কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প

কর্মসংস্থান আনোয়ার ফারুক তালুকদার প্রকাশ : সমকাল, ২০ অক্টোবর ২০২৫

দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ সালে বাংলাদেশের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের মাত্রা ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে গেছে। অর্থাৎ কর্মে নিয়োজিত জনসংখ্যার মধ্যে এই সংখ্যক মানুষ নতুন করে বেকার হয়ে পড়েছে। সংখ্যার হিসাবে তা প্রায় ৩০ লাখ, যার মধ্যে ২৪ লাখই নারী। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ২০ হাজারে।

 

 

বিবিএসের দেওয়া পরিসংখ্যান নিয়ে যদিও কমবেশি সবারই প্রশ্ন রয়েছে, এমনকি খোদ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মাঝেও। যাই হোক, এর পরও যে চিত্র তারা (বিবিএস) তুলে এনেছেন, তা বিবেচনায় আনলে এটাও উদ্বেগজনক। আর আমাদের দেশের ছদ্ম বেকারের কথা আলোচনায় না-ই বা আনলাম। এই পরিস্থিতি যখন আমরা পার করছি, সেই পথ থেকে উত্তরণের পথ দেখাতে পারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। কিন্তু বিনিয়োগ পরিস্থিতির অবস্থা যে কেমন তার একটা পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবিরতায় এই এক অঙ্কের লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। অর্থবছর শেষে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। আর গত আগস্ট মাসে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশে, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। 

 
 
 

এখন পর্যন্ত এটা প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারেনি। কম বিনিয়োগ মানে কম কর্মসংস্থান। এহেন পরিস্থিতিতে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বরং উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগে। ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তারা নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। শুধু নতুন বিনিয়োগ নয়; অনেক ক্ষেত্রে চালু থাকা বহু কারখানাও বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক লোক তাদের কাজ হারিয়েছে।

 

 

অন্যদিকে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে নীতি সুদহার এমন পর্যায়ে উঠে গেছে, যার ফলে ক্ষেত্রবিশেষে ঋণের সুদের পরিমাণ ১৪-১৫ শতাংশে ঠেকেছে। এই উচ্চ সুদের ফলে ভালো উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে উৎসাহ বোধ করছেন না। ঋণ কম নেওয়া বা না নেওয়ার সঙ্গে কর্মের একটা সরাসরি সংযোগ আছে। ঋণ নিয়ে তা বিনিয়োগে গেলে কর্মসংস্থান বাড়ায়। আবার ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো ঋণের বদলে সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করছে। তা ছাড়া আর্থিক সংকটের কারণে ঋণ দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এমন পরিস্থিতিতে বড় বড় প্রতিষ্ঠান যখন ঋণ নিতে পারছে না বা নিতে চাচ্ছে না, এই জায়গায় ঋণ বিতরণের উত্তম ক্ষেত্র হতে পারে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। চরিত্রগতভাবেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প কম বিনিয়োগে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। 

 
 
 

পরিসংখ্যান বলে শিল্প খাতে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প থেকে আসছে এবং জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রাখছে। আবার এই খাত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সেরা প্রবৃদ্ধি মডেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আয়বৈষম্য কমাতে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে এই খাতের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এর মাধ্যমে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও নতুন ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উন্নয়নে উদ্যোক্তাদের মূলধনের জোগান, নারী উদ্যোক্তাদের যতটা সম্ভব জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নয়ন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা; সর্বোপরি দেশ-বিদেশে তাদের পণ্যের বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা হলে এই খাতের মাধ্যমে স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে দারিদ্র্য বিমোচন এবং কর্মসংস্থানে ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে।

 

 

আনোয়ার ফারুক তালুকদার : অর্থনীতি বিশ্লেষক