চার সংকটে তৈরি পোশাক খাত

চার সংকটে তৈরি পোশাক খাত
সংবাদবাংলাদেশ

চার সংকটে তৈরি পোশাক খাত

১২ জুলাই, ২০২৬

আব্দুল্লাহ কাফি [সূত্র : আমাদের সময়, ১২ জুলাই ২০২৬]

জ্বালানি সংকট, ব্যাংকের অসহযোগিতা, রাজস্ব বোর্ডের বিনিয়োগ-পরিপন্থি সিদ্ধান্ত এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি- মূলত এই চারটি কারণে তৈরি পোশাক খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নেই। এমনটাই মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, প্রতিনিয়ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পুরনো কারখানা। নতুন কারখানাও হচ্ছে না। একদিকে রপ্তানি কমছে, অন্যদিকে নতুন বাজার ধরা যাচ্ছে না। বৈশি^ক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে ব্যবসায়ীরা উদ্বেগের মধ্যে আছেন। ফলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও শিল্প খাতের সামগ্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এখনও পর্যন্ত তারা আশার কিছু দেখছেন না।

 

 

এ খাতের উদ্যোক্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, গত ছয় মাসে ১০০টির বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সময়ে নতুন বিনিয়োগের উদ্যোগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য- উচ্চ সুদের ঋণ, গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় বড় বড় অনেক কারখানাও টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।

 

 

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানার কার্যক্রম বন্ধ করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে সীমিত সক্ষমতায় উৎপাদন চালাচ্ছে। এসব কারখানাও রয়েছে মারাত্মক আর্থিক ঝুঁঁকিতে।

 

 

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে দেশীয় পর্যায়ে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও কমছে।

 

 

জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমাদের সময়কে বলেন, পোশাক খাতে অনেক দিন ধরে বিনিয়োগ খড়া যাচ্ছে। বৈশি^ক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, বৈশি^ক মহামারী করোনা ভাইরাসের ধাক্কার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব, ট্রাম্প সরকারের অসম শুল্কনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট তথা পর্যান্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ না পাওয়া। পাশাপাশি দাম বৃদ্ধি, ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কিছু বিনিয়োগবিরোধী সিদ্ধান্ত ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণে বিনিয়োগ বাড়ছে না। ব্যবসায়ীরা ভয়ে বিনিয়োগ করছেন না। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।

 

 

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্পে স্বল্পসুদে অর্থায়ন, জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, উৎপাদন ব্যয় কমানো, নতুন রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। অন্যথায় আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ে খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

 

 

বিজিএমইএর সহসভাপতি ইনামুল হক খান (বাবলু) বলেন, সরকার বন্ধ কারখানা চালুর নিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা ভালো দিক। তবে প্রতিনিয়ত পুরনো কারখানা বন্ধ হচ্ছে। এটা খুবই দুঃখজনক। পোশাক খাতে বিনিয়োগ নেই, যা সার্বিক অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। এ মুহূর্তে পোশাক খাতে ভালো কিছু দেখা যচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি। বলেন, সরকার অনেকগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু এর ফল পেতে বেশ সময় লেগে যাবে। তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীদের মধ্যে দিন দিন উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে রপ্তানি কমছে, অন্যদিকে নতুন বাজার ধরা যাচ্ছে না। পুরনো বাজারও দিন দিন মন্দাবস্থায় পতিত হচ্ছে। এসব কারণে আমরা চিন্তিত। এর মধ্যে আবার গ্যাস-বিদ্যুৎ না থাকাও বড় সংকট তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

 

 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি এই খাত থেকে আসে এবং প্রায় ৪০ লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বে বাংলাদেশ এখনও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছর বাংলাদেশের পোশাকশিল্প একদিকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার কমে যাওয়ার মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এর মধ্যেও ইতিবাচক দিক হচ্ছে- বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। পরিবেশবান্ধব (সবুজ) কারখানার সংখ্যা বিশ্বে সর্বাধিক হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থায় রয়েছে এ দেশ। যদিও এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার শঙ্কাও রয়েছে। উপরন্তু প্রতিযোগী দেশ যেমন ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।

 

 

 

এদিকে সরকার রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যাংকিং ও কর-ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বাজেটেও রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে পোশাক খাতকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

 

 

বর্তমান রপ্তানি পরিস্থিতি

 

 

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে আসে। বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ। পরবর্তী কয়েক মাস রপ্তানি পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেলেও জুলাই-মে সময়ে নিম্নমুখী প্রবণতা ছিল। বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রধান গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপান।

 

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।

 

 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর (জুলাই-জুন) শেষে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাজার অংশীদারত্ব আরও কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনও বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি গন্তব্য। তবে এই বাজারে রপ্তানি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ১৯ দশমিক ০৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। ফলে মোট পোশাক রপ্তানিতে ইইউর অংশীদারত্ব ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ থেকে কমে ৪৯ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমেছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাক্কালে এটি বাজার বৈচিত্র্যকরণের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

 

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় প্রবৃদ্ধি

 

 

যুক্তরাষ্ট্র : রপ্তানি ৭ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট রপ্তানিতে দেশটির অংশীদারত্ব ১৯ দশমিক ১৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ দশমিক ০১ শতাংশে পৌঁছেছে।

 

 

যুক্তরাজ্য : রপ্তানি ৪ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ০ দশমিক ৯১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজার অংশীদারত্ব বেড়ে ১১ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

 

 

কানাডা : রপ্তানি ১ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ৩ দশমিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট রপ্তানিতে অংশীদারত্ব বেড়ে ৩ দশমিক ৪৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

 

 

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডা এখন বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ৩৫ শতাংশেরও বেশি অংশের প্রতিনিধিত্ব করছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানি হ্রাসের প্রভাব আংশিকভাবে সামাল দিতে সহায়তা করেছে।

 

 

অপ্রচলিত বাজারেও রপ্তানি কমেছে

 

 

জাপান, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক এবং উপসাগরীয় দেশগুলোসহ অপ্রচলিত বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। ফলে এসব বাজারের সম্মিলিত অংশীদারত্ব ১৬ দশমিক ৩৬ শতাংশ থেকে কমে ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইইউর পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারেও রপ্তানি কমেছে। এখান থেকেই বোঝা যায় চলতি অর্থবছরের রপ্তানি কেবল বড় বাজার নয়, অপ্রচলিত বাজারেও রপ্তানি কমেছে। এসব বাজারে নিট পোশাকের তুলনায় ওভেন পোশাক ভালো করেছে।

 

 

পণ্যভিত্তিক হিসাবে নিটওয়্যার রপ্তানি ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ কমেছে, অন্যদিকে ওভেন পোশাকের রপ্তানি মাত্র ০ দশমিক ৬১ শতাংশ কমেছে। এর ফলে চলতি অর্থবছরের অধিকাংশ সময়ের মতোই ওভেন খাত নিটওয়্যারের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভালো করেছে।

 
 
ট্যাগ:BCSসংবাদবাংলাদেশ