ধ্বংসের পথে ‘মহাস্থানগড়’

ধ্বংসের পথে ‘মহাস্থানগড়’
সংবাদবাংলাদেশ

ধ্বংসের পথে ‘মহাস্থানগড়’

১২ জুলাই, ২০২৬

চুরি হচ্ছে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সীমানা প্রাচীর ভেঙে চলাচলের পথ তৈরি করছে স্থানীয়রা এইচ আলিম, বগুড়া [সূত্র : বণিক বার্তা, ১৭ মে ২০২৬]

দেশের পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী স্থান মহাস্থানগড়। দীর্ঘ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করা এ প্রত্ননগরীর চারপাশে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন দুর্গপ্রাচীর, মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, সড়ক ও নানা স্থাপত্য নিদর্শন।

 

 

কিন্তু গৌরবময় সে অতীত আজ ক্ষয়ে যেতে বসেছে অযত্ন আর অবহেলায়। নিয়মিত সংরক্ষণ না হওয়ায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। বর্ষাকালে পানি জমে থাকা, আগাছার বিস্তার ও মাটির ক্ষয়—সব মিলিয়ে প্রত্নস্থলটির অস্তিত্বই এখন হুমকির মুখে।

 

 
 
 
 
 

বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত প্রাচীন এ নগরী একসময় ছিল সমৃদ্ধ সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু। মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন সাম্রাজ্য—ধারাবাহিক শাসনামলে মহাস্থানগড় শুধু রাজনৈতিক গুরুত্বই পায়নি, বরং ধর্মীয় সহাবস্থান ও সাংস্কৃতিক বিকাশেরও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছিল। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা এ স্থানটি বৌদ্ধ শিক্ষার জন্য ছিল প্রসিদ্ধ। চীন ও তিব্বত থেকে অনেক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী লেখাপড়ার জন্য এখানে আসতেন। এরপর তারা দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তেন এ শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে।

 

 

 

মহাস্থানগড়ের ইতিহাসের চেয়ে অবহেলার চিত্রই আজ প্রকট হয়ে উঠেছে। গড়ের মূল সীমানা প্রাচীরের প্রাচীন ইট খুলে ফেলে তৈরি করা হয়েছে রাস্তা। সে পথ দিয়ে অবাধে মানুষ যাতায়াত করছে, চলাচল করছে ভ্যান ও অটো। পুণ্ড্রবর্ধনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এ নিদর্শনের বিভিন্ন স্থানের প্রাচীন ইট খুলে ও তুলে নিয়ে গিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে শতাধিক বাড়ি।

 

 

 

এরই মধ্যে গত ১১ মে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ২০০৭ সালে ফ্রান্সে একটি প্রদর্শনীর জন্য বাংলাদেশের তিনটি জাদুঘর থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে বগুড়ার মহাস্থানগড় জাদুঘরেরও ছিল। প্রথম চালানের পর দ্বিতীয় চালানের মালামাল পাঠানোর সময় বিমানবন্দর থেকে একটি মূল্যবান মূর্তি হারিয়ে যাওয়ায় অবশ্য পুরো প্রদর্শনীটি বাতিল হয়। অথচ ঘটনার ১৯ বছর কেটে গেলেও এ বিষয়ে যথাযথ তদন্ত হয়নি।

 

0f99c87f-7717-44ad-bc19-3a6f86e344fb

 

সম্প্রতি নিখোঁজ প্রত্ন নিদর্শনের খোঁজে নয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এ কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান রাজিয়া সুলতানাকে। গত বুধবার এ কমিটি সরজমিনে মহাস্থান জাদুঘর পরিদর্শন করেছে।

 

 

প্রাচীন গবেষক বুকানন হ্যামিল্টন ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে পুণ্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। মহাস্থানগড়ে রয়েছে খোদার পাথর ভিটা, মানখালী কুণ্ডু, জিয়নকূপ, রাজা পরশুরামের বাড়ি, বৈরাগীর ভিটা, বন্দুকধরা, বেহুলা-লখিন্দরের বাসর ঘর, হাতিবান্ধা, হাতিডোবা পুকুর, ধোপাপুকুর, মনির ঘোন, শিলাদেবীর ঘাট, গোবিন্দভিটা, কালিদহসাগর অর্থাৎ পদ্মাদেবীর বাড়ি, গোকুলের মেড়, বামনপাড়া, পলাশবাড়ী, চিঙ্গাসপুর, ওঝাধন্বন্তরীর বাড়ি, ভাসুবিহার, ভীমের জাঙ্গাল, কাঞ্জিরহাড়ী, ছেলীর ধাপসহ আরো বেশকিছু স্থান। মহাস্থানগড়ের ভেতরের একটি অংশের নাম বৈরাগীর ভিটা। এ স্থানটি একটি রাজবাড়ি ছিল বলে ধারণা করা হয়। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৬৩৯ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পুণ্ড্রনগরে এসেছিলেন বলে জানা যায়। ভ্রমণ কাহিনীতে তিনি তখনকার প্রকৃতি ও জীবনযাত্রা বর্ণনা করেন।

