দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে ড. ইউনূসের লড়াই
ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম [সূত্র : জনকণ্ঠ, ২৯ অক্টোবর ২০২৫]

গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের যে সেলাই মেশিনগুলোর শব্দ একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি ছিল, আজ সেগুলো প্রায় নিস্তব্ধ। একের পর এক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে বেঁচে থাকার জন্য সামান্য কোনো কাজের আশায়। দেশের সবচেয়ে বড় গর্ব রেডিমেড গার্মেন্টস শিল্প প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, সঙ্গে ডুবছে লাখ লাখ পরিবারের ভবিষ্যৎ। শুধু পোশাক শিল্প নয়, চারপাশে তাকালে সর্বত্রই সংকটের ছাপ স্পষ্ট। দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী, মজুরি স্থবির, চাকরিজীবীরা প্রতিদিন চাকরি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। বহু মানুষ এখন দুইবেলা খাবার জোগাড় করতে পারছে না। কেউ আসবাব বিক্রি করছে, কেউ সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে দিচ্ছে। হতাশা যেন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে- কারখানার মেঝে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত। বেকারত্বের হার ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশে। প্রায় ২৭ দশমিক ৪ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ভেঙে পড়েছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে।
মূল্য নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার স্থিতিশীল করা বা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো- কোনোটিতেই তেমন পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। বরং নীতিহীনতা ও পক্ষপাতদুষ্ট অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। প্রতিটি পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে হাজারো জীবনের কাহিনী। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারে শ্রমিকরা প্রতিদিন বন্ধ কারখানার সামনে এসে বসে থাকে, হাতে থাকে পুরনো অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার। কেউ কেউ মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না। অনেকেই এখন দিনমজুর, রিক্সাচালক বা ফুটপাতের বিক্রেতা। শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মও হতাশ। ডিগ্রি আছে, কিন্তু চাকরি নেই। দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে, চরম দারিদ্র্য প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে। গ্রাম ছাড়িয়ে এখন শহরের মধ্যবিত্ত ঘরেও অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে। ঋণগ্রস্ত, সম্পদ বিক্রি ও সন্তানদের স্কুল ছাড়ার হার বাড়ছে দ্রুত। ‘সংস্কার’ ও ‘রূপান্তর’-এর কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো ত্রাণনীতি বা সহায়তা নেই। প্রশ্নবিদ্ধ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ এর পরিশ্রমী মানুষ আজ হতাশ। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এখন পরিণত হয়েছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে।
ড. ইউনূস বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছিলেন শুধু নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমেই নয়, বরং ব্যবসায়িক জগতের নিয়মিত কথোপকথনে দারিদ্র্য থাকা উচিত- তার এই মতবাদটি বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমেও। একটি এক মেরুবিশিষ্ট বিশ্বে, যেখানে বাজারকে আমরা সবকিছুর চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে নির্বিচারে মেনে নেই- যেখানে ভালো করা হলো ভালো করে করার একটি উপজাত, সেখানে মুহাম্মদ ইউনূস কী বলছেন, কী করছেন এবং কেন তার সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা দরকার, তা বোঝা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটা মনে করা একেবারেই ঠিক হবে না যে, ইউনূস ইদানীং সব ভুল কারণেই সংবাদে আসছেন। ড. ইউনূসের জন্য এটা দুর্ভাগ্যজনক যে, তিনি সংবাদ হয়েছেন তিনি যা করেছেন সম্ভবত সে কারণে নয়, তিনি সংবাদ হয়েছেন বিশ্বব্যাপী তার বিপুল পরিচিতির জন্য!
