কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

চীন-জাপানের কৌশলগত সম্পর্কে অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা

ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৭ নভেম্বর ২০২৫]

চীন-জাপানের কৌশলগত সম্পর্কে অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা

তাইওয়ান নিয়ে আবার নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে, যার মাত্রা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। এবার এশিয়ায় শক্তিশালী দুই প্রতিবেশী চীন-জাপান একে অপরের মুখোমুখি হয়েছে। তাইওয়ান নিয়ে চীনের অবস্থান এবং সেখানে চীনের সামরিক অভিযানের সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে গত ৭ নভেম্বর জাপানের সংসদে সে দেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জানিয়েছিলেন যে চীন যদি তাইওয়ানেও হামলা পরিচালনা করে, তবে নিজেদের নিরাপত্তা শঙ্কা মোকাবেলার স্বার্থে তারাও সেখানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করবে। জাপানের এই ঘোষণাকে চীন গুরুত্বপূর্ণ হুমকি হিসেবে দেখছে এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে জাপানে ভ্রমণ পরিহার এবং চীনের শিক্ষার্থীদের জাপানে না যাওয়ার আহবান জানিয়েছে।

 

 


এই আহ্বানের পর কমপক্ষে সাতটি চীনা উড়োজাহাজ কম্পানি বিনা মাশুলে যাত্রীদের আগাম টিকিটের মূল্য ফেরত দেওয়ার কথা জানিয়েছে। জানা গেছে, এরই মধ্যে চীন থেকে জাপানগামী কয়েক লাখ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।

 


উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে চীন বা জাপান কার অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব পড়বে, সেটি আপাতত বলা না গেলেও এটি অনুমান করা দুরূহ নয় যে পরিস্থিতির যদি উন্নতি না হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই উভয় দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিষয়টি পুরোই নির্ভর করছে এই উত্তেজনা কত দিন চলবে এবং কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে তার ওপর।

 


চীনের ঘোষণার পর জাপানের পক্ষ থেকেও চীন সফররত জাপানি নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থে জনসমাগমপূর্ণ এলাকা পরিহার করে চলতে বলা হয়েছে।  

 


চীন ও জাপানের মধ্যে ঐতিহাসিক কিছু সমস্যা বিদ্যমান থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে উভয়েই এক ধরনের স্থিতাবস্থাকে সমর্থন জানিয়েছে, যার জেরে উভয়ের পারস্পরিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এটি উল্লেখযোগ্যভাবে কাজ করে। চীনের অর্থনীতিতে পর্যটনশিল্পের অবদানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা জাপানের, দেশটিতে প্রতিবছর প্রচুর সংখ্যায় জাপানি পর্যটক ভ্রমণ করেন। একই সঙ্গে জাপানও এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে দেশটিতে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি চীনা শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে, যা যেকোনো দেশের শিক্ষার্থীর চেয়ে বেশি।

 

 


এর বাইরেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক এশিয়ার অপরাপর দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের তুলনায় সন্তোষজনক রয়েছে।
বর্তমান এই উত্তেজনা অতীতের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়; যেমন—১৯৪৯ সালের চীনা বিপ্লবের সময় জাপানের পক্ষ থেকে চীনের সরকারকে সমর্থন দেওয়া হয়নি, বরং তাইওয়ান নিয়ন্ত্রিত চীনকেই তারা সমর্থন করে যেতে থাকে। আরো একটু পেছনে তাকালে আমরা দেখব, ১৮৬৮ সালে জাপানে মিজি পুনরুদ্ধারের পর থেকে জাপান পশ্চিমা প্রভাববলয়ের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে নতুন বিরোধে জড়ায়, যার এক পর্যায়ে ১৯৩১ সালে জাপান কর্তৃক মাঞ্চুরিয়া দখল, পরবর্তী সময়ে চীনের বিশাল এলাকা জাপানের নিয়ন্ত্রণে যাওয়া এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সময়ে জাপানের দখল থেকে মুক্ত হওয়া—এই সবকিছু দুই দেশের সম্পর্কে স্বাভাবিক সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭২ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন বোঝাপড়ার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেকটা স্বাভাবিক করা হয়। ১৯৭৮ সালে চীনের পুনর্গঠন নীতির ফলে এই সম্পর্কের আরো উন্নতি ঘটে এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে একে অপরের আরো কাছে আসে।

 

 


এই সময়ের পর থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে বড় ধরনের কোনো অস্বস্তি না থাকলেও ২০১০ সালে সেনকাকু দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আবার সম্পর্কের কিছুটা অবনতি হলেও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের স্বার্থে তারা তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। জাপান কর্তৃক ব্যক্তিমালিকানায় থাকা দ্বীপপুঞ্জটি কিনে নিজেদের অংশে পরিণত করার পর থেকে চীন এটিকে নিজের বলে দাবি করে আসছিল। সম্প্রতি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির তাইওয়ানবিষয়ক বক্তব্যের পর চীন সেখানে কোস্ট গার্ড পাঠিয়েছে এবং ড্রোন অভিযান পরিচালনা করেছে। দ্বীপটি পূর্ব চীন সাগরে অবস্থিত। এটি তাইওয়ানের উত্তর-পূর্বে, চীনের পূর্বে এবং জাপানের ওকিনাওয়া দ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত। তাইওয়ান থেকে এর দূরত্ব মাত্র ১২০ নটিক্যাল মাইল। চীনের এই অবস্থান নতুন করে উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

 

 


আমাদের এখন বোঝা দরকার যে জাপানের পক্ষ থেকে যে বক্তব্যটি এসেছে, সেটিকে তারা নিজেরা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এর সঙ্গে কি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না। আমরা জানি, জাপান ১৯৭২ সালের পর থেকে ‘এক চীন’ নীতিকে মেনে নিলেও তাইওয়ানের সঙ্গে তারা নিবিড় সম্পর্ক রক্ষা করে চলে। এর পেছনে কিছু ঐতিহাসিক ও বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে। জাপান একসময় তাইওয়ান উপনিবেশের অংশ ছিল এবং পরবর্তী সময়ে তাইওয়ানের সংস্কৃতিতে জাপানের বড় ধরনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তাইওয়ান প্রশান্ত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে চীন যদি সেখানে অভিযান পরিচালনা করে সফল হয়, তাহলে সেনকাকু দ্বীপসহ জাপানের নিরাপত্তার জন্য নিশ্চিতভাবেই সংকট সৃষ্টি করবে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণেও এটির প্রভাব পড়বে।

 

 

বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে এবং এশিয়ার অর্থনীতিতে প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে চীন ও জাপান উভয়েই একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে। তাইওয়ানও প্রযুক্তির দিক দিয়ে বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এবং জাপানের অর্থনীতিতে এর ভূমিকা অপরিসীম। এ ক্ষেত্রে চীনের আগ্রাসন প্রকারান্তরে জাপানের অর্থনৈতিক স্বার্থকেই বাধাগ্রস্ত করবে। তা ছাড়া তাইওয়ানের বাণিজ্যিক পথগুলোও জাপানের বিশ্ববাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই বিবেচনায় জাপানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বজায় রেখে চলতে হলে তাইওয়ানকে কোনোভাবেই অস্থিতিশীল হতে এবং চীনের নিয়ন্ত্রণে যেতে দেওয়া যাবে না। এটিই হচ্ছে জাপানের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার যত কারণ।

 

 

 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ করে কেনই বা জাপানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এলো, যা এই নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গেলে এটি ধারণা করা যেতেই পারে যে তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের দীর্ঘ সময় ধরেই উত্তেজনাকর সম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও জাপানের মতো ‘এক চীন’ নীতিকে সমর্থন করলেও তাইওয়ানের প্রতি তাদের সমর্থন বরাবরই পক্ষপাতদুষ্ট। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে বৈঠক করতে দেখেছি, সেই সঙ্গে একই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ায়ও সফর করেছেন তিনি। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক-পরবর্তী যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জাপানের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতির কথা জানান দেন এই বলে যে জাপানের প্রয়োজনে সব ধরনের সমর্থন দেওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।

 

 

চীনের আচরণে বোঝা যায় যে তারা জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কথার মর্মার্থ অনুধাবন করতে পেরেছে, না হলে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর একটি কথাকে কেন্দ্র করে এমন আক্রমণাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। অতীতের মতো চীন এটিই জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে যে তাইওয়ান নিয়ে চীনের চিন্তা-ভাবনার বাইরে কেউ যাওয়ার চেষ্টা করলে তারা যেকোনো সময় যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। দুই পক্ষ যদি দ্রুততম সময়ে সংকট নিরসনে আলোচনায় না বসে, তাহলে হয়তো এই এলাকা অর্থাৎ তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোসহ আরো কৌশলগত অংশীজন চীনের বিরুদ্ধে একাট্টা হওয়ার চেষ্টা করবে। চীনের পক্ষ থেকেও হয়তো উত্তর কোরিয়ার শাসককে উসকে দেওয়ার চেষ্টা থাকতে পারে। এমনটি হলে অপ্রত্যাশিতভাবে নতুন ধরনের অস্থিরতা শুরু হতে পারে অঞ্চলটি ঘিরে।

 

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়