কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় গাজা উপত্যকায় শান্তি ফিরবে?

ড. রাজিউর রহমান ও ড. মো. আবু সালেহ [সূত্র : বণিক বার্তা, ৫ নভেম্বর ২০২৫]

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় গাজা উপত্যকায় শান্তি ফিরবে?

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস বেশ পুরনো। মূলত ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোরের একটি ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় তারা ফিলিস্তিনে একটি ‘‌ইহুদি জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করে। বেলফোর এ ঘোষণা ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে, ফিলিস্তিন তথা আরব-ইসরায়েল সংকটের মূল সূত্রপাত ঘটায় এবং ফিলিস্তিনে ব্যাপক ইহুদি অভিবাসন শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ প্রস্তাব ১৮১ গ্রহণ করে, যেখানে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটভুক্ত ফিলিস্তিনকে দুটি রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রস্তাব দেয়া হয়—একটি ইহুদি রাষ্ট্র, অন্যটি আরব। আরব দেশগুলো এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

 

 

ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটার আগের দিন, অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ডেভিড বেন-গুরিয়নের (তৎকালীন ইহুদি এজেন্সির প্রধান এবং পরে ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী) ‘‌ডিক্লারেশন অব দ্য এস্টাবলিশমেন্ট অব দ্য স্টেট অব ইসরায়েল’ ঘোষণার মাধ্যমে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পার্শ্ববর্তী আরব দেশগুলো (মিসর, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও ইরাক) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, যা ‘প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধের মাধ্যমে ফিলিস্তিনের অনেক অংশ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ১৯৬৭ সালের জুনে ইসরায়েল মিসর, জর্ডান ও সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করে। সেই যুদ্ধে ইসরায়েল-পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম দখল করে জর্ডানের কাছ থেকে, গাজা উপত্যকা দখল করে মিসরের কাছ থেকে এবং গোলান মালভূমি দখল করে সিরিয়ার কাছ থেকে। ১৯৬৭ সালের এ যুদ্ধের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড পুরোপুরি ইসরায়েল দখল করে নেয়। ইসরায়েলের এ দখলদারত্ব থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ফিলিস্তিনের জনগণ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে আসছে কয়েক দশক ধরে।

 
 
 
 
 
 
 
 

শান্তি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে গাজার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়, গাজার পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ এবং ফিলিস্তানি কর্তৃপক্ষের কাছে গাজা হস্তান্তর ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়ার বিষয় প্রস্তাব করা হয়েছে। নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়ের মধ্যে রয়েছে হামাসকে নিরস্ত্র করতে হবে, সহিংস বেসামরিক কাঠামো, সামরিক অবকাঠামো, টানেল ও অস্ত্র কারখানা ধ্বংস করা হবে এবং পুনর্নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকবে।

 

 

নিরস্ত্রীকরণের এ প্রক্রিয়া স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে চলবে। গাজার নিরাপত্তা তত্ত্বাবধানে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের আরব ও অন্য সহযোগী দেশ মিলে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গাজায় মোতায়েন করা হবে এবং জনসাধারণ ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার উদ্দেশ্যে গাজায় একটি পুলিশ বাহিনী গঠন করা হবে। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী গাজার প্রশাসনে কোনোভাবেই ভূমিকা রাখবে না। গাজার পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে একটি ‘‌টেকনোক্র্যাটিক’ প্রশাসন গঠন করা হবে, যা আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে থাকবে স্থানীয় শাসন ও প্রশাসন হস্তান্তর করা হবে ধাপে ধাপে। এ প্রশাসনকে স্বশাসন দেয়া হবে, তবে প্রথমে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে। পরিকল্পনায় আরো বলা হয়েছে, হামাস অস্ত্র ছাড়লে ইসরায়েল “মান, অগ্রগতি ও সময়সীমা” বিবেচনা করে সেনা প্রত্যাহার করবে, তবে এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এছাড়া গাজা “সন্ত্রাসমুক্ত” না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল একটি ‘নিরাপত্তাবেষ্টনী’ দিয়ে রাখবে।

 

 

 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম ‘‌ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ঘোষণা করেন যে ইসরায়েল ও হামাস”আমাদের শান্তি পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে সই করেছে”এবং এটি”একটি শক্তিশালী, টেকসই ও চিরস্থায়ী শান্তির প্রথম পদক্ষেপ। এ চুক্তিকে তিনি ঐতিহাসিক সূচনা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি ইসরায়েলের পার্লামেন্টে (নেসেট) দেয়া ভাষণে বলেন, এটি”নতুন মধ্যপ্রাচ্যে একটি ঐতিহাসিক ভোর”এবং এটি কেবল যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, বরং সন্ত্রাসবাদের পতন ও শান্তির শুরু। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় হামাসের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং মধ্যস্থতাকারীদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন।

 

 

হামাস এ চুক্তির প্রথম ধাপকে স্বাগত জানালেও এর দ্বিতীয় ধাপের মূল শর্তগুলো, বিশেষ করে অস্ত্র ছেড়ে দেয়া এবং ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার শর্তে তারা আপত্তি জানিয়েছে। হামাসের আশঙ্কা, জিম্মিরা মুক্ত হওয়ার পর ইসরায়েল পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে। অন্যদিকে গাজার শান্তি চুক্তির বিষয়ে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া কিছুটা মিশ্র এবং শর্তসাপেক্ষ। ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা চুক্তির প্রথম ধাপকে (যেমন- যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তি) অনুমোদন করে। চুক্তির প্রাথমিক ধাপগুলোয় ইসরায়েল সম্মতি জানালেও এর মূল লক্ষ্য ও দীর্ঘমেয়াদি শর্ত নিয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির একটি মূল শর্ত হলো হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং গাজা উপত্যকাকে সম্পূর্ণরূপে সামরিকীকরণ মুক্ত করা। তাদের মূল লক্ষ্য হলো হামাসকে ধ্বংস করা।

 

 

এ শান্তি চুক্তির তাৎক্ষণিক প্রভাব হলো ইসরায়েলি বোমা হামলা ও সামরিক অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ায় বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানি বন্ধ হয়েছে, যা গাজাবাসীর জন্য কিছুটা স্বস্তি এনেছে। এছাড়া চুক্তির প্রথম ধাপে জিম্মি ও বন্দিদের আংশিক বিনিময় সম্ভব হয়েছে, যা তাদের পরিবারের জন্য আশার আলো নিয়ে এসেছে। ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনার শর্ত মেনে হামাস এরই মধ্যে জীবিত ২০ জন জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে এবং কিছু মৃত জিম্মির দেহাবশেষও ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করেছে। এর বিনিময়ে ইসরায়েল প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর গাজায় মানবিক সহায়তার ট্রাকের সংখ্যা বেড়েছে, ফলে খাদ্য, জল ও ওষুধের সরবরাহ কিছুটা হলেও বেড়েছে। মানুষজন সাময়িকভাবে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায় যাতায়াত করতে পারছে এবং নিজেদের বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে যেতে পারছে।

 

 

ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাবটি একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তির মাধ্যমে সংঘাতের তীব্রতা কমালেও গাজার দীর্ঘমেয়াদি শাসন, হামাসের ভবিষ্যৎ এবং ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের মতো মৌলিক বিষয়ে এটি এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা। এমতাবস্থায় এ প্রশ্নটি সহজেই উত্থাপিত হয় যে এ চুক্তি কি গাজায় স্থায়ী শান্তি আনতে সক্ষম হবে? এ প্রশ্নের জবাবে স্পষ্টতই আমরা বলতে পারি যে এ শান্তিচুক্তির মাধ্যমে গাজা ভূখণ্ডে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বিদ্যমান বাস্তবতা বেশকিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করবে।

 

 

প্রথমত, ইসরায়েলের ক্রমাগত হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, অপুষ্টি, মহামারী ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবনতির ফলে গাজায় এক চরম অমানবিক পরিবেশ বিরাজ করছে। হাজার হাজার মানুষের বাসস্থান এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। এ চুক্তির ফলে অমানবিক পরিবেশ রাতারাতি দূর করা সম্ভব হবে না। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধবিরতিটি একটি স্থায়ী সমাধান নয়, বরং একটি অত্যন্ত ভঙ্গুর চুক্তি। যেকোনো মুহূর্তে সহিংসতা পুনরায় শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে। তৃতীয়ত, উভয় পক্ষই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে এবং ইসরায়েলের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির পরও গোলাবর্ষণ ও সীমিত সামরিক অভিযানের খবর পাওয়া গেছে। চতুর্থত, চুক্তির পরও গাজার একটি বড় অংশ (প্রায় ৫৮ শতাংশ) ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকছে, যা ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে। পঞ্চমত, হামাসকে নিরস্ত্র করা এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার মতো মূল শর্তগুলোয় এখনো গভীর মতপার্থক্য বিদ্যমান। ইসরায়েল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণারও বিরোধী, যা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। এ চুক্তির ফলে হামাস ও ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের (পিএ) মধ্যে বিভেদ আরো বাড়তে পারে, যা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের পথে অন্যতম বাধা হিসেবে কাজ করবে।

 

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরার এ চুক্তির স্থায়িত্ব ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আল জাজিরার সিনিয়র রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা যুক্তি দিয়েছেন যে ট্রাম্পের পরিকল্পনা মূলত ইসরায়েলের সুবিধা রক্ষা করে তৈরি করা হয়েছে। তিনি এটিকে দশকের পর দশক ধরে চলে আসা ব্যর্থ, মার্কিন-সমর্থিত চুক্তিরই ধারাবাহিকতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায় গাজার ভবিষ্যৎ শাসন, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সময়সীমা এবং হামাসের নিরস্ত্রীকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় অস্পষ্টতা রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন।

 

 

 

 অনেকেই মনে করেন, দ্বিতীয় ধাপে হামাসের অস্ত্র সমর্পণ ও গাজা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়ার মতো শর্তগুলো ফিলিস্তিনিদের জন্য আত্মসমর্পণের সমতুল্য। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই সতর্ক করেছেন যে শুধু বন্দি বিনিময় ও ক্ষণস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে সত্যিকারের শান্তি আনবে না। ফিলিস্তিন সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এ ধরনের”শান্তির ভোর দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে চুক্তিটি অনিশ্চয়তার মধ্যে আশার আলো সঞ্চার করেছে, শান্তি চুক্তিটি একটি শুরু, কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। দীর্ঘমেয়াদি শান্তি কেবল তখনই আসবে, যখন উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানের লক্ষ্যে সক্রিয় ভূমিকা নেবে।

 

 

ড. রাজিউর রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, আইন বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

ড. মো. আবু সালেহ: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়