কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর দাবি কতখানি যৌক্তিক?

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৭ আগস্ট ২০২৫]

এলডিসি উত্তরণ পেছানোর দাবি কতখানি যৌক্তিক?

গরিব থেকে ধনী হতে সবার স্বপ্ন থাকে। সে যাত্রাতেই অনুন্নত থেকে স্বল্পোন্নত অর্থনীতির দেশ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বাংলাদেশ। সব যখন ঠিক পথেই এগোচ্ছে তখন দেশের ভেতরেই  কেউ কেউ বলছেন, এখন নয়, আরো পরে চাই এটা। কিন্তু কেন এমন বলছেন তাঁরা?

একটা ঘটনা বলি।

 


২০০৪ সালে ইউরোপ ঘুরতে ঘুরতে হাজির হয়েছি সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্ন। ইউরো ট্রেনে চাপলাম। ভেনিস যাব। মাঝরাতে কেবিনের দরজায় প্রবল ধাক্কা।

ডাককা, ডাককা করে চিৎকার। ঘুম জড়ানো চোখে দরজা খুলতেই বিশাল দেহের পুলিশ। ওদের ভাষায় পুলিত্জাই। সামনে ব্রাউন রং আমাকে দেখেই প্রশ্নে জর্জরিত করা শুরু।

 

য়ু  ফ্রম ডাককা?  পাসপোর্ট তলব। সবুজ বইটি উল্টেপাল্টে দুরবিন দিয়ে দেখে। শুরু হলো ব্যাগ তছনছ করা। জিনিসপত্র ট্রেনের কামরার মেঝেতে দিল ঢেলে। হতভম্ব আমি।

 

জিজ্ঞেস করি, কি চাও, বলো? শুধুই গাইগুঁই করে আর আমাকে সার্চ। লেদার জ্যাকেটের তলে আমার একটু কাতুকুত বেশি। তবু শক্ত চোয়াল। কত টাকা সঙ্গে? কত খরচ করেছি? কোন কোন দেশ হয়ে এই দামি ট্রেনে? প্রচণ্ড অসহায়ভাবে অন্য যাত্রীদের দিকে তাকালাম। শোবার কেবিনে অন্য বাঙ্কে একজন কোরিয়ান, একজোড়া আমেরিকান দম্পতি। তিনজনেই মিহি চোখে সব দেখে। কিন্তু চুপ। বললাম,  আমি জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ঢাকায় রাজনৈতিক উপদেষ্টা। সরকারি কাজে জার্মানি থেকে ফ্রান্স হয়ে এখানে। অনেক কথা, কাগজ দেখানো আর যুক্তির পর ছাড় পেলাম। কিন্তু পাসপোর্ট সিজ করল। কী করি ! ভেনিস থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে মেস্ত্রেই স্টেশনে নামব। খুব ভোরবেলা ট্রেন পৌঁছুবে ওখানে। পাসপোর্ট তখন ফেরত দেবে, এই মর্মে অভয় দিল। আর  ওই তিনজন পাশ ফিরল আমাকে চিড়িয়াখানার জন্তু বিবেচনায়। এদিকে টেনশনে আমার বাকি রাত নির্ঘুম।

 


এই যে এমন সব কাণ্ড, তা হলো শুধু ওদের চোখে আমরা গরিব দেশের নাগরিক। ওরা উন্নত দেশের বলেই আমাদের অপরাধী, লুটেরা ভাবে। এটি শুধু একজন আমার ক্ষেত্রে নয়। ব্যবসা, বাণিজ্য, রাজনীতি, কূটনীতি—সব ক্ষেত্রেই এই অসম্মানের ছুরি চালায়। সেই জায়গায় আমি মনে করি বাংলাদেশের দরকার নিজের গরিব পরিচয় থেকে বের হয়ে আসা। সেটি করতে হলে দরকার স্বল্পোন্নত অর্থনীতির দেশের স্ট্যাটাস লাভ। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে সরকার এবং ব্যবসায়ীদের প্রস্তুতি প্রায় আট বছর আগে শুরু হলেও এই দীর্ঘ সময় পরও প্রস্তুতির পুরোপুরি বাস্তবায়ন ঘটেনি। অনেকেই মনে করছেন, উত্তরণের জন্য আরো সময় প্রয়োজন। সরকার এবং বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন এ বিষয়ে সুরাহা চেয়ে আসছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দাবি হলো, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ছয় বছর বাড়ানোর।

 

 

সবাই জানি, এক বছর আগেও বিশ্ব অর্থনীতি ছিল তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ের বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি, শিপিং খরচ বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে রপ্তানিমুখী ব্যবসায়ীরা অনেক বেশি চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষত গার্মেন্টশিল্পে এই চাপ আরো দৃশ্যমান হয়েছে। কারণ ইউরোপ এবং অন্যান্য দেশের চাহিদা কমে গেছে। এসব পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারছেন যে তাঁদের উৎপাদনক্ষমতা এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী যে প্রস্তুতি তাঁরা নিয়েছিলেন, তা একেবারেই পর্যাপ্ত নয়।

