কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

চীনের ভবিষ্যৎ : শক্তি নাকি ফাঁদ

সাইফুল খান [প্রকাশ: যুগান্তর, ২৩ আগস্ট ২০২৫]

চীনের ভবিষ্যৎ : শক্তি নাকি ফাঁদ

চীনকে বোঝা সহজ নয়। তবে হাজার বছরের ইতিহাসের ভার, দার্শনিক ঐতিহ্যের গভীরতা, বিপ্লব ও সংস্কারের টানাপোড়েন, সর্বোপরি এক অদ্ভুত বাস্তববাদের ভেতর দাঁড়িয়ে চীন এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, যে রাষ্ট্রকে আমরা চাই বা না চাই, অবহেলা করতে পারি না। আজকের পৃথিবীতে চীনের উত্থানকে কেন্দ্র করে যত আলোচনা, তার মূল সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় এক জায়গায়। সেটা হলো তার বাণিজ্যনীতি।

 

 

 

শত্রু হোক বা মিত্র, সবার সঙ্গে বাণিজ্য করা, সম্পর্ক তৈরি করা, লাভ খোঁজা-এ নীতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে চীনের রাষ্ট্রচিন্তার গভীরতম রহস্য। এটা কি নতুন কোনো তত্ত্ব? আসলে এটি পুরোনো এক চিন্তার নতুন রূপ। চীনের পরলোকগত নেতা দেং শিয়াওপিং বাস্তববাদী দার্শনিকতা দাঁড় করেছিলেন, তারই বিস্তৃত সংস্করণ আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি।

 

 

দেং শিয়াওপিং প্রথমে ফ্রান্সে, তারপর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পড়াশোনা করা সমাজতান্ত্রিক নেতা। চীনজুড়ে লংমার্চে হাড়ভাঙা কষ্ট সয়ে এগিয়েছিলেন, পার্টির ভেতরে ধীরে ধীরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু ইতিহাস বড়ই নির্মম। যে মাও-এর পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই মাও-এর হাতেই দুবার নির্বাসিত হন তিনি।

 

 

‘সংস্কৃতি বিপ্লব’ নামের উন্মাদ ঝড়ে তাকে টেনে নামানো হয়। বলা হয়, দেং ‘পুঁজিবাদী পথের দালাল’, এ লোক বিপ্লবের শত্রু। অথচ দেং জানতেন, পেটে ভাত না থাকলে বিপ্লব কাগজের ফুল ছাড়া আর কিছুই নয়। মাওয়ের মৃত্যুর পর ভাঙা চীনের ভগ্নস্তূপের মধ্যে ক্ষমতার রাশ আবার তার হাতে এলো। ১৯৭৮ সালে তিনি চীনের ভবিষ্যৎ পালটে দিলেন এক ঘোষণা দিয়ে, সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ। সেদিন থেকে চীন আর আগের মতো রইল না। কৃষককে বললেন, রাষ্ট্রের নামে সব দিয়ে দেউলিয়া হওয়ার দরকার নেই। জমির ফসলের একটা অংশ নিজেরাই রাখো, নিজের সন্তানদের মুখে ভাত দাও।

 

 

তাতে উৎপাদন বাড়ল, প্রণোদনা ফিরল। বিদেশিদের বললেন, এসো, বিনিয়োগ করো। আমাদের মাটিতে কারখানা গড়ো, বন্দর বানাও। স্পেশাল ইকোনমিক জোন বানালেন শেনজেনকে, যা পরে হয়ে উঠল এক বিশাল কারখানার শহর। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে বেঁধে রাখা শিকল একটু আলগা করে দিলেন, বাজার অর্থনীতির হাতছানিকে টেনে আনলেন। কিন্তু রাজনীতির রাশ? না, সেটা কখনোই ছাড়েননি।

 

 

কমিউনিস্ট পার্টির লাল পতাকার নিচে সবকিছু বাঁধা রইল। দেংয়ের সেই বিখ্যাত বাক্য, যা তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে-‘বিড়াল কালো না সাদা, তাতে কী আসে যায়? ইঁদুর ধরতে পারলেই বিড়াল আসল।’ অর্থাৎ আদর্শ, তত্ত্ব, বিপ্লবের ধ্বনি-সবই তুচ্ছ, যদি ক্ষুধার সমাধান না হয়। ফলাফলই একমাত্র সত্য। এই এক কথাতেই তিনি চীনের অর্থনৈতিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক, মতাদর্শিক বা নৈতিক গোঁড়ামি নয়, ফলাফলই আসল।

 

বাণিজ্য ও বাস্তববাদ : ইতিহাসের পটভূমি

দেংয়ের ১৯৭৮ সালে ‘সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ’ নীতি ঘোষণা করার সময় চীন ছিল দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, অকার্যকর রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কার্যত বিচ্ছিন্ন এক রাষ্ট্র। সেখান থেকে বাণিজ্যকেন্দ্রিক উন্মুক্তকরণ শুরু হলো। তারা বৈরী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেও প্রযুক্তি নিলো, আবার বিনিয়োগের মাধ্যমে আফ্রিকার গরিব রাষ্ট্রগুলোকেও নিজের পাশে টানল। এ বাস্তববাদী নীতি ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মাত্রা পেয়েছে। এখন চীন বলছে, ‘তুমি আমার শত্রু হতে পারো, কিন্তু তবু আমার সঙ্গে ব্যবসা করো।’ এ দর্শন শুধু অর্থনীতির হিসাব নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে কূটনীতি, ভূরাজনীতি, এমনকি সংস্কৃতির বিস্তারও।

 

 

নীতির উদ্দেশ্য : অর্থনীতি থেকে আধিপত্য

চীনের বহুপক্ষীয় বাণিজ্যনীতির উদ্দেশ্য তিনটি স্তরে বিভক্ত। সেগুলো হলো-১. অর্থনৈতিক প্রসার : বাজার দখল, রপ্তানি বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তি ও জ্বালানি নিশ্চিত করা। ২. আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তার : বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক মিত্রতা গড়া, ঋণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশগুলোকে প্রভাবিত করা। ৩. স্থিতিশীলতা : নিজস্ব অর্থনীতিকে ঝুঁকি থেকে বাঁচানো, বহিরাগত চাপে টিকে থাকা। চীন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধে লিপ্ত, অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সম্পর্কও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই বজায় আছে। অন্যদিকে পাকিস্তানকে ‘অল ওয়েদার ফ্রেন্ড’ বলে আঁকড়ে ধরে, কিন্তু ভারতের সঙ্গে শত শত কোটি ডলারের আমদানি-রপ্তানিও চালিয়ে যায়। এ দ্বৈত আচরণকে অনেকেই কৌশলগত ভণ্ডামি বলতে পারেন, কিন্তু বাস্তবে এটি এক ঠান্ডামাথার হিসাব। অর্থনীতি আগে, বাকি সব পরে। চীনের নীতিকে বোঝার জন্য কয়েকটি উদাহরণই যথেষ্ট।

 

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (২০১৩)

এটা বিশাল এক অবকাঠামোগত ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। যার মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে ধীরে ধীরে সড়ক, রেল, বন্দর গড়ে তুলছে চীন। এর মাধ্যমে শুধু বাণিজ্য নয়, কৌশলগত প্রভাবও বিস্তার করছে তারা। আফ্রিকার নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, কেনিয়া; যেখানে পশ্চিমারা বিনিয়োগে অনাগ্রহী, সেখানে চীন যাচ্ছে। বন্দর বানাচ্ছে, রেললাইন বসাচ্ছে, তেল কিনছে। ফলে আফ্রিকার অনেক রাষ্ট্র এখন চীনের ওপর নির্ভরশীল। লাতিন আমেরিকার ভেনিজুয়েলার তেল থেকে ব্রাজিলের কৃষি পর্যন্ত-চীন নিজের উপস্থিতি দেখাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যের মূল্য ২০২৩ সালে প্রায় ৬৯০ বিলিয়ন ডলার!

 

 

সমালোচনা ও বিতর্ক

তবে এ নীতির সমালোচনাও কম নয়। পশ্চিমা দুনিয়া বলছে, চীন আসলে ‘ঋণের ফাঁদ’ তৈরি করছে। দরিদ্র দেশগুলোকে ঋণ দিয়ে তাদের বন্দর বা খনিজসম্পদের ওপর দখল নিতে চাইছে। আবার অনেক দেশ আশঙ্কা করছে, চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তাদের স্বার্থকে বিপন্ন করবে। একই সঙ্গে চীনের মানবাধিকার ইস্যু, তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগর বিরোধ, এসব রাজনৈতিক উত্তেজনা অর্থনৈতিক সম্পর্ককে বারবার চাপে ফেলে।

 

 

ভবিষ্যৎ : শক্তি নাকি ফাঁদ?

চীনের বহুপক্ষীয় বাণিজ্যনীতি ভবিষ্যতে তাকে বৈশ্বিক নেতৃত্বের জায়গায় বসাতে পারে। অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক যত বিস্তৃত হবে, চীনের ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়বে। ফলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার কণ্ঠস্বর আরও দৃঢ় হবে। কিন্তু ঝুঁকিও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক, সামরিক ঘেরাও। ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান ইস্যুতে যুদ্ধের আশঙ্কা। অভ্যন্তরীণ সমস্যা, জনসংখ্যা সংকট, ধীরগতির অর্থনীতি, ঋণের চাপ। বিশ্বাসের সংকট, অনেক দেশ মনে করছে, চীন তাদের প্রভাবিত করছে, তাই তারা বিকল্প খুঁজতেও পারে। অতএব এ নীতি চীনের জন্য যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি অনেক দোটানা এবং অনিশ্চয়তাও ডেকে এনেছে।

 

 

উপসংহার

আজকের পৃথিবী আসলে দ্বৈত দ্বন্দ্বের ভেতর দাঁড়িয়ে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক-রাজনৈতিক আধিপত্য, অন্যদিকে চীনের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। ভবিষ্যতের ইতিহাস লিখবে, কে জিতল? ট্যাঙ্ক না ট্রেন, মিসাইল না বন্দর! কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, চীন বিশ্বকে শিখিয়েছে : শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে ব্যবসা করার মধ্যেই আছে আধুনিক রাষ্ট্রনীতির আসল শক্তি। এ শিক্ষা হয়তো আমাদেরও নিতে হবে, যদি বিশ্বায়নের যুগে টিকে থাকতে চাই।


সাইফুল খান

ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক