বসনিয়া থেকে গাজা এবং নীরবতার মূল্য
দামির মিত্রিক ও জিল ক্লেইন [প্রকাশ : সমকাল, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫]

গণহত্যা প্রতিরোধ বা থামিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমরা অতীতের গণহত্যার ভুক্তভোগীদের প্রতি সম্মান জানাই। একই সঙ্গে তাদের স্মৃতি জীবন্ত রাখি। এরই মধ্য দিয়ে আমরা যুক্তিসংগত মানবিক আচরণ এবং অন্যদের ওপর অকল্পনীয় সহিংসতা চালানোর ক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট সীমারেখা টেনে দিই। এ প্রক্রিয়ায় অতীতের দুঃখকষ্টের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়, অন্তত সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে সাহায্য করা যায়।
এ কারণে গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের জন্য এবং যারা তাদের পিতা-মাতা ও দাদা-দাদির কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে এই বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা পেয়ে আসছে তাদের জন্য ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর ইসরায়েল রাষ্ট্রের নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করা বেদনাদায়ক। স্বাভাবিকভাবেই যে কেউ গাজায় শিশুসহ হাজার হাজার নিরীহ মানুষের হত্যার জন্য শোকাহত হবে। কিন্তু কেউ কেউ প্রতারিতও বোধ করে। কারণ গণহত্যায় ঘটে যাওয়া সহিংসতার পুনরাবৃত্তি অনেক আগে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মৃতিকে অসম্মানিত করে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম দর্শকদের নৃশংসতা প্রত্যক্ষ করার ধরনে পরিবর্তন এসেছে। হাঙ্গেরিতে জিন দেখেছেন, কীভাবে তাঁর নিজের শহরের লোকজন ইহুদিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনাবলি পাশ কাটিয়ে চলে যেত। তাঁর উচ্চ বিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রিত একজন হাঙ্গেরীয় নাৎসি চিৎকার করে যখন বলেছিল, ইহুদিরা ইউরোপের সব ধরনের সমস্যার কারণ, তখন শিক্ষকরা মৌন মুখে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই একই শিক্ষকদের একজন আবার শহরের ইহুদিদের চিহ্নিত করতে হাঙ্গেরীয় পুলিশকে সাহায্যও করেছিলেন, যাতে তাদের নির্বাসিত করা যায়। অন্যান্য শহরবাসী ইহুদির তাড়ানোর সময় নিজেদের পর্দার আড়াল থেকে তাকিয়ে দেখছিল।
১৯৯২ সালে বসনিয়ায় গণকবর খননকালে গ্রামবাসী মৃত্যুযন্ত্রের কারবার দেখেছে। পচে-গলে ছড়িয়ে যাওয়া উৎকট দুর্গন্ধ পেয়েছিল, কিন্তু তারা কিছুই বলেনি। প্রতিবেশীরা জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরেছে, কিন্তু তারাও ছিল নিশ্চুপ। ইউরোপ এক হাজার ৪২৫ দিন ধরে সরাসরি টেলিভিশনে দামিরের জন্মস্থান সারায়েভোর অবরোধের সাক্ষী হয়েছে। এক হাজার ৫০০ জন খুন হয়েছে এবং আহত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১৫ হাজারে। ১৯৯৫ সালে স্রেব্রেনিৎসাকে জাতিসংঘের সুরক্ষাধীন ‘নিরাপদ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশ্ব দেখেছিল কীভাবে জাতিসংঘের সৈন্যদের সামনে আট হাজার পুরুষ ও ছেলেকে পরিবার থেকে আলাদা করে এক সপ্তাহের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।
গণহত্যার জন্য কেবল হত্যাকারীদের দোষী সাব্যস্ত করা ঠিক নয়। বরং যারা তা দেখেও এড়িয়ে চলে, তারাও এর দায় এড়াতে পারে না। গণহত্যা কেবল অপরাধীদের মধ্য দিয়েই ঘটে, তা নয়। তার জন্য প্রত্যক্ষদর্শীদেরও প্রয়োজন পড়ে। বসনিয়ার গণহত্যা সান্ধ্যকালীন সংবাদে প্রচারিত হয়েছিল। এরই মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ দর্শক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে ওঠে।
আজ সামাজিক মাধ্যম আমাদের গণহত্যাকালে ভুক্তভোগীদের কথা শুনতে এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ করে দেয়। আহ্, যদি জিন তার অভুক্ত থাকা, দাসত্বের বেড়াজালে বন্দি থাকা এবং প্রতিদিনের আতঙ্কের কথা কাউকে শোনাতে পারত; দেখাতে পারত কীভাবে যে কাউকে গ্যাস চেম্বারের জন্য বেছে নেওয়া হচ্ছে। অথবা যদি ১০ বছর বয়সী দামির সারায়েভোতে তার অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের বেজমেন্টে মৃত্যুর ভয়, মর্টার শেলের ভয়াবহ শব্দ ও বোমা কত সহজেই মানুষের মাংস ও হাড় ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে, তা নিয়ে পোস্ট দিতে পারত!
আমরা এও কল্পনা করতে পারি, দামির তার ১২ বছর বয়সী চাচাতো ভাই ইব্রাহিমের তৈরি একটি ভিডিও ফের পোস্ট করেছে। ভিডিওতে তার বাবা-মা ও ১০ বছর বয়সী ভাই ওমর তাদের জ্বলন্ত গ্রাম থেকে পালানোর সময় দক্ষিণ বসনিয়ার পাহাড়ে সার্বরা তাদের আটক করে। আটক করার সঙ্গে সঙ্গে ভিডিওটি হঠাৎ থেমে যায়। ইব্রাহিম ও ওমরকে তাদের পরিবারের সঙ্গে হত্যা করা হয়। তাদের হাড় এখনও আলাদা অচিহ্নিত গণকবরে ছড়িয়ে আছে।
দুই বছর আগে আমরা ভাবতাম, লাখ লাখ মানুষের দ্বারা প্রাপ্ত এসব ব্যক্তিগত যোগাযোগ দুর্ভোগের অবসান ঘটাবে। আমরা ভাবতাম, দৃশ্যমানতার অভাব, ব্যক্তিগত সংযোগের অভাব এবং মানবিক দুর্দশা সম্পর্কে বিস্তারিত না জানার কারণেই গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। আর এসব কারণে আমদের অবস্থান গণহত্যার পক্ষে সম্ভব করে তুলেছিল।
মানবতার ওপর কি আমাদের খুব বেশি বিশ্বাস ছিল? এখনই সময় এ পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার। হলোকাস্টের সময় এমন কিছু মানুষ ছিল, যারা জীবন বাঁচাতে নেমে পড়েছিল। যখন জিনের পরিবারকে শহর ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, তখন সে দেখতে পেল যে, অন্য একটি স্কুলের একজন শিক্ষক তার বাড়ির সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে শোক জ্ঞাপন এবং টুপি খুলে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। দাসদের শ্রমশিবিরে কয়েক মাস অভুক্ত থাকার পর জিনকে একজন জার্মান বেসামরিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কাজ করার জন্য নিযুক্ত করা হয়, যিনি তাকে এসএস (হিটলারের বাহিনী) ডাইনিং রুম থেকে চুরি করা খাবার খাওয়াতেন। বসনিয়াও এর ব্যতিক্রম ছিল না।
ভালো মানুষরা সাহসী কাজ করেছে। কেউ কেউ ভুক্তভোগীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেননি। তারা নিজেদের অস্ত্র নামিয়ে চলে গিয়েছিলেন। দামিরের বন্ধুকে একজন সার্ব প্রতিবেশী বাঁচিয়েছিলেন। ওই প্রতিবেশী তাঁর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর পরিবারকে পূর্ব বসনিয়ার একটি কুখ্যাত কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বের করে এনেছিলেন, যেখানে ১৭ মাস ধরে তাদের নির্যাতন করা হয়েছিল। কয়েক দশক পর দামিরের এই বন্ধু তার উদ্ধারকারী সার্বের নামানুসারে নিজের শিশুর নাম রেখেছিলেন।
২০০০ সালে দামির উদ্বাস্তু হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। এখানে আসার পরপরই তিনি লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। একদিন ক্যাম্পাসে হাঁটার সময় একটি স্তম্ভের সঙ্গে আটকানো পোস্টারের বিভিন্ন স্তরের কয়েকটি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ধীরে ধীরে খননের মাধ্যমে তিনি ‘নীরবতাই সম্মতি’ কথাটি খুঁজে পান। এটি ছিল ১৯৯৩ সালের একটি পোস্টার, যেখানে বসনিয়ায় হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বোর্ক স্ট্রিটে প্রতিবাদের ঢাক দেওয়া হয়েছিল। তৎপরতা ও প্রতিরোধের এই অবশিষ্ট নিদর্শন দামিরকে দেখিয়েছিল, যখন তিনি ও তাঁর পরিবার বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছিলেন, তখন বিশ্বের অন্য প্রান্তের লোকজন সাহায্যের চেষ্টা করছিল।
সম্ভবত মেলবোর্ন ও সারাবিশ্বে গাজার সমর্থনে সংঘটিত সাপ্তাহিক বিক্ষোভগুলো একই সংহতির বার্তা দেয়। আর এখন সুমুদ ফ্লোটিলা গাজায় প্রতিবাদের চেয়েও হস্তক্ষেপের মতো বেশি কিছু করার জন্য এগিয়ে যাচ্ছে। তারা হয়তো অভাবীদের সাহায্য করতে সফল হবে না, কিন্তু অন্যরা কি তাদের ভূমিকা পালন করবে?
আমরা কি গণহত্যার অবসান ঘটাতে ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত, যেখানে আর কোনো দর্শক থাকবে না, নাকি সাধারণ মানুষের মতো কেবল একটি অন্তহীন লাইন তৈরি করব? আড়ালে লুকিয়ে রাখার জন্য কোনো সুযোগ নেই। ভুক্তভোগীরা আমাদের পর্দার সামনে, আমাদের ঘরে, আমাদের পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আহ্বান করছে। অবশ্য পদক্ষেপ নেওয়া বা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে আমাদের সবার ওপর।
দামির মিত্রিক: ইতিহাসবিদ, যার বসনিয়া যুদ্ধের ওপর গবেষণা ব্যাপক প্রচারিত; জিল ক্লেইন:
হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া একজনের কন্যা ও হলোকাস্ট বিশেষজ্ঞ; আলজাজিরা থেকে ভাষান্তরিত