কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের করণীয়

ড. মো. ইমরান হোসেন খান [প্রকাশ : যুগান্তর, ০৬ এপ্রিল ২০২৬]

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট : বাংলাদেশের করণীয়

বর্তমানে ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রতিটি দেশেই জ্বালানি তেলের দাম ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ বেড়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের প্রকট সংকট দেখা দিয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে জনগণকে একটি বড় ধরনের স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব পড়তে পারে। তাই এ সংকট মোকাবিলায় বাস্তবভিত্তিক স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অবিলম্বে নেওয়া আবশ্যক।

 

স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা

প্রথমত, স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রথমেই গ্রিন এনার্জি হিসাবে খ্যাত সৌরশক্তিকে (সোলার এনার্জি) সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশে সৌরশক্তি শুধু বিকল্প নয়, এটি একটি কৌশলগত সমাধান। সীমিত ভূমি থাকা সত্ত্বেও ছাদভিত্তিক সোলার, কৃষিজমির সঙ্গে সমন্বিত অ্যাগ্রো-সোলার এবং ভাসমান সোলার প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। সৌরশক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি দ্রুত স্থাপনযোগ্য এবং ছোট ও মাঝারি স্কেলে তুলনামূলক কম খরচে বাস্তবায়ন করা যায়। বাংলাদেশে সৌরশক্তির সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি, কারণ দেশটি বছরে প্রায় ৩০০ দিনের বেশি সূর্যালোক পায় এবং প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ kWh/সূক্ষ্ম সৌর বিকিরণ পাওয়া যায়, যা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় ছাদভিত্তিক সোলার সিস্টেম দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বর্তমান সরকার জরুরি ভিত্তিতে একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে পারে। যেমন, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (৬০-৯০ দিন) সোলার সিস্টেম ইনস্টল করলে সরকার খরচের উল্লেখযোগ্য অংশ বহন করবে। এতে মানুষ দ্রুত সোলার সিস্টেম গ্রহণ করবে, অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ কমবে।

 

 

দ্বিতীয়ত, ডে-লাইট সেভিংস চালু করে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো গ্রীষ্মকালে কর্মঘণ্টা সূর্যালোকের সঙ্গে সামঞ্জস্য করে। বাংলাদেশেও যদি সকাল ৭টা থেকে অফিস শুরু করে বিকাল ৩টার মধ্যে শেষ করা হয়, তাহলে দিনের প্রাকৃতিক আলো সর্বোচ্চভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সকালে তাপমাত্রা কম থাকায় ফ্যান ও এয়ার কন্ডিশনারের ব্যবহারও কমবে, যা বিদ্যুৎ খরচ কমাতে সহায়তা করবে। এছাড়া অফিস পিক আওয়ারের আগে কাজ শেষ হলে জাতীয় গ্রিডে চাপ কমে যাবে। সন্ধ্যায় বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তাই ওই সময়ে শিল্প ও অফিস খাতের ব্যবহার কম থাকলে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা সম্ভব হবে।

 

 

তৃতীয়ত, বিদ্যুৎ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতা দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য। সরকারি অফিসে এসি ২৫ ডিগ্রি তাপমাত্রায় নির্ধারণ এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা নিয়ন্ত্রণ (বিলবোর্ড, শপিংমল ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলোয় অতিরিক্ত আলো কমানো) উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ সাশ্রয় করবে।

 

 

চতুর্থত, কার্যকর লোড ম্যানেজমেন্ট ও অগ্রাধিকারভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করলে শিল্প, হাসপাতাল ও কৃষি খাতে অগ্রাধিকার বজায় থাকবে। এতে অর্থনৈতিক কার্যক্রম চলমান থাকবে, খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে না এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকবে। নির্ধারিত সময়সূচিভিত্তিক লোডশেডিং জনগণ ও ব্যবসায়ীদের পূর্বপ্রস্তুতির সুযোগ দেবে, যা উৎপাদনশীলতা ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বাধা কমাবে।

 

 

পঞ্চমত, স্বল্পমেয়াদে জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ আমদানি বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা কার্যকর। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিবেশী দেশ যেমন ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে কম খরচে বিদ্যুৎ আনা সম্ভব। বিশেষ করে নেপাল ও ভুটানের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে তুলনামূলকভাবে কম খরচে বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের পথ তৈরি করবে।

 

 

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

 

দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে একটি সুসংগঠিত ‘এনার্জি ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ গ্রহণ করতে হবে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলা হবে। বড় আকারের সোলার পার্ক স্থাপন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। কারণ দেশটি ভৌগোলিকভাবে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায় এবং বছরের অধিকাংশ সময় সূর্যপ্রকাশ থাকে, যা সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযোগী। একই সঙ্গে উপকূলীয় অঞ্চলে উইন্ড এনার্জি প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে সাগরপাড়ের বায়ুপ্রবাহকে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন জ্বালানি উৎস তৈরি করা যাবে, যা জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াবে। একইভাবে জলাশয়ে ভাসমান সোলার প্রকল্প গ্রহণ করলে কৃষিজমি নষ্ট না করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে, যা ভূমি সংকটপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর সমাধান। এরই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিলে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

 

 

বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৯৫ শতাংশ যানবাহন ডিজেল বা পেট্রোলভিত্তিক। এর ফলে বৈশ্বিক তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময় দেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। যদি পরিবহণ ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে পেট্রোল-ডিজেল থেকে বিদ্যুতের দিকে স্থানান্তর করা যায়, তেলের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইভি ব্যবহার দৈনিক প্রায় ১.৭-২.৩ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ব্যবহার এড়াতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশে ইভি ব্যবহার খরচের দিক থেকেও অনেক সাশ্রয়ী; মাসিক বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৩,০০০-৫,০০০ টাকা, যেখানে একই দূরত্বের জন্য পেট্রোল-ডিজেল খরচ প্রায় ২৫,০০০-৩০,০০০ টাকা। ফলে ব্যাপক ইভি গ্রহণ দেশকে জ্বালানি আমদানিতে বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় এবং শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। যদি চার্জিং নবায়নযোগ্য উৎস; যেমন, সৌরশক্তি থেকে হয়, তবে পরিবেশগত প্রভাব আরও কমবে।

 

 

ডিজেল-পেট্রোলনির্ভর যানবাহন ইভিতে রূপান্তরের জন্য পর্যায়ক্রমিক কৌশল প্রয়োজন। স্বল্পমেয়াদে শহুরে পরিবহণ ও লজিস্টিকের জন্য ইলেকট্রিক দুই-চাকা, তিন-চাকা ও বাস ব্যবহার অগ্রাধিকার পাবে। দীর্ঘমেয়াদে নীতিমালা তৈরি করতে হবে, যাতে আমদানির শুল্ক কমানো যায়, চার্জিং অবকাঠামো বিস্তৃত হয় এবং স্থানীয় ইভি উৎপাদন বাড়ানো যায়। সোলার চার্জিং স্টেশন ও স্মার্ট গ্রিড নিশ্চিত করবে যে, ইভি বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে না। আর্থিক প্রণোদনা, সুদমুক্ত ঋণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি ইভি গ্রহণ ত্বরান্বিত করবে।

 

 

জাতীয় এনার্জি নীতি : এসব পদক্ষেপ কার্যকর করতে হলে একটি শক্তিশালী জাতীয় এনার্জি পলিসি থাকা অপরিহার্য। এটি কেবল প্রকল্প বাস্তবায়নের রোডম্যাপ নয়, দেশের নবায়নযোগ্য ও ফসিল জ্বালানির জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ভিত্তি তৈরি করবে। সরকারি, বেসরকারি ও শিল্প খাতকে একই লক্ষ্য ও রোডম্যাপে নিয়ে আসবে, বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল নীতিমালা নিশ্চিত করবে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করবে। এজন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এনার্জি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি পরামর্শক বোর্ড গঠন করা জরুরি। বোর্ডটি জ্বালানি উৎপাদন, বিতরণ, নবায়নযোগ্য শক্তি, এনার্জি এফিসিয়েন্সি এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বিশ্লেষণ করে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা সাজাবে। ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলে দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন সম্ভব হবে, যা বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং শক্তিশালী, স্বাবলম্বী ও প্রতিরোধী জ্বালানি খাত গড়ে তুলবে।

 

সর্বোপরি, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলেও এটি এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও। স্বল্পমেয়াদে দ্রুত পদক্ষেপ এবং দীর্ঘমেয়াদে সুপরিকল্পিত বিনিয়োগ ও নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার জ্বালানি খাতকে শক্তিশালী, স্বনির্ভর এবং পরিবেশবান্ধব করতে সক্ষম হবে। সরকারের, শিল্প খাতের এবং জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এ সংকটকে উত্তরণের সুযোগে রূপান্তরিত করতে এবং একটি নিরাপদ জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

 

 

ড. মো. ইমরান হোসেন খান : সহযোগী অধ্যাপক, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর এবং গবেষক, কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, অস্ট্রেলিয়া