কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

চীন-ভারত সম্পর্ক এবং মার্কিন আধিপত্যের ভবিষ্যৎ

এইচ এম সাব্বির হোসাইন [সূত্র : সমকাল, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

চীন-ভারত সম্পর্ক এবং মার্কিন আধিপত্যের ভবিষ্যৎ

সম্প্রতি শানডং-এ বিভিন্ন বিশ্বনেতাকে চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং বরণ করে নিলেন, যেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও উপস্থিত ছিলেন। উপলক্ষ সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সম্মেলন। এসসিওকে অনেকেই শিথিল কাঠামোর একটি সংগঠন হিসেবে দেখেন, যেখানে ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি নেই। তবুও এর রাজনৈতিক বার্তা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। এখানে মূল প্রশ্ন দাঁড়ায়, চীন ও ভারতের সম্পর্ক যদি ঘনিষ্ঠ হয়, তাহলে এর বৈশ্বিক প্রভাব কী হতে পারে?

 

 

গত কয়েক দশক ধরে সীমান্ত বিরোধ, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বিশ্ব পরিসরে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান চীন ও ভারতের মধ্যে টেকসই বিশ্বাস গড়ে উঠতে দেয়নি। ১৯৬২ সালের সীমান্ত যুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষ এই টানাপোড়েনের জ্বলন্ত প্রমাণ। তবে ইতিহাসে এমন মুহূর্তও এসেছে, যখন কৌশলগত বাস্তববাদ তাদের কাছাকাছি এনেছে। যেমন ব্রিকসে যৌথ অংশগ্রহণ কিংবা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় একই অবস্থান গ্রহণ। বর্তমান পরিস্থিতিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে ভূরাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন। যে যুক্তরাষ্ট্রকে একসময় ভারতের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার অংশীদার হিসেবে দেখা হতো, সম্প্রতি দেশটি ভারতীয় পণ্যের ওপর কঠোর শুল্ক আরোপ করেছে। 

 

সত্য, ভারতে চীনবিরোধী মনোভাব শুধু রাজনৈতিক অভিজাতদের মধ্যে নয়; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক, বিশেষ করে ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর থেকে। অন্যদিকে চীনে নীতিনির্ধারকরা ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কোয়াডে অংশগ্রহণকে কৌশলগত হুমকি হিসেবে দেখেন। প্রশ্ন হলো, বাস্তববাদী অর্থনৈতিক সহযোগিতা কি এই কৌশলগত সন্দেহকে অতিক্রম করতে পারবে? যদি সম্পর্ক দাঁড়ায় সহযোগিতারূপে, আত্মসমর্পণ নয়, তবে শি ও মোদি উভয়েই এটিকে জাতীয় শক্তি বৃদ্ধির পথ হিসেবে জনগণের কাছে বিক্রি করতে পারবেন।

 


বৈশ্বিক পরিসরে চীন-ভারত ঘনিষ্ঠতার প্রভাব হবে ব্যাপক। প্রথমত, এটি এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য পাল্টে দেবে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া ভারতের ওপর নির্ভর করছে চীনা প্রভাব মোকাবিলায়। যদি নয়াদিল্লি আংশিক হলেও বেইজিং-এর দিকে ঝুঁকে যায়, তবে ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল দুর্বল হয়ে পড়বে। ওয়াশিংটনকে তার আঞ্চলিক কৌশল নতুন করে ভাবতে হবে। কারণ চীনকে প্রতিহত করার ক্ষেত্রে ভারতের ভূমিকাই মুখ্য। দ্বিতীয়ত, চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠতা ব্রিকস ও এসসিওর মতো প্রতিষ্ঠানের শক্তি বাড়াবে। তারা বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো সংস্কারের দাবি তুলতে পারে। ডলারের বদলে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়াতে পারে, এমনকি নিরাপত্তা সহযোগিতাও জোরদার করতে পারে। এর ফলে বহু-মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার ধারা আরও ত্বরান্বিত হবে এবং পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

 

 

চীন ও ভারত বিশ্বের দ্রুত প্রবৃদ্ধিশীল বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য; তাদের সম্মিলিত বাজারের আকার তুলনাহীন। প্রযুক্তি, জ্বালানি ও বাণিজ্যে সহযোগিতা গড়ে উঠলে এর ঢেউ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যৌথ প্রচেষ্টা বৈশ্বিক টেকসই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করতে পারে। আবার উৎপাদন খাতে যৌথ বিনিয়োগ পশ্চিমা সরবরাহ চেইনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারে। আফ্রিকায়, যেখানে উভয় দেশই প্রভাব বিস্তার করছে, ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা পশ্চিমা প্রভাবকে আরও সংকুচিত করতে পারে।

 


চীন-ভারতের সম্পর্ক দৃঢ় হবে কিনা, তা নির্ভর করবে বহিরাগত চাপ ও অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশের ওপর। শেষ পর্যন্ত চীন ও ভারতের প্রকৃত অংশীদারিত্ব গড়ে উঠলে সেটি হবে একুশ শতকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন। এটি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অঞ্চল নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে এশিয়ার উত্থানকে চিহ্নিত করবে। এ সম্পর্ক সত্যিকার অর্থে রূপান্তরমূলক জোটে পরিণত হবে কিনা, নাকি কেবল অস্থায়ী সুবিধাবাদী সমঝোতা হিসেবে থাকবে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহের ওপর। তবে আপাতত বিশ্বকে সজাগ থাকতেই হবে। কারণ বেইজিং ও নয়াদিল্লির সিদ্ধান্ত এশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক শক্তির গতিপথ আঁকবে নতুনভাবে।

 

 

এইচ এম সাব্বির হোসাইন: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়