপক, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়