কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ফিলিস্তিন ও বৈশ্বিক কূটনীতির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ

ফয়সাল জে. আব্বাস [সূত্র : সমকাল, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ]

ফিলিস্তিন ও বৈশ্বিক কূটনীতির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ

এই সপ্তাহে নিউইয়র্ক শহরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যা ঘটেছে, তা নতুন ইতিহাস নির্মাণের চেয়ে কম কিছু নয়। এটি কোনো অতিরঞ্জিত বক্তব্য নয়, বরং এটি কূটনৈতিক, ভূরাজনৈতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে আমরা যে ক্রটি-বিচ্যুতির মুখোমুখি হয়েছি, তারই ভিত্তিতে একটি বিবৃতি। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যে গতি দেখা যাচ্ছে, তা কেবল প্রতীকী নয়, এটি বাস্তব এবং টার্টল বে-এর সীমানাও ছাড়িয়ে গেছে। 

 


হ্যাঁ, সংশয়বাদীরা যুক্তি দেবেন, গৃহীত প্রস্তাব ও প্রদত্ত বিবৃতি গাজায় রক্তপাত বন্ধ করতে পারেনি। এমনকি ইসরায়েলকে তার অবৈধ দখলদারিত্ব থেকে সরে আসতেও বাধ্য করতে পারেনি। সেই সংশয়বাদীদের উদ্দেশে আমি একটি শব্দই বলব– ‘তবুও’। কারণ, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এ প্রস্তাবের বাইরে যা ভেটো দেওয়া অব্যাহত– সাম্প্রতিক কয়েক বছরে ন্যায়বিচারের পক্ষে আমরা যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিজয়গুলো দেখেছি, তার মধ্যে এটি একটি। এটি আমাদের ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দিকে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে এবং কয়েক দশকের দায়মুক্তি থেকে এক ধাপ দূরে সরিয়ে দেয়।

 

 

এই মুহূর্তটি সৌদি কূটনীতির জন্যও উল্লেখযোগ্য অর্জন। সৌদি আরব আবারও তার ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা কাজে লাগিয়ে কল্যাণের জন্য একটি শক্তি হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা দেখিয়েছে। সৌদি আরবের নীরব কিন্তু দৃঢ় কূটনীতি একের পর এক দেশকে উৎসাহ জুগিয়েছে, যারা এখন দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে কেবল কার্যকর নয়, বরং প্রয়োজনীয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। লাতিন আমেরিকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত, ডোমিনোজ বা সমাজতন্ত্রপন্থিদের পতন ঘটছে। তাদের পক্ষে ন্যায়বিচারের সমর্থন তৈরি হচ্ছে। 

 

সৌদি আরবের নেতৃত্ব কেবল আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেই নয়, বরং শান্তির বৈশ্বিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও তার অবস্থান জোরালো করেছে। সংলাপ, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও নৈতিক স্বচ্ছতার মাধ্যমে অন্যদের রাজি করানোর ক্ষমতা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ গঠনে এর ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রমাণ। এটি গতকালের সৌদি আরব নয়। এটি এমন এক জাতি, যা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী প্রভাবশালী হিসেবে ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে। 

 

 

এই মুহূর্তে পূর্বের ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ করে কুখ্যাত সাইকস-পিকট চুক্ত স্বাক্ষরকারী ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের জন্য একই সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই জাতিগুলোর এখন একটি ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের সুযোগ সামনে এসেছে, যে কারণে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রহীন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম দুর্বিষহ জীবন পার করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ফ্রান্স নতুন করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং নিউইয়র্কে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর ছবি তোলা ও তাঁর প্রতি সমর্থন জানাতে তাঁকে থামিয়ে দেওয়া এবং অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল দেখার বিষয়। বেলফোর ঘোষণার লেখক ব্রিটেনও এতে যোগ দিয়েছে, যা তার ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের দীর্ঘমেয়াদি হিসাবনিকাশের ইঙ্গিতবহ। 

 

 

 

অবশ্য সমালোচকরা বলবেন, ইসরায়েল এখন আরও আক্রমণাত্মকভাবে প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু আসুন, যুক্তিটি উল্টে দিই। আমরা কতদিন পর্যন্ত একটি দানবকে সন্তুষ্ট করতে থাকব? এটি কোনো মতামতের বিষয় নয়; বাস্তব। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ভূমির অবৈধ দখলদার। কথা বলা ও কূটনৈতিকভাবে নীরব থাকার সময় শেষ।

 


অন্যরা যুক্তি দেবেন, হামাসও একটি দানব। কিন্তু আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, বহু আরব ও মুসলিম দেশ পিএ বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বিনিময়ে হামাসকে ক্ষমতায়িত করার পরিকল্পিত লিকুদ নীতির পরিণতি সম্পর্কে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়কেই সতর্ক করেছিল।

 

 

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া কোনোভাবেই হামাসের জন্য পুরস্কার নয়। প্রকৃতপক্ষে এটি হামাসের মূলনীতি ক্ষুণ্ন করে। এটি পিএ-এর বৈধতা এবং গুরুত্বপূর্ণভাবে ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকারের ওপর জোর দেয়। এটি একটি দ্বিগুণ আঘাত, যা মধ্যপন্থি কণ্ঠস্বরকে শক্তিশালী এবং চরমপন্থাকে দুর্বল করে।
কিছু লোক আছে যারা বলবে, বাস্তবতা দুই রাষ্ট্র সমাধানকে অসম্ভব করে তুলেছে। আমি বলি, ইতিহাসে কখনও এমন কোনো শান্তিচুক্তি হয়নি, যা দ্রুত ও সহজভাবে সম্পন্ন হয়েছে। শান্তি কঠিন। এর জন্য সাহস, আপস ও দূরদর্শিতা প্রয়োজন। তবে এটি অসম্ভব নয়। আমরা এই বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ– দুটি মানুষ শান্তি ও সমৃদ্ধিতে পাশাপাশি বসবাস করতে পারে।

 

 

পরিশেষে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যা ঘটেছে, তা কেবল একটি কূটনৈতিক মাইলফলক নয়; একটি নৈতিক জাগরণও। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতাবানরাই কেবল ইতিহাস লেখে না, বরং ক্ষমতার কাছে সত্য বলতে যারা সাহস দেখিয়েছেন এবং স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছেন, তারাও ইতিহাস রচনা করেন। 

 

 

ফয়সাল জে. আব্বাস: আরব নিউজের প্রধান সম্পাদক; আরব নিউজ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম