দ. এশিয়ার ঝুঁকি আরও ভয়াবহ : মর্ডান ডিপ্লোমেসির বিশ্লেষণ
ফোকাস ডেস্ক [আপডেট : কালবেলা, ১৬ নভেম্বর ২০২৫]

পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র আবার ফিরতে চলেছে—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এ ঘোষণা বিশ্ব নিরাপত্তা নীতি ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ১৯৯২ সালের পর প্রথমবার এমন নীতি পরিবর্তনের কথা জানাল ওয়াশিংটন, যা শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন—রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষা স্থগিত রাখার এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় ছিল। এই বিরতি বৈশ্বিক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা কমিয়েছে এবং পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। কিন্তু সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের আগে ট্রাম্প জানান, পেন্টাগন ‘রাশিয়া ও চীনের সমপর্যায়ে’ পরীক্ষা ফের চালু করবে। তিনি দাবি করেন, মস্কোর সাম্প্রতিক প্রদর্শনী এবং বেইজিংয়ের অস্বচ্ছ পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ পদক্ষেপ জরুরি হয়ে উঠেছে।
ঘোষণাটি বিশ্বজুড়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী মহলেও তাৎক্ষণিক আলোড়ন তোলে। রিপাবলিকান সিনেটর জিম রিশ সিদ্ধান্তটিকে ‘যথাযথ প্রতিক্রিয়া বলে আখ্যা দিলেও, সিনেটের ডেমোক্র্যাটিক সদস্য জ্যাক রিড সতর্ক করে বলেন, এ পদক্ষেপ দীর্ঘদিনের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ অগ্রগতিকে বিপন্ন করে তুলতে পারে এবং নতুন বৈশ্বিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা উসকে দিতে পারে।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: পারমাণবিক পরীক্ষা বিশ্ব রাজনৈতিক কাঠামোয় গভীর প্রভাব রেখেছে। ১৯৪৫ সালের ‘ট্রিনিটি টেস্ট’ মানবসভ্যতাকে পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করায়; পরবর্তী কয়েক দশক যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন শত শত পরীক্ষা চালায়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে অস্ত্র প্রযুক্তি উন্নত হলেও এর ফলে তেজস্ক্রিয় দূষণ, পরিবেশ ধ্বংস ও বহু জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে।
জোরালো জনমতের চাপের মুখে ১৯৬৩ সালে আংশিক পরীক্ষাবিরতি চুক্তি বায়ুমণ্ডল, সাগর ও মহাকাশে বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করে, যদিও ভূগর্ভস্থ পরীক্ষা অব্যাহত ছিল। শীতল যুদ্ধ শেষে, ১৯৯৬ সালে গৃহীত কমপ্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার-টেস্ট-ব্যান ট্রিটি (সিটিবিটি) সব ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে প্রণয়ন করা হয়। চুক্তিটি ১৮৭ দেশের স্বাক্ষর এবং ১৮৫ দেশের অনুমোদন পেলেও এখনো আইনত কার্যকর হয়নি। মূল বাধা হচ্ছে আটটি রাষ্ট্র—যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইরান, ইসরায়েল, মিশর, ভারত, পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া এখনো এটি অনুমোদন করেনি।
এর মধ্যেও সিটিবিটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক আস্থার ভিত্তি তৈরি করে। চুক্তির আওতায় স্থাপিত আন্তর্জাতিক মনিটরিং সিস্টেম (আইএমএস) সারা বিশ্বের ৩৩৭টি স্টেশন থেকে ক্ষুদ্রতম বিস্ফোরণও শনাক্ত করতে সক্ষম, যা উত্তর কোরিয়ার সব পরীক্ষাই শনাক্ত করেছে।
সংকটের সম্ভাবনা ও নতুন প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্র পরীক্ষাবিরতি ভাঙলে এর প্রভাব সরাসরি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় পড়ে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া বা চীনও নিজেদের পরীক্ষা বা সক্ষমতা উন্নয়নে জোর বাড়াতে পারে। একইভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত, পাকিস্তানসহ অন্য পারমাণবিক রাষ্ট্রও নিরাপত্তাজনিত চাপ অনুভব করতে পারে।
এই পরিস্থিতিকে অনেক বিশেষজ্ঞ ২১ শতকে নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, যখন বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো বহু বৈশ্বিক সংকটে জর্জরিত, তখন নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতা মানবজাতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলবে।
দক্ষিণ এশিয়ার ঝুঁকি আরও তীব্র: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে এ অঞ্চল পারমাণবিক প্রতিযোগিতার জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর। ভারত ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক পরীক্ষা করে; পাকিস্তান পাল্টা পরীক্ষা চালিয়ে সমতা বজায় রাখে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র পরীক্ষায় ফিরলে ভারত উন্নত থার্মোনিউক্লিয়ার সক্ষমতার দিকে অগ্রসর হতে পারে। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানও নতুন পরীক্ষা বা সক্ষমতা বাড়ানোর চাপে পড়বে।
অর্থনৈতিক সংকট, পানি সংকট, দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য খাতে দুরবস্থা—এসব সমস্যায় জর্জরিত দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতা জনজীবনকে আরও ঝুঁকিতে ফেলতে পারে—এমন সতর্কবার্তা দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা: পারমাণবিক অস্ত্রের আলোচনা সাধারণত সামরিক কৌশল ও রাজনৈতিক ভাষ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু এর প্রকৃত ক্ষতি বহুমাত্রিক মানবিক বিপর্যয়। হিরোশিমা-নাগাসাকির বেঁচে থাকা মানুষ থেকে শুরু করে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপবাসী পর্যন্ত সবাই দেখিয়েছে—পারমাণবিক বিস্ফোরণের ক্ষত প্রজন্মের পর প্রজন্ম লেগে থাকে। ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত ঘটলে তাৎক্ষণিক প্রাণহানির বাইরে দীর্ঘমেয়াদি ক্যানসার, জন্মগত ত্রুটি, অর্থনৈতিক পতন ও ব্যাপক শরণার্থী সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
সংযমের আহ্বান: বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পরীক্ষাবিরতি থেকে সরে আসা শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে এক অনিশ্চিত পথে ঠেলে দিতে পারে। তাই যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন সংলাপ, চুক্তিবদ্ধতা ও সিটিবিটিকে কার্যকর করার জন্য নতুন কূটনৈতিক প্রচেষ্টা।
বর্তমান বিশ্বে মানবসভ্যতাকে রক্ষার জন্য আরও বিস্ফোরণ নয়—প্রয়োজন বেশি সহযোগিতা, সংযম ও দায়িত্বশীল নীতি।