সুশীল সমাজের অনেকেই স্থিতাবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও যারা বহিরাগত হিসেবে কাজ করছেন ড. ইউনূস তাদের চেয়ে ভিন্ন- তার পথযাত্রা একজন ভেতরকার সমালোচকের। তিনি স্থিতাবস্থার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি, তবে স্থিতাবস্থার নিয়মগুলিকে বহুলভাবে কাজে লাগিয়ে তার বিপরীতে একটি বিকল্প মডেল দাঁড় করিয়েছেন। ইউনূসের জীবন ও কর্মের দুটি অধ্যায় রয়েছে, যা আমাদের জানা দরকার। এর প্রথমটি হলো তার উদ্ভাবিত একটি সফল ক্ষুদ্রঋণ মডেল, যা তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার এনে দিয়েছিল। পরেরটি হলো একটি সংগ্রামী সামাজিক ব্যবসা মডেল।
উভয় ক্ষেত্রেই তিনি বাজার ব্যবস্থা ও তার কাঠামোর মধ্যে থাকলেও মালিকানা এবং মুনাফা বণ্টনের ক্ষেত্রে বিকল্প মডেল উপস্থাপন করেছেন। ভারতে ক্ষুদ্রঋণের স্ববিরোধিতায় এটি পরিস্কারভাবে লক্ষণীয়, যেখানে পরিচালনাগত দিক দিয়ে মডেলটি আর্থিক পরিষেবায় প্রবেশাধিকার প্রদান করছিল একটি পরিপূরক মালিকানা কাঠামো ছাড়া, যার পরিণতি হলো ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে বিনিয়োগকারীদের সম্পদবৃদ্ধি। ইউনূস যখন বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণের ধারণাটি প্রয়োগ করেছিলেন, তখন তিনি ঋণবাজারের সর্বশেষ স্তর অর্থাৎ এর উদ্দিষ্ট দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে মাথায় রেখেই এর কাঠামোটি নির্মাণ করেছিলেন। ঋণদাতা এবং ঋণগ্রহীতার মধ্যকার দূরত্বটি দুর করা হয়েছিল একটি মধ্যবর্তী দল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। লেনদেনগুলোকে প্রমিত ও সমগ্রীভূত করা হয়েছিল, যা সামাজিক জামানত সৃষ্টির পাশাপাশি লেনদেনে দক্ষতা নিশ্চিত করেছিল। এগুলো যে কোনো ব্যবসার জন্য হৃদয়গ্রাহী হতো।
ইউনূস কখনই ভর্তুকির জন্য সুপারিশ করেননি এবং প্রকৃতপক্ষে, ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে বাজারের প্রচলিত সুদের হারই ধার্য করেছিলেন। এতে পার্থক্যটা কী ছিল? ইউনূস যে মৌলিক প্রশ্নটি তুলেছিলেন তা এই ছিল না যে, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি বাণিজ্যিকভাবে টেকসই হবে কিনা, তিনি ভাবছিলেন অবশিষ্ট মুনাফার বণ্টনের পদ্ধতি নিয়ে। উভয় মডেলেই- ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে যেখানে গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানা ছিল এর ঋণগ্রহীতা মহিলাদের কাছে- এবং সামাজিক ব্যবসার ক্ষেত্রেও তিনি মুনাফাকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বণ্টনের পরিবর্তে সমাজের উপকারার্থে কোম্পানিতেই পুনর্বিনিয়োজিত করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি একটি পুনর্বণ্টন মডেল নির্মাণ করেছেন এবং যুক্তি দেখিয়েছেন যে, বিনিয়োগকারীদের একটি গ্রহণযোগ্য (কিন্তু অসমঞ্জস্যপূর্ণ নয়) হারে মুনাফা দেয়া উচিত।
যারা একটি অধিকতর সমতাভিত্তিক ও ন্যায়সংগত সমাজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা ও বাজার ব্যবস্থার গুরুত্বও অনুধাবন করে থাকেন, তাদের কাছে ইউনূসের এই কাঠামোটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ড. ইউনূসের ওপর নির্যাতন ও তার সম্মানহানি শুধু এই মানুষটিরই ক্ষতি করা নয়, এর মাধ্যমে তিনি যে বৃহত্তর আইডিয়াটির প্রতিনিধিত্ব করেন, তার ওপরও আঘাত করা হয়। আগে যেমনটি বলা হয়েছে, ইউনূসের উদ্ভাবিত ক্ষুদ্রঋণকে সহজেই একটি বাণিজ্যিক উদ্ভাবন বলা যেতে পারে- ভারতে অনুসৃত গ্রামীণ মডেলের প্রতিলিপিতে এর সুস্পষ্ট প্রমাণ মেলে। গ্রামীণ-এর ভারতীয় প্রতিলিপি নিছক এর মাঠ পর্যায়ের পরিচালনাতেই দৃশ্যমান; এর মালিকানা সম্পদের পুনর্বণ্টনের দিকে ধাবিত হয় না। এর ফল হয়েছে বরং বিনিয়োগকারীদের হাতে এর মেরুকরণ।
