দোহা—আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন
কাতারের সমৃদ্ধ অর্থনীতি এবং আধুনিক নানা স্থাপনার ভিড়েও নিজেদের শিল্প-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য টিকে আছে রাজধানী দোহায়। মধ্যপ্রাচ্যের চাকচিক্যভরা এই শহর ঘুরে এসে লিখেছেন রিফায়েত রিফাত [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ০৬ অক্টোবর ২০২৫]

কখনো কখনো কর্মব্যস্ততার ভিড়ে জীবন একঘেয়ে মনে হয়। দূরে কোথাও পালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা জাগে মনে। একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস, ভিন্ন স্বাদ আর শরীর-মনে নতুন হাওয়া লাগাতে কে না চায়। এই অনুভূতি থেকেই আমার দোহা ভ্রমণের শুরু।
সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঢাকা থেকে ফ্লাইট ছাড়ল রাত ঠিক ১১টায়। আকাশের বুক চিরে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার পথ পেরিয়ে দোহায় পৌঁছলাম মাঝরাতে। হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পরই গায়ে লাগল গরম হাওয়া, তবে আরামদায়ক।
পরদিন বের হলাম খাবারের খোঁজে। বাইরের দেশে বেড়াতে গেলে সাধারণত স্থানীয় খাবার চেখে দেখার চেষ্টা করি। সেই ধারাবাহিকতায় দুপুরের খাবারে বেছে নিলাম গ্রিলড কাবাব, হুমুস আর স্যুপ।
আগেই জেনেছি, কেনাকাটার জন্য শহরের প্রাণকেন্দ্র সোক ওয়াকিফ খুব ভালো জায়গা। আমার হোটেলের কাছেই। এটি একটি প্রাচীন বাজার, যেখানে রয়েছে মসলার ঘ্রাণ, হস্তশিল্প, লণ্ঠন, সুগন্ধি আর রঙিন কাপড়ের দারুন সমাহার। বাজারের দোকানগুলোতে হাঁটতে হাঁটতে কিনে ফেললাম একটি আরবি কফি সেট, সুগন্ধি উদ আর একটি নান্দনিক মাছের অ্যাকোয়ারিয়াম। এগুলো আমার কাছে কেবল শখের জিনিস নয়, ভ্রমণের স্থায়ী স্মৃতিও। কোথাও বেড়াতে গেলে সেখানকার কিছু না কিছু কিনিই আমি।
সোক ওয়াকিফ থেকে আমার পরের গন্তব্য ইসলামিক আর্ট মিউজিয়াম। শত শত বছরের ইসলামী শিল্পকলা, হস্তলিখিত কোরআন, ধাতবকর্ম আর কাচের কারুকাজগুলো মুগ্ধ করে পর্যটকদের। সব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বের হলাম। সামনেই সমুদ্র। সমুদ্রের হাওয়ায় চোখে ভেসে উঠল দোহার উজ্জ্বল আকাশছোঁয়া সব বিল্ডিং। একদিকে আধুনিকতা, অন্যদিকে ঐতিহ্য। বিকেলে ক্যাটারা কালচারাল ভিলেজে গিয়ে থিয়েটার, আর্ট গ্যালারি আর নানা সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী উপভোগ করলাম। মনে হলো, দোহা কেবল অর্থনীতি বা স্থাপনার শহর নয়, এর ভেতরে আছে শিল্প-সংস্কৃতির গভীর আবহ।
শপিংয়ের জন্য দোহা সমৃদ্ধ এক জায়গা। সিটি সেন্টার মলে পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের শার্ট, এজদান মলে বাজেট ফ্রেন্ডলি পোশাক আর দোহা ফেস্টিভাল সিটিতে চকোলেটের গিফট সেট। তবে মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে সোক ওয়াকিফ থেকে কেনা অ্যাকোয়ারিয়াম, হস্তশিল্প আর সুগন্ধি।
আজ দোহা ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন। এবারের ভ্রমণের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত অংশ ব্যানানা আইল্যান্ড ঘুরব। সকালে ফেরিতে উঠে সমুদ্রের বুক চিরে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটে পৌঁছে গেলাম সেই ‘কলা দ্বীপে’। রাজধানী দোহার উপকূলে পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই মনুষ্য সৃষ্ট কৃত্রিম দ্বীপ। ক্রিসেন্ট আকৃতির এই জায়গাটির নাম ব্যানানা আইল্যান্ড। এখানে সাগরের ঢেউ আর ওয়াটার ভিলার পাশাপাশি চমত্কার ছুটি কাটানোর সব উপকরণই পাওয়া যায়। ফেরির মাধ্যমে বা ব্যক্তিগত ইয়টে করে দ্বীপটিতে যেতে হয়। আসার পথে ফেরির জানালা দিয়ে দোহার আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলো ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছিল। সামনে অসীম নীল সমুদ্র। এই দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। দ্বীপে পৌঁছে সমুদ্রতীরে কিছু সময় কাটালাম। দুপুরে রেস্টুরেন্টে বসে গ্রিলড সি-ফুড আর স্থানীয় কাতারি খাবার খেয়ে মনে হলো, সত্যি যেন স্বর্গে বসে আছি। বিকেলে বোর্ডিং আর বিচে হাঁটা ছিল এক প্রশান্তির মুহূর্ত। রাতে না থেকেও সকালের সূর্য আর বিকেলের সমুদ্রের বাতাসে ব্যানানা আইল্যান্ড আমাকে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা দিল।
ব্যানানা আইল্যান্ড থেকে হোটেলে ফিরে অলস কাটিয়ে দিলাম। পরের দিনের গন্তব্য সাফলিয়া দ্বীপ। দোহা উপকূলে অবস্থিত একটি ছোট, জনবসতিহীন দ্বীপ এটি। ছুটি কাটানোর জন্য এখানে আসে সবাই। এখানে নেই কোনো দোকান। যাওয়ার সময় পানি, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। ফেরিতে সমুদ্রের জলে ভেসে এলাম। বালু ও তুষার-সাদা সৈকতে পা দেওয়ার মুহূর্ত একেবারেই অন্য রকম। এখানকার পরিবেশ বেশ শান্ত, লোকজন খুব একটা নেই। বেশির ভাগ সময়ই মানুষ কেবল বিশ্রাম নিচ্ছে, বই পড়ছে অথবা সমুদ্রতীরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমি কিছুক্ষণ সৈকতের ধারে সাঁতার কাটলাম। সমুদ্রের নোনা পানিতে ভেসে থাকা, হালকা তরঙ্গের সঙ্গে শরীরের স্পর্শ—সব মিলিয়ে অসাধারণ এক অনুভূতি।
বিকেলে হোটেলে ফিরে হালকা সালাদ খেয়ে বের হলাম আল বিদ্দা পার্কের উদ্দেশে। এখানে কর্নিশ আর সমুদ্রের সংযোগ যে দৃশ্য তৈরি করে, তা চোখের সামনে এক শান্তিপূর্ণ ছবি এঁকে দেয়। পার্কের ঘাসে বসে সময় কাটাতে দারুণ লাগে। স্থানীয় লোকজন এখানে হেঁটে বেড়ায়। শিশুরা খেলে। কাছের ক্যাফে থেকে এক কাপ কফি আর এক গ্লাস তাজা জুস নিয়ে বসে গেলাম আমি। এখান থেকে দোহার আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলো দেখে মনে হয় পুরো শহর যেন আকাশের সঙ্গে মিশে গেছে।
কাতার ঘুরতে গেলে রাস্তার পাশে ছোট ছোট রেস্টুরেন্টে সি-ফুডের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। মরিচ ও লেবু মাখানো মাছ, ঝাঁজালো গ্রিলড চিংড়ি আর সামুদ্রিক স্ন্যাকসের স্বাদ আপনাকে সত্যি মুগ্ধ করবে। সঙ্গে এক গ্লাস ঠাণ্ডা লস্যি বা দইয়ের পানীয় হলে তো কথাই নেই। ভ্রমণের পুরোটা সময়ই এখানকার খাবার খেয়েছি আমি।
ভ্রমণ শেষে আমার হাতে রয়ে গেল কিছু সংগ্রহ। একটি অ্যাকোয়ারিয়াম, আরবি কফি সেট, সুগন্ধি উদ আর কিছু চকোলেট। তবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মানসিক প্রশান্তি, নতুন উদ্যম আর অনুপ্রেরণা। দোহা ঘুরে আমার উপলব্ধি, একটি শহর কেবল তার স্থাপনা বা অর্থনীতির জন্য বিখ্যাত হয় না, বরং তার ইতিহাস, সংস্কৃতি, খাবারই তাকে স্মরণীয় করে তোলে। সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, খাবারের স্বাদ আর সমুদ্রের নীল রং মিলে দোহা ভ্রমণ অতুলনীয়।