বৈশ্বিক নীতি এবং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু ঝুঁকি
মো. নূর হামজা পিয়াস [প্রকাশ : সময়ের আলো, ১২ নভেম্বর ২০২৫]

জলবায়ু পরিবর্তন আজ আর কোনো বৈজ্ঞানিক বিতর্ক বা অনুমানের বিষয় নয়, এটি আমাদের চোখের সামনে ঘটতে থাকা এক ভয়াবহ বাস্তবতা। বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও দাবানল আজ প্রায় প্রতিদিনের খবর। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দশকে গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে, যা মানবসভ্যতার জন্য এক ভয়াবহ সতর্ক সংকেত। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার। এই সংকট এখন আর ভবিষ্যতের হুমকি নয়, বরং প্রতিনিয়ত মানুষের জীবন, জীবিকা ও ভবিষ্যৎকে বিপর্যস্ত করছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন দীর্ঘদিন ধরে একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। প্রতি বছর ‘কনফারেন্স অব পার্টিস’ বা ‘কপ’ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বের সরকার, বিজ্ঞানী ও নাগরিক সমাজ একত্রিত হয় জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে। ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির পর থেকে এই সম্মেলনগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠেছে। কপ-৩০ তাই বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও মানবতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে যাচ্ছে।
কপ-২৮ ও কপ-২৯-এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১০ থেকে ২১ নভেম্বর কপ-৩০ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্রাজিলের বেলেমে, যা অ্যামাজনের রেইনফরেস্ট অঞ্চলের কাছে অবস্থিত। এই স্থানটি নির্বাচিত হওয়া নিজেই এক প্রতীক কারণ অ্যামাজন পৃথিবীর ‘ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বন নিধন, খরা ও আগুনে তার অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। কপ-৩০ তাই শুধু আলোচনা নয়, বরং জীবনের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের এক বৈশ্বিক প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সম্মেলনে বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ, হাজারো বিশেষজ্ঞ ও ৭০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থা অংশ নিচ্ছে।
উন্নত দেশগুলোর শতাব্দীব্যাপী শিল্পায়নের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়ের ভার এখন বহন করছে বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার ও প্যাসিফিক দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, শুধু জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বৈশ্বিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই তহবিলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের পথ খুলে দেওয়া প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তন স্বাস্থ্য খাতের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের কারণে হিট স্ট্রোক ও পানিবাহিত রোগের যেমন কলেরা প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রজনন স্বাস্থ্যের জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের নতুন তালিকায় বাংলাদেশকে ‘অতিঝুঁকিপূর্ণ পাঁচ দেশের’ মধ্যে রাখা হয়েছে। বারবার ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার প্রভাবে উপকূলীয় এলাকার লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। যদি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের উপকূলের প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে। কপ-৩০ তাই বাংলাদেশের জন্য টিকে থাকার এক রাজনৈতিক ও মানবিক সংগ্রামের মঞ্চ।
জলবায়ু পরিবর্তনের দায় সবার সমান নয়। শিল্পোন্নত দেশগুলো শত শত বছর ধরে বিপুল কার্বন নিঃসরণ করেছে, অথচ ক্ষতি ভোগ করছে গরিব ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো। এটিই জলবায়ু ন্যায্যতার মূল প্রশ্ন। কপ-৩০-এ বাংলাদেশের প্রধান দাবি জলবায়ু অর্থায়নে বৈষম্য কমানো, সহজ শর্তে তহবিল প্রাপ্তি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা। কারণ উন্নয়নশীল দেশগুলোকে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, দরকার বাস্তব আর্থিক সহায়তা।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং লবণাক্ততার কারণে দেশের প্রধান শস্য ধান ও গমের ফলন কমছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে খরা এবং দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে কৃষকরা চিরাচরিত ফসল চাষ করতে পারছেন না। কপ-৩০-এ জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, লবণাক্ততা সহনশীল বীজের গবেষণা এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সুরক্ষিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই অভিযোজন কার্যক্রমে বহু অগ্রগতি দেখিয়েছে। যেমন- ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি, বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসল উৎপাদন। কিন্তু এই উদ্যোগগুলো এখনও সীমিত পরিসরে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, দেশে জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন, যেখানে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ২.৩ বিলিয়ন। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব সম্ভব নয়।
কপ-৩০ ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা অ্যামাজন রেইনফরেস্টের কাছাকাছি। এই স্থানটির প্রতীকী গুরুত্ব অনেক বেশি। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের উচিত হবে কপ-৩০-কে ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী ‘বেলেম ঘোষণা’ প্রণয়ন করা, যেখানে বন নিধন রোধ, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হবে। অ্যামাজন কেবল ব্রাজিলের সম্পদ নয়, এটি বৈশ্বিক কার্বন শোষণের প্রধান কেন্দ্র। তাই বেলেম ঘোষণার সাফল্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।
বাংলাদেশ এখন সৌর ও বায়ুশক্তির মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনে জোর দিচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ২৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা না পেলে এই লক্ষ্য পূরণ কঠিন হবে। কপ-৩০-এ এই বিষয়গুলোতে নতুন চুক্তি বাংলাদেশের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকা থেকে অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, যার চাপ পড়ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো বড় শহরগুলোতে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন নগর অবকাঠামো, বাসস্থান এবং পরিবেশের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করছে। কপ-৩০-এ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসীদের পুনর্বাসন এবং তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার প্রয়োজন। বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনায় এখন থেকে জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা এবং মানব অভিবাসনকে কেন্দ্রীয়ভাবে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন সরাসরি মানুষের জীবনে পড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন ২০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং প্রায় ২৫ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লাখ নতুন ‘অভ্যন্তরীণ জলবায়ু উদ্বাস্তু’ তৈরি হতে পারে। এটি শুধু মানবিক নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক এক ভয়াবহ সংকট। বাংলাদেশ সরকার নবায়নযোগ্য শক্তিতে উচ্চাকাক্সক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও এই খাতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের প্রবাহ এখনও অত্যন্ত কম। এর প্রধান কারণ হলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং বিতরণ নেটওয়ার্কের দুর্বলতা। কপ-৩০-এর উচিত হবে উন্নত দেশগুলোর বেসরকারি পুঁজি এবং উন্নয়ন ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি কমানোর গ্যারান্টি প্রদান করে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করা। সরকারি নীতি সহজ করা এবং দীর্ঘমেয়াদি ভিশন তৈরি করলে এই খাত পূর্ণতা পাবে।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন জলবায়ু আন্দোলনের নতুন মুখ। স্কুল-কলেজে পরিবেশ শিক্ষা, সবুজ উদ্যোগ, প্লাস্টিক বর্জন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে তারা পরিবর্তনের বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। কপ-৩০-এ অংশগ্রহণকারী তরুণ প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব মঞ্চে কথা বলবেন, যা আগামী প্রজন্মের কণ্ঠকে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে যুক্ত করবে। এ প্রজন্মই পারে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করতে।
কপ-৩০ কেবল একটি বৈঠক নয়, এটি পৃথিবীর ভবিষ্যতের জন্য এক জবাবদিহির আহ্বান। উন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানো, নবায়নযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা নিশ্চিত করা ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ অসম্ভব। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অস্তিত্ব এখন বৈশ্বিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তাই কপ-৩০-এর সাফল্য মানে শুধু একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি নয়, এটি মানবতার বেঁচে থাকার যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায়।