পরিহাসের বিষয় হলো, সোশ্যাল স্টক এক্সচেঞ্জের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, বেসরকারি মূলধনি প্রতিষ্ঠানগুলোর গড় মুনাফার তুলনায় ক্ষুদ্রঋণ খাত বিনিয়োগকারীদের জন্য উচ্চতর মুনাফার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। ড. ইউনূস বিশ্বাসযোগ্যতা ও বিবেকের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি এমন একজন ব্যক্তি যিনি পরিচালনাগত মডেলের প্রশংসা করতে যেমন কার্পণ্য করেননি, তেমনি মালিকানা মডেলের সমালোচনা করতেও কখনো দ্বিধা করেননি। সেটা ভারতের খ্যাতনামা এসকেএস মাইক্রোফাইন্যান্স যখন শেয়ার বাজারে আঘাত হানে কিংবা মেক্সিকোর নেতৃস্থানীয় ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা কমপার্টামোস তার ইনিশিয়াল পাবলিক অফারিং নিয়ে আসে। তিনি বাণিজ্যের জগতে সমতার যুক্তির প্রতিনিধিত্ব করেন।
কোনো যুক্তিতেই তাকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। হ্যাঁ, তিনি তার ভক্তদের চাপে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু শীঘ্রই তা পরিত্যাগও করেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, ব্যবসায়িক জগৎ ও রাজনৈতিক জগৎ একেবারেই আলাদা দুটি জগৎ। ব্যবসায়িক বিশ্ব তাকে হুমকি হিসাবে দেখেনি, বরং ক্রমাগত তার আইডিয়াগুলো গ্রহণ করছে, তা সে বহুজাতিক ড্যানোন হোক বা যে কোনো সংস্থা, যা সামাজিক ব্যবসা করার উপায় পরীক্ষা করে দেখে- অর্থাৎ হৃদয় দিয়ে ব্যবসা। ড. ইউনূস বাংলাদেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছিলেন শুধু তার নোবেল পুরস্কারের মাধ্যমেই নয়, বরং ব্যবসায়িক জগতের নিয়মিত কথোপকথনে দারিদ্র্য থাকা উচিত- তার এই মতবাদটি বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমেও। ব্যবসায়িক বিশ্বের মানুষজনসহ সকলেরই কথোপকথনে সমতা নিশ্চিত করার এ বিষয়টি অবশ্যই থাকতে হবে।
রাষ্ট্র যেখানে মূলত করারোপ ও পুনর্বণ্টনের সঙ্গে যুক্ত, ইউনূস সেখানে সমতার বৃহত্তর ধারণাটির প্রতিনিধিত্ব করছেন। এটি এমন একটি ধারণা যা রাষ্ট্রকে পুনর্বণ্টনের তাগিদ দেয় না, যদি ব্যবসায়িক বিশ্ব নিজেই আরও সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক হয়ে ওঠে। তিনি বিশ্বাসযোগ্য এবং বিকল্প ব্যবসায়িক মডেলের মধ্য দিয়ে ধারণাটি প্রমাণ করেছেন। কিন্তু এ কাজ করতে গিয়ে তিনি বাংলাদেশের ব্র্যান্ডকেই কেবল বড় করেছেন। যদিও বর্তমান সরকার ক্ষুদ্র এই দেশটির জন্য আরও ভালো মানব উন্নয়ন সূচক প্রতিষ্ঠার দাবি করতে পারে।
ইউনূসকে সমালোচনা করে কেউই লাভবান হবে না। এটি কেবল একটি দুর্দান্ত ব্র্যান্ডকেই ধ্বংস করবে। এটা দুঃখজনক যে, কোনো কোনো দেশ তুচ্ছ কিছু বিবেচনা থেকে তাদের নায়কদের যথাযথ সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়। ভারত এম এফ হোসেনের ক্ষেত্রে এটা করেছে, বাংলাদেশ করছে ইউনূসের ক্ষেত্রে। জীবন্ত কিংবদন্তিদের সঙ্গে আমাদের আরও সতর্কতার সঙ্গে আচরণ করা দরকার। হ্যাঁ, তারাও মানুষ এবং তাদের ভুল হতে পারে, কিন্তু আমাদের অবশ্যই ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। বিশেষ করে ইউনূসের মতো একজন মানুষের সঙ্গে, যিনি শুধু বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থাতেই বিপ্লব আনেননি, যিনি ভারতের ব্যাংকিংয়ে মহিলাদের অংশগ্রহণের ধারণা এবং আরও অনেক কিছুতে বিপুল অবদান রেখেছেন!
লেখক : সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন