কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

চীনের উত্থানে আমেরিকার নতুন হিসাব

ইন্দো-প্যাসিফিক এখন আর শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং একুশ শতকের বৈশ্বিক ক্ষমতার পুনর্গঠনের প্রতীক। চীনের উত্থান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মো: ওবায়দুল্লাহ ও মো: মেহেদী হাসান [প্রকাশ : নয়াদিগন্ত, ১৮ অক্টোবর ২০২৫]

চীনের উত্থানে আমেরিকার নতুন হিসাব

একুশ শতকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো মেজর পাওয়ার হিসেবে চীনের উত্থান। একসময় যাকে বলা হতো ‘বিশ্বের কারখানা’ সেই চীন এখন অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি ও কূটনীতির শক্তিধর কেন্দ্র। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (ওগঋ) তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে চীনের অর্থনীতি ছিল বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম; আজ তা যুক্তরাষ্ট্রের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে। ২০২৪ সালে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ১৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় ১৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রতিরক্ষা বাজেট বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০০০ সালের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি বেড়েছে। এই উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একমেরু বিশ্বব্যবস্থার প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এখন নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্ব›িদ্বতার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

 
 

চীনের উত্থান নিছক অর্থনৈতিক নয়। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ ও ‘ডিজিটাল সিল্ক রোড’ প্রকল্পের মাধ্যমে চীন ইতোমধ্যে ১৫০টিরও বেশি দেশে বিনিয়োগ করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে এখন পর্যন্ত এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বরাদ্দ বা প্রতিশ্রুত হয়েছে। এসব প্রকল্প অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। পাকিস্তানের গওদার থেকে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা পর্যন্ত চীনের উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান। একই সাথে দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক ঘাঁটি, কৃত্রিম দ্বীপ এবং নৌবাহিনী মোতায়েনের মাধ্যমে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কৌশলগত প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতরের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের সামরিক কার্যক্রম ১৯৯০ দশকের তুলনায় ৩০ গুণ বেড়েছে।

 

 

চীনের এই দ্রুত উত্থান যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কৌশলগত হিসাব কষতে বাধ্য করেছে। ওয়াশিংটনের কাছে এটি কেবল অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; বরং উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি চ্যালেঞ্জ। সেই কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এখন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের আওতায় নতুন জোট ও অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত দু’টি জোট হলো কোয়াড ও অকাস। কোয়াডে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া একত্র হয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে চীনের প্রভাব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।

 

 

 

অন্য দিকে, অকাস জোটের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া সামরিক সহযোগিতা, বিশেষ করে নিউক্লিয়ার সাবমেরিন প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে চীনের সামরিক স¤প্রসারণে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। র‌্যান্ড করপোরেশনের এক গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বছরে প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা ব্যয় করছে, যা এক দশক আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

 

 

 

আজকের বিশ্বে প্রযুক্তিই নতুন শক্তির মাপকাঠি। ফলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা এখন অর্থনীতি বা সামরিক খাতের বাইরে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের দিকেও বিস্তৃত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ৫-জি, সেমিকন্ডাকটর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে চীনের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। হুয়াওয়ে, জেডটিই ও এসএমআইসির মতো চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এক নতুন প্রযুক্তিগত শীতল যুদ্ধের সূচনা করেছে। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’ পাস করে স্থানীয় চিপ উৎপাদনে ৫২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয়। জবাবে চীনও ২০২৪ সালে নিজেদের সেমিকন্ডাক্টর তহবিলে ৪৭ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ ঘোষণা করে। এই প্রতিযোগিতা শুধু প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং ভবিষ্যতের তথ্যনির্ভর বিশ্বব্যবস্থা কার হাতে থাকবে তারই লড়াই।

 

 

 

ইন্দো-প্যাসিফিক বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির অঞ্চলগুলোর একটি। তাইওয়ান প্রণালী ও দক্ষিণ চীন সাগরে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে চীনের যুদ্ধবিমান প্রায় ৪০০ বারের বেশি তাইওয়ানের আকাশসীমার কাছে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন অপারেশন্স’ নামে নিয়মিত নৌ-মহড়া চালাচ্ছে। তাইওয়ান ইস্যু এখন এক ফ্লাশপয়েন্ট, যেখানে চীনের ‘এক চীন নীতি’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘কৌশলগত দ্ব্যর্থতা’ মুখোমুখি অবস্থানে। এই পরিস্থিতিতে সামান্য ভুল পদক্ষেপও সঙ্ঘাত সৃষ্টি করতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘিœত করবে।

 

 

এই প্রতিযোগিতা কেবল অর্থনীতি বা সামরিক শক্তির নয়, এটি মূলত এক আদর্শিক সংঘর্ষ। চীন তার রাষ্ট্রনির্ভর উন্নয়ন মডেল বা ‘স্বৈরতান্ত্রিক পুঁজিবাদ’ (অঁঃযড়ৎরঃধৎরধহ ঈধঢ়রঃধষরংস)-এর মাধ্যমে দেখাতে চায়, গণতন্ত্র ছাড়াও দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্র উদার গণতন্ত্র ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার (জঁষবং-নধংবফ ঙৎফবৎ) পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে বিশ্ব আবার এক নতুন আদর্শিক মেরুকরণের দিকে এগোচ্ছে।

 

 

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এই প্রতিযোগিতা এক জটিল কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। একদিকে চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, যেমন- পদ্মা সেতু, পায়রা বন্দর ও কর্ণফুলী টানেল, অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি ও ব্লু ডট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে স্বচ্ছ বিনিয়োগের প্রস্তাব। এই টানাপড়েনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এখন কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলার, আর যুক্তরাষ্ট্রের ছিল ৬৮০ মিলিয়ন ডলার- দুই দেশই এখন এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতা করছে।

 

 

 

সবশেষে বলা যায়, ইন্দো-প্যাসিফিক এখন আর শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং একুশ শতকের বৈশ্বিক ক্ষমতার পুনর্গঠনের প্রতীক। চীনের উত্থান শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ব এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সহযোগিতার পথে এগোবে, নাকি দ্বিতীয় শীতল যুদ্ধের নতুন অধ্যায় শুরু হবে? আমেরিকা ও চীনের প্রতিটি পদক্ষেপই আগামী দশকের বিশ্ব রাজনীতির দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।

 

 

লেখকদ্বয়: যথাক্রমে সাউদার্ন মিসিসিপি ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী