কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন রাজনীতির বার্তা

ড. মাহফুজ পারভেজ [প্রকাশ : যুগান্তর, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন রাজনীতির বার্তা

‘জেন-জি’ নামে পরিচিত তরুণদের তীব্র আন্দোলনের মুখে হিমালয়ের দেশ নেপালের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা পদত্যাগ কিংবা পালিয়ে প্রাণরক্ষা করেছেন। সহিংসতা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনায় নেপালে তরুণদের আন্দোলন সর্বাত্মক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে; একই রকম আন্দোলন আগে শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে ঘটেছে। ২০২৪ সালের জুলাই ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে আমূল বদলে দেওয়ার স্পৃহায় ভরপুর, যা রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক মডেল হিসাবে নেপালের পার্বত্যভূমিকে স্পন্দিত করেছে।

 

 

বাংলাদেশের শিক্ষা থেকে আন্দোলনের কর্মকৌশল

গবেষক অনুপম দেবাশীষ রায়ের ‘বিদ্রোহ থেকে বিপ্লব’ বইটি ২০১৮ সালের ব্যর্থ নিরাপদ সড়ক আন্দোলন ও ২০২৪ সালের সফল ছাত্র অভ্যুত্থানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, আন্দোলনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি স্মার্টকৌশল, স্পষ্ট ভাষা এবং সামাজিক মাধ্যমে সুসংগঠিত প্রচার। ছাত্রদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দেওয়া আন্দোলনের জন্য পরিণত হয় একটি নৈতিক যুদ্ধঘোষণায়। ছাত্ররা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে সরকারের বৈধতাকে নৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে।

 

 

জুলাই আন্দোলন নিয়ে রচিত প্রথম বইতে (‘Student Protest and Hasina's Downfall in Bangladesh’, আগস্ট ২০২৪, ঢাকা : স্টুডেন্ট ওয়েজে) ড. মাহফুজ পারভেজ আন্দোলনকে শাসনের পতনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করে বলেন, আওয়ামী লীগ প্রশ্নবিদ্ধ বৈধতা এবং গণতন্ত্র ও নির্বাচনব্যবস্থার অবক্ষয়ের দ্বারা নিজের সর্বাত্মক পতনকে দৃশ্যমান করেছে।

 

 

বাংলাদেশের শিক্ষায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে তরুণ প্রজন্ম ফুঁসেছে। পাকিস্তানের বেলুচ, পাঠান অঞ্চলের তারুণ্যের দ্রোহ আলোড়ন জাগিয়েছে। নেপালে সফল হয়েছে। বাংলাদেশের আন্দোলনের লেন্সে দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচার ও জনবৈষম্য স্পষ্ট হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেও জনস্বার্থে মোটেও মনোযোগী না হওয়ায় গণ-অভ্যুত্থান সৃষ্টি ছিল অবশ্যম্ভাবী।

 

 

আন্দোলনের অভিন্ন পটভূমি

সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তরুণদের মধ্য থেকে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের আওয়াজ উঠে রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার কারণে। তারা প্রবীণদের তুলনায় বেশি প্রতিবাদী, প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত, দুনিয়ার উদ্ভাবন বা ঘটনা অবগত, সচেতন, আকাক্সক্ষী এবং নিজেদের অধিকারে সোচ্চার। তরুণ প্রজন্ম চরিত্রগত এ বৈশিষ্ট্য সামাজিক মাধ্যমের সহায়তায় দ্রুত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা ও বিক্ষোভ-আন্দোলন চাঙা করতে সফল হয়।

 

 

আন্দোলন ছোট ও ক্ষুদ্র সমস্যার প্রতিক্রিয়া হলেও ক্রমশ তা বৃহত্তর আকার ধারণ করে। পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, একটি চমকপ্রদ, অভিন্ন প্রতিরোধের কাঠামো, যা গঠিত হয়েছে প্রজন্মগত পরিচয়, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ঐতিহাসিক স্মৃতির ব্যবহারের মাধ্যমে। এ উদীয়মান রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ বহুলাংশে উগ্র, সহিংস এবং রক্তাক্ত, যা একটি প্রতিরোধ মডেল রূপে একুশ শতকের দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করছে।

 

 

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে রোষের মতোই নেপালে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২৬ সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার কারণে। উভয় ক্ষেত্রেই তরুণ সমাজ নিজেদের অবদমিত মনে করে সরকারের পক্ষে তাদের অধিকার ও কণ্ঠরোধের বিরোধিতা করেছে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা প্রথাগত রাজনৈতিক কর্মী, তথা দলীয় অনুগত, শ্রমিক সংগঠক বা গ্রামীণ কর্মী ছিল না। তারা ছিল শহুরে ডিজিটালি দক্ষ তরুণ প্রজন্ম। এদের রাজনীতি করার কথা ছিল না। রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হওয়ার কথা তো ছিলই। কিন্তু তারাই হয়েছে ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র। কারণ, তারা চেতনাগত দিক থেকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও আনপ্রেডিক্টেবল। মোটেও তাদের পিতামাতার মতো নয়, যারা রাজনৈতিক পার্টি ও মতাদর্শের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করতেন। বর্তমান প্রজন্ম ও তাদের বন্ধুদের রাজনীতি গঠিত হয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে, সংকীর্ণ অর্থনৈতিক সুযোগের প্রতিবাদের মাধ্যমে। তাদের জন্য প্রতিরোধ শুধুই সংস্কারের জন্য নয়, এটি আত্মমর্যাদা, অস্তিত্ব এবং ন্যায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াই।

 

 

আন্দোলনের ডিজিটাল মাত্রা ও বাকস্বাধীনতা

 

 

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন ডিজিটাল কাহিনি বর্ণনার শক্তি প্রদর্শন করেছিল। মিম, হ্যাশট্যাগ এবং দৃশ্যাবলি, বিশেষ করে লাল রঙের ব্যবহার এবং ‘রাজাকার’ ট্যাগ, অসংগঠিত আন্দোলনকে একত্রীকৃত করেছে। অনলাইন স্থানগুলো দ্রুত সংহতি এবং রোষের বিস্তার ঘটিয়েছে।

 

 

নেপালের ক্ষেত্রে ডিজিটাল স্পেস নিজেই যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে ওঠে। সরকারের ব্যাপক সামাজিকমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা চরমভাবে ব্যর্থ হয়। টিকটক নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছিল। তরুণরা বিমূর্ত অসন্তোষকে বাস্তব কর্মে রূপান্তরিত করে কয়েক দিনের মধ্যে কাঠমান্ডুসহ অন্যান্য বড় বড় শহরের রাস্তায় নেমে আসে। সপ্তাহের মধ্যে কারফিউ জারি হয় এবং প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ব্যক্তি ও সংস্থা আক্রান্ত হতে থাকে, যেমনটি হয়েছিল বাংলাদেশেও।

 

 

উভয় ক্ষেত্রে একটি পরম্পরাগত সাজুয্য স্পষ্ট হয় : ডিজিটাল দমন, যা বিদ্রোহকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে, বরং তা যৌবনকে একত্রিত এবং উৎসাহিত করে। দমনই হয় আন্দোলনের গতিবৃদ্ধির প্রধান কারণ। বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করাও ছিল আন্দোলনকারী তরুণদের অন্যতম প্রত্যয়। ডিজিটাল যুগে বাকস্বাধীনতা হালকাভাবে নেওয়ার বিষয় নয়, বাংলাদেশ, নেপালের আন্দোলন এ সত্য প্রমাণ করেছে।

 

 

ঐতিহাসিক স্মৃতি : অতীতের মাধ্যমে বৈধতা

নেপালে ২০০৬ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্মৃতি পুনর্জীবিত হয় বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যা জনগণকে মনে করায় যে প্রতিষ্ঠিত এলিটদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব, যেমন সম্ভব হয়েছিল রাজতন্ত্রকে বিদায় করা। এ ঐতিহাসিক স্মৃতি ব্যবহার তারুণ্যের আন্দোলনকে শুধু সরকারি নীতি বিরোধের চেয়ে বড় কিছুতে রূপান্তরিত করে। এটি জাতীয় ট্র্যাজেডি এবং অতীত বিজয় থেকে শক্তি গ্রহণ করে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনের সমকালীন ধারায় অবস্থান গ্রহণ করে আন্দোলনের বৈধতা খুঁজে পায়। একইসঙ্গে অতীতকে দলীয় বা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বয়ানের বাইরে নিয়ে আসে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন ক্ষমতায় থাকার জন্য অতীতের স্মৃতি ও অর্জনকে নিজের জন্য ব্যবহারের একদেশদর্শিতা দেখায়, তরুণদের আন্দোলন তখন ঐতিহাসিক স্মৃতিকে জাতীয় স্তরে নিয়ে এসে নাগরিক ও রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণ করে।

 

 

বাংলাদেশ ও নেপাল ছাড়িয়ে : আঞ্চলিক ধারা

দক্ষিণ এশিয়ার এ আন্দোলনগুলোকে আলাদাভাবে দেখা হলে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট আর বোঝা যায় না। দক্ষিণ এশিয়ায় গত পাঁচ বছরে একাধিক ছাত্র-যুব-নেতৃত্বাধীন আন্দোলন দেখা গেছে। যেমন-শ্রীলংকায় ২০২২ সালের ‘অরাগালয়া’ আন্দোলন, যা প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসেকে পালাতে বাধ্য করে। ভারতে ২০১৯-২০ সালের সিএএ তথা বৈষ্যম্যমূলক নাগরিকত্ববিরোধী আন্দোলন, যেখানে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে সংগঠিত হয়। পাকিস্তানের পিটিআই কর্তৃক যুব আন্দোলন (২০২২-২৩), যা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে সামরিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করে।

 

 

প্রতিটি ক্ষেত্রে ছাত্র-তরুণ প্রজন্ম ছিল মূল চালক, সংযুক্ত এবং দশক ধরে অপেক্ষা করতে নারাজ। দ্রুততার সঙ্গে বিপ্লবাত্মক সহিংসতায় শক্তিতে পরিবর্তনের পথে তারা ছিল জোয়ারের স্রোতের মতো। তারা সরাসরি রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের অনুসারী হয়েও ছিলেন ক্ষুব্ধ, বিরক্ত, বঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার এবং ক্ষমতাসীনদের কার্যকলাপে চরম অসন্তুষ্ট।

 

 

তরুণ-যুবশক্তি ও বিতর্কিত রাজনীতির প্রতিবাদ

এ বিক্ষুব্ধ তরুণ-যুবশক্তি শুধু ক্ষমতাসীনদের অযোগ্যতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিরই বিরোধী নয়, বিতর্কিত রাজনীতিরও তীব্র সমালোচক ও প্রতিবাদকারী। রাজনৈতিক বিজ্ঞান এ আন্দোলনগুলোর শেকড় ও অভিমুখ ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। রাজনীতিতে যুববৃদ্ধি বা তারুণ্যের উদ্ভব তত্ত্ব নির্দেশ করে যে, বিশাল বেকার এবং শিক্ষিত যুব জনসংখ্যা থাকলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়ে, দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই এ প্রোফাইলে পড়ে, যাদের গড় বয়স ৩০-এর নিচে। কারণ, ক্ষমতাসীনরা তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন করতে ব্যর্থ আর বিরোধীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল তাদের ব্যবহার করলেও সুন্দর ভবিষ্যতের পথ দেখাতে অসমর্থ। ফলে তরুণরা ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরের রাজনৈতিক এলিটদের আপস-মীমাংসায় আসতে কিংবা ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হতে বাধ্য করে। ডিজিটাল মিডিয়া এ প্রক্রিয়াগুলোকে দ্রুত, সহজ এবং দৃশ্যমান করে ব্যাপক জনসমর্থনের ভিত্তি দিয়েছে। ক্ষমতাসীনদের ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ তথা ইন্টারনেট শাটডাউন, নজরদারি এবং বিবৃতি নিয়ন্ত্রণে হাতিয়ারকে অকেজো করার সক্ষমতা দেখিয়ে ডিজিটাল তরুণ প্রজন্ম। সরকারের অপকৌশলগুলো আন্দোলনকে আরও উসকে দিয়েছে।

 

 

বাংলাদেশের প্রভাব এবং তরঙ্গ

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশে শেষ হয়ে যায়নি। আশুলিয়ার অগ্নিসংযোগে হত্যাকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসাবে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও অনলাইন ফোরামে শিক্ষার্থীরা এখনো ন্যায়, চাকরির নিরাপত্তা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে দমন নিয়ে বিতর্ক করছে। এ আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদি যুবশক্তি এবং নাগরিক সমাজে বিভাজন ডেকে আনছে। ফলে আন্দোলনের উত্তেজক পর্যায় শেষ হলেও রেশ কমেনি; প্রভাবও মিলিয়ে যায়নি। চূড়ান্ত পরিণতি, পূর্ণ সফলতা বা ব্যর্থতার আগ পর্যন্ত এর আলোচনা চলতেই থাকবে এবং আশপাশের দেশগুলোতেও প্রতিরোধের পদ্ধতি হিসাবে তরঙ্গায়িত হতে থাকবে।

 

 

দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ প্লেবুক

এ আন্দোলনগুলো একত্রিত হয়ে জেন-জি প্রতিরোধের আঞ্চলিক মডেল তুলে ধরেছে: প্রাথমিক ঘটনা-নীতি, দুর্নীতি বা দমন রোষ সৃষ্টি করে। ডিজিটাল নেটওয়ার্ক গল্প, মিম এবং সমন্বয় বাড়ায়।

 

 

দমন বা হস্তক্ষেপ আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করে। ঐতিহাসিক স্মৃতি বৈধতা দেয়, বর্তমানকে জাতীয় গল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করে। এলিটের বিভাজন ঘটে, পদত্যাগ, কারফিউ বা আন্তর্জাতিক নজরদারি। এ প্লেবুকটি সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সাংগঠনিক মাধ্যমে নয়, বরং মিডিয়া, প্রতীক এবং প্রজন্মগত সহানুভূতির মাধ্যমে।

 

 

দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ

এ যুব আন্দোলনগুলো ক্ষণস্থায়ী নয়। তারা একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়; তরুণরা আর রাজনীতিকে এলিটের দ্বারা পরিচালিত শো হিসাবে দেখছে না, বরং এটি তাদের জীবনের সরাসরি আলোচনার বিষয়। তারা সবসময় সংগঠিত নয় বা সবসময় বিজয়ী নয়, তবে তারা রাজনৈতিক খেলায় সচেতনভাবে অংশ নিয়ে পুরোনো নিয়মই পরিবর্তন করছে।

 

 

ফলে সরকারগুলোর জন্য এমন বার্তা স্পষ্ট যে, কর্তৃত্ববাদী প্রতিক্রিয়া রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য আর যথেষ্ট নয়। ডিজিটাল ক্ষমতাসম্পন্ন প্রজন্মগত প্রতিরোধ অঞ্চলটির নাজুক গণতন্ত্রগুলোকে আবারও আকার দেবে তা বোঝা যাচ্ছে। তবে সতর্কতার বিষয় হলো, ইতিহাস সবসময় শুধু পরিবর্তনের উত্তরাধিকার নয়, ইতিহাসের যাত্রাপথে মাঝখানে ঠিকানা হারানোর বিপদ আরও ভয়ংকর।

 

 

তিউনিসিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়া

তরুণ আন্দোলনের গল্পটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ৪ জানুয়ারি, ২০১১, তিউনিসিয়ার তরুণ সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ বুয়াজিজি অর্থনৈতিক কষ্ট ও রাষ্ট্র অবহেলার প্রতিবাদে আত্মদাহের ঘটনায় উদ্ভূত, যা আরব বসন্তের সূচনা করে। দক্ষিণ এশিয়ার জেন-জি আন্দোলন এ ধারার পুনরাবৃত্তি। বাংলাদেশে আবু সাঈদ তেমন প্রতিবাদী ও আত্মত্যাগী চরিত্র। তরুণ, ডিজিটালি সংযুক্ত, অন্যায়ের প্রতি অসহিষ্ণু এবং সক্রিয়ভাবে পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী তরুণদের কাছে এসব চরিত্র অনুপ্রেরণামূলক।

 

 

অনুপ্রেরণার পথে পরিবর্তন ধীরে হলেও দৃশ্যমান। শ্রীলংকায় নতুন সরকার এসেছে। বাংলাদেশের ১৫ বছরের অন্ধকার ঠেলে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন দিকে এগোচ্ছে। নেপাল রাজনৈতিক বদল চাইছে। পাকিস্তান পরিবর্তনকামী। ভারতীয় প্রজন্ম সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় বিভাজন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শোষণ, বেকারত্ব, লুণ্ঠন, কৃষক নিপীড়ন থেকে মুক্তি চায়। প্রতিরোধ ব্যতিক্রমী, আকস্মিক ঘটনা মাত্র নয়, বাস্তবতা। বাংলাদেশের শিক্ষায় নেপাল তথা দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বার্তা আজ সুস্পষ্ট।

 

 


প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়