 

 

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য সাশ্রয়ী শুল্ক সুবিধাগুলো আর থাকছে না এবং তা ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বড় সংকট হতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত দক্ষতায় পিছিয়ে থাকা। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারা জানান যে যদি আরো কিছু সময় পাওয়া যায়, তবে তাঁরা এসব খাতে উন্নতি করতে সক্ষম হবেন।

 

 

অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগ স্থবির। আওয়ামী লীগ সরকারকে হঠিয়ে দিয়েছে গণ-অভ্যুত্থানের জনতা। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায়। তিনি সামনের বছরে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার ঘোষণা দিয়েছেন। এ নিয়ে নানা দোলাচল। নির্বাচন হবে কি, হবে না। 

 

 

পরিস্থিতি বেশ জটিল। কেননা, কুটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সামাজিক স্থিতি ব্যবস্থাপনায়ও মারাত্মক সংকট দখা দেয়। উন্নয়ন যতই হোক, সমাজে বাসকারী মানুষের মাঝে যখন নৈতিকতার অবক্ষয় বৃদ্ধি পায়, লুটেরা ও দাঙ্গাকারী শ্রেণি তৎপর হয় তখন উৎপাদন খাত হতে শুরু করে প্রশাসনিক ইউনিটগুলোও নড়বড়ে হয়ে ওঠে। এমন একটি পরিস্থিতি কোনো দেশের উন্নয়নের আপাত উল্লম্ফনের জন্য কখনোই সহায়ক নয়। এই প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ী মহলও উদ্বেগে। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো, বলেছেন, ‘এলডিসি উত্তরণের সময় পেছানোর জন্য বাংলাদেশের যৌক্তিক কারণ থাকতে হবে। আট বছর সময় পাওয়ার পরও প্রস্তুত নয়, এই কারণ দেখিয়ে সময় পেছানো যাবে না। বাংলাদেশের এখন সব মনোযোগ দেওয়া উচিত মসৃণ উত্তরণ কৌশলে।’

 

 

ব্যবসায়ীরা বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, বাণিজ্য সুবিধা হারানোর আশঙ্কা, দেশীয় অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তি এবং দক্ষতায় পিছিয়ে থাকা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কথা বলে সময় বৃদ্ধির দাবি তুলছেন। অন্যদিকে এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে উত্তরণ ঘটাতে সক্ষম হয়, তবে এটি তাদের জন্য বড় ধরনের লাভ হতে পারে। প্রথমত, তাদের অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অধিক প্রতিযোগিতার সুযোগ দেবে। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সাহায্য এবং বিনিয়োগ পেতে সক্ষম হবে, যা তার অবকাঠামো এবং অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রমে সহায়তা করবে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে তাদের আরো সুযোগ তৈরি হবে, যা তাদের অর্থনীতির জন্য লাভজনক হতে পারে।

 

 

এটিও মানতে হবে, কার্যকরভাবে এই আয়োজন সম্পন্ন করতে প্রয়োজন দেশের কাঠামোগত প্রস্তুতি আরো শক্তিশালী করা। সেই সঙ্গে দরকার রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতি। সঠিক প্রস্তুতি ছাড়া এই উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য সরকারপক্ষ থেকে এলডিসি উত্তরণ পেছাতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, তবে জাতিসংঘের ইকোসক কমিটির কাছে যুক্তিসংগত কারণ তুলে ধরে আবেদন করতে হবে সরকারকে। 

 

 

কী সেই ধারা? জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (CDP) প্রতি তিন বছর অন্তর সব এলডিসি দেশের অর্থনৈতিক, মানবসম্পদ ও ভালনারেবিলিটি সূচক পর্যালোচনা করে এবং  তারা একটি দেশের উত্তরণের যোগ্যতা নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে CDP প্রথমে ২০১৮ সালে সুপারিশ করেছিল, পরে ২০২১ সালে পুনরায় নিশ্চিত করে যে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের মানদণ্ড পূরণ করেছে। CDP রিপোর্টের ভিত্তিতে ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল (ECOSOC) এবং এরপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিষয়টি পাঠানো হয়। সাধারণ পরিষদ অনুমোদন দেওয়ার পরই একটি দেশকে গ্র্যাজুয়েশন রোডম্যাপ ও ট্রানজিশন পিরিয়ড দেওয়া হয়। বাংলাদেশকে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। এই সময় পর্যন্ত গ্র্যাজুয়েশন স্ট্র্যাটেজি বাস্তবায়ন ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষ সুবিধা বজায় রাখার সুযোগ থাকবে।

 

 

এই প্রক্রিয়াটিকে পুনরায় অনুসরণ করতে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (ঈউচ) কাছে আবেদন করতে হবে, তা গৃহীত হয়, তবে বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ আরো কয়েক বছর পেছানো যেতে পারে। তবে সিডিপি বা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ থেকে এই সিদ্ধান্ত তৈরি করে আনা বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল ও দক্ষ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার প্রেক্ষিতে শক্ত চ্যালেঞ্জ।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি ও কথাসাহিত্যিক