বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন ভারসাম্যে ফিলিস্তিনের সম্ভাবনা
সৈকত ইসলাম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ২৫ অক্টোবর ২০২৫]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী যখন ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখনই আবির্ভূত হয় এক নতুন বৈশ্বিক শাসনকাঠামো। ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলনে জন্ম নেয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক, আর এর পরপরই গঠিত হয় গ্যাট, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থারূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই তিন প্রতিষ্ঠানই ছিল মূলত যুদ্ধোত্তর বিশ্ব অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার হাতিয়ার। কিন্তু ক্রমে এগুলো হয়ে ওঠে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয় উন্নত উত্তর গোলার্ধের হাতে।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নীতি ছিল মূলত পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির বিকাশে সহায়ক, তবে তা প্রায়ই উন্নয়নশীল দেশের ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করত। ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ নামে পরিচিত এই শর্তগুলো গ্রহীতা দেশগুলোকে বাজার উন্মুক্ত করা, রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন এবং বেসরকারীকরণের দিকে ঠেলে দেয়। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সহায়তার বিনিময়ে তাদের অভ্যন্তরীণ নীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশ এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার নির্ভরশীল অংশে পরিণত হয়।
তবে একুশ শতকে এসে এই প্রভাবশালী ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে নড়চড় শুরু হয়। চীন, ভারত, রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার নেতৃত্বে গঠিত ব্রিকস (BRICS) জোট নতুন এক অর্থনৈতিক ভারসাম্য তৈরির প্রয়াস চালাচ্ছে। এই দেশগুলো শুধু উদীয়মান অর্থনীতি নয়, বরং গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের রাজনৈতিক কণ্ঠ হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেছে। তাদের লক্ষ্য ছিল একটি বিকল্প উন্নয়নকাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে পশ্চিমা প্রভাব কম এবং অংশীদারির সুযোগ বেশি।
এই চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) এবং চীনের নেতৃত্বে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)।
এই দুটি প্রতিষ্ঠান এখন আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। এসব বিনিয়োগ কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়, বরং এক নতুন ধরনের ‘ডেভেলপমেন্ট ডিপ্লোমেসি’, যেখানে অর্থনৈতিক সহায়তার সঙ্গে জুড়ে আছে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগের বিস্তার। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআই এই কৌশলের প্রতীক, যা ইউরোপ থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত শতাধিক দেশকে অবকাঠামোগত নেটওয়ার্কে যুক্ত করছে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ফিলিস্তিনকে ব্রিকস জোটে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব এক নতুন দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করে।
মধ্যপ্রাচ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত ফিলিস্তিন দীর্ঘদিন ধরে দখল, সংঘাত ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার শিকার।
যদি ফিলিস্তিন ব্রিকসের আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তবে এটি কেবল রাজনৈতিক স্বীকৃতিই নয়, বরং বাস্তব অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের সুযোগ এনে দেবে। চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহায়তা, ভারত ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কূটনৈতিক অবস্থান—সব মিলিয়ে ফিলিস্তিনের জন্য এটি হতে পারে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের প্ল্যাটফর্ম।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল সহায়তা সাধারণত নির্দিষ্ট শর্তে আবদ্ধ থাকে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত বা দখলকৃত অঞ্চলের জন্য সব সময় বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু ব্রিকসের অর্থনৈতিক সহায়তা তুলনামূলকভাবে নমনীয় এবং অবকাঠামো ও মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে ফিলিস্তিনের পুনর্গঠন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য এটি কার্যকর হতে পারে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থায় একটি জাতির পুনর্গঠন সম্ভব—এর উজ্জ্বল উদাহরণ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের অর্থনীতি ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা শিল্পায়ন ও প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটায়। দক্ষিণ কোরিয়া ১৯৫০-এর দশকের যুদ্ধের পর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নীতিমালা দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বিপুল বিনিয়োগ করে। এর ফলেই আজ তারা বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির অন্যতম।
তাইওয়ানও একই পথে এগিয়েছে। সীমিত ভূখণ্ড ও সম্পদ নিয়েও তারা বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এই দেশগুলো প্রমাণ করেছে, উন্নয়ন শুধু আর্থিক সহায়তার ওপর নয়, বরং সুশৃঙ্খল নীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দক্ষ জনশক্তি গঠনের মাধ্যমে তারা মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্র হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ এবং বহুপক্ষীয় অংশীদারির সুযোগ। ব্রিকসের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়া এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে—যদি এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং কাঠামোগত পুনর্গঠনের দৃষ্টিকোণ থেকেও পরিকল্পিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ যদিও এখনো প্রভাবশালী, তবে চীন, ভারত ও রাশিয়া এই ত্রয়ী এখন বিকল্প শক্তিকেন্দ্র তৈরি করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে বলছেন বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থা।
এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং দার্শনিকও। পশ্চিমা বিশ্ব যেখানে উন্নয়নের মানদণ্ড হিসেবে মুক্তবাজার, উদার গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী কাঠামোকে গুরুত্ব দেয়, সেখানে ব্রিকস দেশগুলো উন্নয়নকে দেখছে অবকাঠামোগত সক্ষমতা, আঞ্চলিক সংযোগ ও প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার দৃষ্টিকোণ থেকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছে বেশি বাস্তবসম্মত ও প্রযোজ্য মনে হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই নতুন শক্তিগুলো কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং তারা কি সত্যি একটি ন্যায়সংগত ও টেকসই বৈশ্বিক শাসনকাঠামো গড়ে তুলতে পারবে? ইতিহাস বলে, ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়, কিন্তু আধিপত্যের রূপ প্রায়ই একই থাকে। আজ যে প্রভাব আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের হাতে ছিল, কাল সেটি হয়তো এনডিবি বা এআইআইবির হাতে চলে যাবে—পার্থক্য হবে কেবল নেতৃত্বের ভূগোল, কাঠামোর প্রকৃতি নয়।
তবে আশা করতে তো দোষ নেই, ফিলিস্তিনের সম্ভাবনা এখানেই যে তারা যদি এই পরিবর্তনশীল ব্যবস্থাকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে, তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল থেকে তারা হয়ে উঠতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক সংযোগ কেন্দ্র। ইতিহাস যেমন জাপান ও কোরিয়াকে পুনর্জাগরণের শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি ফিলিস্তিনের সামনেও এখন সেই পরীক্ষার সময়। ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ঐক্য, দক্ষ নেতৃত্ব এবং বিশ্বব্যবস্থার নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতার ওপর।
লেখক : প্রাবন্ধিক