কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

দাউদ খাত্তাব [সূত্র : সমকাল, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

জাতিসংঘের বেশির ভাগ সদস্য রাষ্ট্র ১৯৬৭ সালের ৪ জুন-পূর্ববর্তী সীমান্তের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাম এ তালিকায় যুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। রোববার যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও পর্তুগাল এই স্বীকৃতি দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ ও মাল্টার সঙ্গে অ্যান্ডোরা ও মোনাকো ওই তালিকায় নাম লিখিয়েছে।  

 

 

রাষ্ট্রসত্তা অর্জনের জন্য সব শর্তই পূরণ করেছে ফিলিস্তিন। ২০১২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিপুল ভোটে দেশটি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রসত্তার সামনে এখন একমাত্র বাধা হলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের বারবার ভেটো।

 

এটা বিশেষভাবে দারুণ এক ব্যাপার যে যুক্তরাজ্য, যার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর ১৯১৭ সালে এক ‘ঘোষণা’ দিয়ে ফিলিস্তিনে ১০০ বছরের যুদ্ধ লাগিয়ে দিতে পেরেছিলেন। অবশেষে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যোগ দিয়ে ঐতিহাসিক ভুল সংশোধন করছে। ১৯৬৭ সালের সীমান্ত মেনে লন্ডনের ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি প্রদানের ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আরব নেতাদের দেওয়া তার প্রতিশ্রুতিও অবশেষে পূরণ হয়েছে। আগ্রহীরা এ জন্য ম্যাকমাহন-হুসেন পত্রালাপ বলে খ্যাত দলিলটি দেখতে পারেন। এটি ১৯১৫ ও ১৯১৬ সালে মিসরে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমাহন ও মক্কার শরিফ হুসেইন বিন আলীর পরস্পরকে লেখা ১০টি চিঠির একটি সিরিজ।

 

 

এটি সত্য, নিছক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিলে এবং ইসরায়েলি আখ্যান খণ্ডন করলেই অবৈধ ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অবসান ঘটবে না। এমনকি গাজায় চলমান গণহত্যার যুদ্ধও বন্ধ হবে না। তবে এটি একটি স্পষ্ট এবং স্থায়ী ভাষ্য তৈরি করবে– পূর্ব জেরুজালেমসহ পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকা ফিলিস্তিনি অঞ্চল এবং ফিলিস্তিনি জনগণের; গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব সেই ভূমিতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে।

 
 

ফিলিস্তিনি প্রচেষ্টার লক্ষ্য হলো আলোচনাকে ফিলিস্তিনিদের অধিকার এবং দুটি রাষ্ট্র– ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রয়োজনীয়তার দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া। ইসরায়েলি দখলদারিত্বের অধীনে থাকা ফিলিস্তিনও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ধরন, যার মধ্যে সীমান্ত, ইহুদি বসতি স্থাপনকারী, ফিলিস্তিনি শরণার্থী, পানির অধিকার এবং দুটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্রের মধ্যে অন্য সব দিক নিয়ে আলোচনা করতে পারে।

 

 

তবে ফিলিস্তিনের স্বীকৃতির গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও বিশ্ব সম্প্রদায়কে এর ধারাবাহিকতা হিসেবে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে। কঠোর প্রচেষ্টা এবং ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসাপরায়ণ, অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অপরাধমূলক যুদ্ধ বন্ধ, সব অবৈধ বসতি স্থাপনকারী কার্যক্রম স্থগিত করা, বসতি স্থাপনকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং হোয়াইট হাউসে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা ও ইসরায়েল স্বাক্ষরিত ১৯৯৩ সালের নীতিমালার ঘোষণাপত্রে প্রদত্ত বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে ইসরায়েলকে বাধ্য করতে হবে।

 

 

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দানকারী দেশগুলোকেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন করতে হবে, যার বর্তমান শান্তিপ্রিয় প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। তাঁর প্রতি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র অযথাই দানবীয় আচরণ করছে, যদিও তিনি হামাসের বিরোধিতা করেছেন এবং সাম্প্রতিক ফরাসি-সৌদি পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছেন, যেখানে হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

 

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছার আগে একটি রোডম্যাপ প্রয়োজন, যাতে দখলদার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ও আরব বাহিনী দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়; যার স্পষ্ট ম্যান্ডেট ও সময়সীমা থাকবে। একবার এটি সম্পন্ন হয়ে গেলে ফিলিস্তিনিরা গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হবে। এর মাধ্যমে শতাব্দীপ্রাচীন ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের শর্তাবলি নিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার জন্য স্পষ্ট ম্যান্ডেটধারী নেতা বেরিয়ে আসবেন।

 

 

এটি একটি দিবাস্বপ্ন বা এমনকি অসম্ভব মিশনের মতো মনে হতে পারে; কিন্তু যদি ফিলিস্তিনের স্বীকৃতির মধ্যে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি অব্যাহত থাকে, তবে এটি সম্পূর্ণরূপে সম্ভব। এ প্রক্রিয়ায় সহায়তা হিসেবে ওয়াশিংটন একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান ত্বরান্বিত করার জন্য অনেক কিছু করতে পারে।

 

 

বিশ্বশক্তিগুলোকে কেবল ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার চেয়ে আরও বেশি কিছু করতে হবে, বিশেষ করে যদি ইসরায়েল এর প্রতিশোধ হিসেবে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়, যার মধ্যে আরও ভূমি অবৈধভাবে দখলের সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ে এমন ব্যবস্থা আছে, যার আওতায় জাতিসংঘের সদস্যরা যে কোনো দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র এবং সনদের প্রতি সম্মান দেখাতে অস্বীকারকারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য ভোট দিতে পারে। এই ব্যবস্থার মধ্যে নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

 


যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দানকারী প্রথম দেশ। বহু দশক ধরে দেশটির রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় প্রশাসন দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন করছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে অনেক কিছু করতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তাঁর প্রতিনিধিকে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি প্রদানের প্রস্তাবে ভেটো না দিতে বলেন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সৎ বিশ্বাসে আলোচনা করার জন্য তাঁর প্রিয় ইসরায়েলের মিত্রদের ওপর কঠোর ভালোবাসা প্রয়োগ করেন, তাহলে তিনি অবশ্যই নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য যোগ্য হয়ে উঠবেন।

 


বিক্ষোভ এবং সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক নেতিবাচক মন্তব্য সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি সম্ভব। একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারে। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত এই দিক থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে এর পুরো ফল পেতে হলে আরও কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

দাউদ খাত্তাব: পুরস্কারপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি সাংবাদিক এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক ফেরিস অধ্যাপক