Mohasthan-0333

 

বিভিন্ন সময়ে খননকাজের মাধ্যমে এখান থেকে বিধ্বস্ত মন্দির, স্তূপ, কূপ, প্রাচীন মুদ্রা এবং পোড়ামাটির ফলক (টেরাকোটা) উদ্ধার করা হয়েছে। ১৯২৮ সালের দিকে বৈরাগীর ভিটায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চালিয়ে পাল আমলের প্রাথমিক ও শেষ যুগের দুটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান মেলে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও ফ্রান্স যৌথভাবে বৈরাগীর ভিটা ও লইয়েরকুড়িতে খননকাজ চালায়। প্রায় দুই মাস খননের পর সেখানে মৌর্য, গুপ্ত ও পাল আমলের প্রাচীন অবকাঠামো এবং বৌদ্ধ স্তূপের সন্ধান মেলে।

 

 

 

চারপাশের সমতল ভূমি থেকে প্রায় পাঁচ মিটার উঁচুতে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন পুরাকীর্তিটি মূলত একটি আয়তাকার ঢিবি। যার দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৫৫২ মিটার আর প্রস্থ ১ হাজার ৩৭০ মিটার। এর চারপাশ ঘিরে রয়েছে প্রায় ২৫ ফুট উঁচু প্রাচীর। প্রাচীরের অভ্যন্তরে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রয়েছে কিংবদন্তির আউলিয়া হজরত শাহ সুলতান বলখী মাহী সওয়ারের (রা.) মাজার, যিনি ক্ষত্রিয় নরপতি রাজা পরশুরামকে পরাজিত করে এখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুরক্ষিত নগরটি উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ দিক একটি গভীর পরিখা দিয়ে বেষ্টিত ছিল। ১৭৭৯ সালে স্যার আলেকজান্ডার কানিংহাম এ ধ্বংসাবশেষকে প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষ রূপে শনাক্ত করেন। এখানে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী শিলালিপি প্রমাণ করে, এ নগরী মৌর্য আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

 

 

WhatsApp-Image-2026-05-16-at-8.12

 

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ২০১৬ সালে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে মহাস্থানগড়ের কিছু অবকাঠামোগত সংস্কার করা হয়েছিল। পর্যটকদের সুবিধার্থে নির্মিত হয়েছিল ঝুলন্ত সেতু, কাঠের ওভারব্রিজ, মার্কেট, পিকনিক স্পট ও শৌচাগার। এমনকি প্রাচীন ইটের আদলে ইট তৈরি করে দুর্গপ্রাচীর সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আজ সেসব অবকাঠামো ব্যবহার অনুপযোগী ও শ্রীহীন হয়ে পড়েছে। ফলে দর্শনার্থীদের সংখ্যা দিন দিন কমছে।

 

 

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মহাস্থানগড়ের ভেতর দিয়ে পর্যটকদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করাসহ মনির ঘোন নামক এলাকায় (শীলাদেবীর ঘাটের পশ্চিম পাশ) একটি কাঠের তৈরি ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে। সেই ব্রিজ দিয়ে পর্যটক ও দর্শনার্থীরা দুর্গপ্রাচীরের ভেতরে ঢুকে বৈরাগীর ভিটা ও পরশুরাম প্যালেস পরিদর্শন করে উত্তর পাশের দুর্গপ্রাচীরে ফিরে যেতে পারবেন। এরই মধ্যে মহাস্থানগড়ের পাশেই কালিদহ সাগর থেকে করতোয়া নদী অভিমুখে বয়ে যাওয়া খালের মাঝামাঝি স্থানে একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। ওই সেতু পার হয়ে দর্শনার্থীরা সরাসরি জাদুঘর চত্বরে প্রবেশ করতে পারবেন।

 

 

বগুড়া কার্যালয়ের রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক একেএম সাইফুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, মহাস্থানগড়ের সার্বিক উন্নয়নে একটি প্রকল্প প্রস্তাব আকারে পাঠানো হচ্ছে। এ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে পর্যটন সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, প্রত্ন নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ করা। মহাস্থানগড়ের সঠিক উন্নয়ন হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র পুরোপুরি বদলে যাবে।

 

 

ফ্রান্সে নেয়ার পথে একটি মূর্তি হারিয়ে যাওয়া। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৯ বছর। এ সময়ের মধ্যে কেন কোনো তদন্ত হয়নি—জানতে চাইলে সাইফুর রহমান বলেন, মূর্তি গায়েবের ঘটনায় তদন্ত কমিটি হয়েছে। তারা কাজ করছে। প্রতিবেদন পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ট্যাগ:BCSসংবাদবাংলাদেশ