COP30- বাংলাদেশের টিকে থাকার সুযোগ
এস. এম. তসলিম রেজা [সূত্র : দেশ রূপান্তর, ১২ নভেম্বর ২০২৫]

কপ সম্মেলন ব্রাজিলে হচ্ছে প্রথমবার, আমাজন রেইনফরেস্টের ৬০% অংশ ধারণ করে। এই আমাজন বিশে^র বৃহত্তম অক্ষত বনভূমি। তারাই ইভেন্টটি আয়োজন করেছে। ১১ জানুয়ারি ২০২৩ সালে, প্রেসিডেন্ট লুলা এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা করেছিল, পারা রাজ্যের বেলেম শহরটি ইভেন্টের জন্য ব্রাজিলের প্রার্থী শহর। ২০২৫ সালে সেখানেই ২১ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ৩০তম সম্মেলন-COP30। শুরু হয়েছে, গত ১০ নভেম্বর। এটি হচ্ছে, ব্রাজিলের পারা রাজ্যের বেলেম শহরে। এই বার্ষিক সম্মেলন, যা জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC)-এর আওতায় অনুষ্ঠিত হয়। সরকার, বিজ্ঞানী, নাগরিক সমাজ, আদিবাসী প্রতিনিধি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারদের একত্রিত করে জলবায়ু অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি নির্ধারণের জন্য। প্রথম জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন, ১৯৯৫ সালে বার্লিনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতি এবং কার্বন নিঃসরণ, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হ্রাস পায়নি। যে কারণে, বিশ্ব আজ পরিবেশগত বিভিন্ন হুমকির মুখে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে COP30-এর গুরুত্ব : সম্মেলনটি আমাজনের হৃদয়ে হওয়ায় বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় উষ্ণমণ্ডলীয় বন, জীববৈচিত্র্য এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার জলবায়ু সমাধানে কেন্দ্রবিন্দু। ব্রাজিল ইতিমধ্যেই জানিয়েছে যে, বন সংরক্ষণ ও প্রকৃতি-ভিত্তিক কৌশল COP30-তে অগ্রাধিকার পাবে। তারই একটি মূল উদ্যোগ হলো ‘ট্রপিক্যাল ফরেস্টস ফরএভার ফ্যাসিলিটি’। যা ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি যৌথ অর্থায়ন তহবিল। এর উদ্দেশ্য বন সংরক্ষণে সফল দেশগুলোকে পুরস্কৃত করা। এটি ব্রাজিলের প্রচেষ্টার অংশ যার মাধ্যমে দেশটি উন্নত এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে চায়।
বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ার জন্য COP30-এর প্রাসঙ্গিকতা : দক্ষিণ এশিয়ার জন্য, বিশেষত বাংলাদেশের জন্য COP30 শুধু প্রতীকের বিষয় নয়, এটি এক ধরনের টিকে থাকার লড়াই। যেহেতু এই অঞ্চল পৃথিবীর সবচেয়ে জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, হিমবাহ গলন, তাপপ্রবাহ এবং অনিয়মিত বর্ষার কারণে জীবিকা ও অর্থনীতি ক্রমে হুমকির মুখে রয়েছে।
ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ : বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ তহবিলের দাবি জানিয়ে আসছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা করবে। COP30-এ দক্ষিণ এশিয়ার আলোচকদের মূল অগ্রাধিকার হবে, এই তহবিলের কার্যকর রূপায়ণ।
জলবায়ু অর্থায়ন : নভেম্বর ২০২৪-এ আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত হওয়া জাতিসংঘের ২৯তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে (COP-29) গৃহীত, ২০৩৫ সালের মধ্যে বার্ষিক ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের রোডম্যাপ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করবে। বাংলাদেশের জন্য এটি টেকসই অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং উপকূলীয় সংরক্ষণে নতুন অনুদান ও স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ দিতে পারে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণও তার আওতায় আসতে পারে।
জ্বালানি রূপান্তর : দক্ষিণ এশিয়া এখনো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তারপরও এটি নবায়নযোগ্য শক্তির কেন্দ্র হিসেবে উদীয়মান। বেলেমে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে ন্যায্য রূপান্তর নিয়ে আলোচনার ফলাফল বাংলাদেশের গ্যাসভিত্তিক জ্বালানি কৌশল ও ভারতের কয়লানীতি প্রভাবিত করবে, যা আঞ্চলিক সবুজ জাল (মৎরফ) গঠনের পথও খুলবে।
অভিবাসন ও জলবায়ু শরণার্থী : বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতির বিষয় নিয়মিত তুলে ধরে। রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও COP30-এ আলোচনার জন্য নতুন সুযোগ দিতে পারে।
আঞ্চলিক কূটনীতি : বাংলাদেশ এলডিসি গ্রুপ, ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম (grid) এবং জি-৭৭+ চায়না জোটের মধ্যে নেতৃত্ব বজায় রাখবে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আঞ্চলিক সমস্যাগুলোকে শক্তভাবে তুলে ধরা যায়।
COP30-এ বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে:
১. অভিযোজন এবং ক্ষতি-ক্ষতিপূরণ অর্থায়নে শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রদান।
২. দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং সৌর হোম সিস্টেমে অর্জন তুলে ধরা।
৩. বন এবং নীল কার্বন সংরক্ষণে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং
৪. ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় বিশ্বকে সচেতন করা।
COP30-এর মূল সাফল্য নির্ভর করবে বক্তব্যে নয়, পদক্ষেপে। বিশ্ব কী প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবায়নের ফারাক ঘুচাতে পারবে? বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য stakes existential। ন্যায্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বৈশ্বিক নির্গমন হ্রাস ছাড়া অঞ্চলটি মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। আমাজনে COP30-এর আয়োজন মনে করিয়ে দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তন একই সঙ্গে বৈশ্বিক ও স্থানীয় বাস্তবতা। বিশ্বের জন্য বেলেম হবে, মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত। বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলন হচ্ছে ন্যায্যতা, সহনশীলতা এবং টিকে থাকার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।