বৈশ্বিক বাণিজ্য : অ্যাকশন প্ল্যান করছে সরকার
পর্যালোচনা হবে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি, যুক্তরাজ্য ইইউর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ মানিক মুনতাসির [প্রকাশ: বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬]

বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শুল্ক-অশুল্ক বাধা দূর করতে উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার উদ্যোগ নেবে সরকার। এ কাজের জন্য বিদেশে থাকা দূতাবাস বা মিশনগুলোকে সক্রিয় করা হচ্ছে। এজন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারি (পিটিএ) চুক্তি সম্পাদন করেছিল। তারই অংশ হিসেবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বাধাগুলো দূর করতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ ও পিটিএ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সবশেষ বাণিজ্য চুক্তির বিষয়গুলো নতুন করে পর্যালোচনা করবে নতুন সরকার।
এজন্য দেশটির বাণিজ্য দপ্তর ইউএসটিআরের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা করা হবে। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আগামী সম্মেলনেও এসব বিষয় উত্থাপন করা হবে। সে ক্ষেত্রে বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের যেসব বাধা রয়েছে সেগুলো কাটানোর কার্যকর সমাধান খোঁজা হবে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবাধ প্রবেশের ক্ষেত্রে সব ধরনের বাধা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানিয়েছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অগ্রাধিকার হিসেবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বাধা কাটানো ও রপ্তানির নতুন বাজার অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
জানা গেছে, রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশও বৈশ্বিক বাণিজ্যের এ পরিবর্তনের দিকে গভীর নজর রাখছে। তৈরি পোশাক, চামড়া ও আইটি খাতে বাজার বহুমুখীকরণে জোর দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, শুল্ককাঠামো সংস্কার এবং মুক্তবাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে নতুন বাজারে প্রবেশের কৌশল নেওয়া হচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বাধা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব না হলেও সমন্বিত নীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রক্রিয়া সহজীকরণের মাধ্যমে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। এখন দেখার বিষয় এ উদ্যোগগুলো কত দ্রুত বাস্তব ফল বয়ে আনে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে। সূত্রমতে পোশাক রপ্তানিতে ভিয়েতনাম হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশ।
অথচ দেশটির সঙ্গে এফটিএ আছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) ২৭ দেশসহ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, ভারত, চিলি, চীন, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, বেলারুশ, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তানসহ ৪০টির মতো দেশের। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এফটিএ ও ইপিএ একই ধরনের। ইপিএ এফটিএর চেয়ে আরও বিস্তৃত ও উন্নয়নবান্ধব এবং উদার। স্বল্প সময়ের মধ্যে এসব দেশের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা মাথায় রেখে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অন্তত তিন বছর পিছিয়ে জাতিসংঘে আবেদন করেছে সরকার।
এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রপ্তানি বাজার সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পাওয়ার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও ট্রেড ব্লকের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ), মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি সম্পাদনের নীতি গ্রহণ করেছে।
এরই ধারাবাহিকতায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেশ কিছু দেশ ও ট্রেড ব্লকের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি (আরটিএ) সম্পাদনে নেগোসিয়েশন বা আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে অন্তত আরও চারটি দেশের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দেশগুলো হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। পরবর্তী ধাপে এফটিএ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, চীন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া ও সৌদি আরবের নামও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় রয়েছে।