দারিদ্র্য নিরসনে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে
ড. মোস্তফা কে মুজেরী [সূত্র : যুগান্তর, ৩১ আগস্ট ২০২৫]

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) সম্প্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। বর্তমানে সার্বিকভাবে দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজনের একজন দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এর মধ্যে অতিদরিদ্র মানুষের হার হচ্ছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আরও অনেকেই আছে, যারা দারিদ্র্যসীমার সামান্য উপরে অবস্থান করছে। সামান্য অভিঘাতেই তারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে আসতে পারে। দারিদ্র্য বৃদ্ধির এ প্রবণতা যে কোনো বিচারেই উদ্বেগজনক। তিন বছর আগেও দেশে দারিদ্র্যের হার কম ছিল। ২০২২ সালে সার্বিকভাবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। সেই সময় অতিদরিদ্র মানুষের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। দারিদ্র্যসীমার উপরে বসবাস করছে, কিন্তু সামান্য অভিঘাতেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে এমন পরিবারের হার ১৮ শতাংশ। পিপিআরসি দেশের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের ৩৩ হাজার ২০৭ জন সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে এ জরিপ সম্পন্ন করে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখ করেছে, ২০২৫ সালে পরিবারপ্রতি মাসিক জাতীয় আয় ছিল ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা। এর মধ্যে শহরে মাসিক আয় হচ্ছে পরিবারপ্রতি ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা এবং গ্রামে ২৯ হাজার ২০৫ টাকা। পরিবারপ্রতি গড় জাতীয় ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা এবং গ্রামীণ পর্যায়ে ২৭ হাজার ১৬২ টাকা। মোট আয়ের ৫৫ শতাংশই চলে যায় খাবার ক্রয় করতে। মাসে একটি পরিবার গড়ে ১০ হাজার ৬১৪ টাকা ব্যয় করে খাবার ক্রয়ের জন্য। বিগত ২ বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের বেশি ছিল। গত বছর জুলাইয়ে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪ শতাংশ। এটা বিগত এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্য মূল্যস্ফীতির অভিঘাত একটি পরিবারের আর্থিক অবস্থান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কর্মজীবীদের মধ্যে ছদ্ম বেকারের হার বাড়ছে। কর্মজীবীদের প্রায় ৩৮ শতাংশ পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থানে নেই। পিপিআরসি তাদের গবেষণায় উল্লেখ করেছে, গত তিন বছরে শহরের পরিবারগুলোর মাসিক আয় কমেছে, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে। দারিদ্র্য অবস্থার ওপর এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।
পিপিআরসির এ গবেষণা প্রতিবেদন নানা কারণেই বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। গবেষণার পদ্ধতি বা দারিদ্র্যের হার নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতি যে ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। দেশে চরম দারিদ্র্য এবং সার্বিক দারিদ্র্য দুটোই সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষণীয়ভাবে বেড়েছে। প্রশ্ন হলো, দেশে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে কেন? আমরা যদি বিগত তিন বছরের আর্থিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখব-এ সময় আমরা উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবণতার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করেছি। ২০২২ সালের পর থেকেই মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করে এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে। মাঝখানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। সবচেয়ে দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি। এর কারণে সাধারণ দরিদ্র মানুষ খুবই কষ্টে আছে। পরিবারের উপার্জিত আয়ের বড় অংশই খাদ্যদ্রব্য ক্রয়ে ব্যয় হচ্ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতির অভিঘাত সরাসরি দরিদ্র এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে আঘাত করে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি তিন বছর ধরেই উচ্চতর পর্যায়ে রয়েছে, যদিও সম্প্রতি তা কিছুটা কমেছে। কিন্তু সেটাকে সাধারণ মানুষের জন্য সহনীয় বলা যাবে না। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। যারা দরিদ্র ছিল, তারা আরও দরিদ্র হচ্ছে। যারা দারিদ্র্যসীমার সামান্য উপরে অবস্থান করছিল, তাদের অনেকেই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।
করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল, তখন শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এ যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বাংলাদেশেও এ প্রবণতা দেখা দেয়; যার প্রভাব এখনো আমরা অনুভব করছি। এ সময়ে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ কার্যক্রমে মন্থরতা দেখা দেয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধি শ্লথ হয়ে পড়ে। গত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ শতাংশের নিচে। দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বাজার সংকুচিত হয়েছে। দারিদ্র্যবিমোচনের একটি বড় কৌশল হচ্ছে দেশে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। কোনো পরিবারে এক বা একাধিক সদস্যের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হলে সেই পরিবারের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। উৎপাদন খুব একটা বৃদ্ধি পায়নি। অর্থনীতির সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হবে, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধিটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আগামীতে মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি যদি সহনীয় পর্র্যায়ে নেমে না আসে, এবং সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে গতিশীলতা সৃষ্টি না হয়, তাহলে দারিদ্র্য পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে মূল্যস্ফীতি আরও একদফা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ নির্বাচনকালে প্রচুর অর্থ বাজারে চলে আসে। এ মুহূর্তে সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, নিকট ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতি হ্রাস পাওয়ার এবং দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। আগামী কয়েক মাসে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হবে না। কারণ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না থাকলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধান্বিত থাকবেন। বিদেশি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনাও কম থাকবে। সব মিলিয়ে আগামীতে দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং আরও খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণে আমাদের বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে; যাতে স্থানীয় উদ্যোক্তারা বেশি বেশি বিনিয়োগ করেন। আর বিদেশি উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করার জন্য কার্যকর বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী কোনো দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে দেশটির বিনিয়োগ পরিবেশ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। দেশে যদি কার্যকর বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, তাহলে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বর্ধিত হারে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে উৎপাদন সেক্টর গতিশীল হবে। নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে প্রবৃদ্ধির চাকা গতিশীল হবে।
একইসঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালাতে হবে। আমাদের দেশের বাজার ব্যবস্থাপনা মোটেও উন্নত ও আধুনিক নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য হ্রাস পেলেও স্থানীয় বাজারে তার মূল্য কমে না অথবা কমলেও আনুপাতিক হারে কমে না। বাজারে শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট তৎপর রয়েছে। তারা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়। পণ্য পরিবহণকালে চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য নানা প্রক্রিয়ায় হয়রানি করা হয়। ফলে গ্রামে যে পণ্যটি স্বল্পমূল্যে ক্রয় করা যায়, সেই পণ্যটিই শহরে এসে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে বিক্রি হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, নীতি সুদহার তখনই কাজ করে, যখন ঋণের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। ঋণের চাহিদাকে সংকুচিত করার মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমানোর জন্যই নীতি সুদহার বাড়ানো হয়। নীতি সুদহার বাড়ানোর নেতিবাচক প্রভাবও প্রত্যক্ষ করা যায়। নীতি সুদহার বাড়ালে ব্যাংক ঋণের সুদের হারও বেড়ে যায়। এতে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমে যায় ঠিকই; কিন্তু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মন্থরতা নেমে আসতে পারে। বর্তমানে ব্যক্তি খাতে ঋণের চাহিদা নিম্নপর্যায়ে রয়েছে। নীতি সুদহার বাড়ালে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ আরও সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে। উদ্যোক্তারা ঋণের জন্য আগের মতো ব্যাংকে যাচ্ছেন না, ফলে ব্যক্তিগত ঋণের চাহিদা কমে গেছে।
দেশে বাজারব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল। মাঝেমধ্যেই চালের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে বর্তমানে চালের দাম বাড়ার তেমন কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। দেশে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। বিপুল পরিমাণ চাল আমদানি করা হচ্ছে। তাহলে বাজারে চালের দাম বাড়ছে কেন? এর অর্থ হচ্ছে, কিছু মানুষ কৃত্রিমভাবে বাজারব্যবস্থাকে ব্যবহার করে চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাজার যদি প্রতিযোগিতামূলক হতো, তাহলে এ সমস্যা সৃষ্টি হতো না। (অনুলিখন : এম এ খালেক)
ড. মোস্তফা কে মুজেরী : অর্থনীতিবিদ; নির্বাহী পরিচালক, ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট