কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সংস্কার

জিহাদ আল মেহেদী ও মাধুরী গোস্বামী [সূত্র : দেশ রূপান্তর, ২৮ অক্টোবর ২০২৫]

বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণে অপরিহার্য স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সংস্কার

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আমরা দেখেছি, ছাত্র-জনতা কেমন দৃঢ়ভাবে সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। জনমনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। আমাদের কাঠামোগত বৈষম্য এবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। মনে হয়েছিল, সীমিত সম্পদ আর নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সদিচ্ছা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা দেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারব। কিন্তু এই আশার প্রতিফলন দেখতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা বা জনপ্রশাসন নয় সব ক্ষেত্রে সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন, অংশগ্রহণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এখানে আমরা বিশেষভাবে আলোকপাত করছি, স্থানীয় সরকারব্যবস্থার ওপর, মাঠপর্যায়ে উন্নয়নে যার ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং এর কার্যকারিতাকে আরও গতিশীল করার জায়গা রয়েছে।

 

 

আন্দোলনের পরপরই আমরা দেখেছি, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনে দায়িত্বরত অনেকে কর্মস্থল ছেড়ে চলে গেছেন। নেতৃত্বের সেই শূন্যতা এবং ধারাবাহিকতার অভাব স্বাভাবিক কাজকর্মে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করেছে। তার ওপর নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও জবাবদিহি না থাকার সংস্কৃতির কারণে সব মিলিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথ বন্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে আমরা যেখানে আগে ছিলাম, এখনো কি সেখানেই রয়ে গেছি? প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেন সামনে এগোতে পারছি না। এ অবস্থা চলতে থাকলে অনিশ্চয়তা, ভয় ও আস্থাহীনতার এক গভীর সংকটে স্থানীয় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীরগতি হবে। উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্থবির হয়ে পড়বে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পথ আরও কঠিন হবে।

 
 

বাংলাদেশের সংবিধানে স্থানীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া প্রশাসনের সব ক্ষেত্রে জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিতের কথাও সংবিধানে বলা হয়েছে। দেশে স্বশাসিত ও কার্যকর স্থানীয় শাসনব্যবস্থা প্রণয়নের লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এসব প্রতিষ্ঠানকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বাজেট প্রণয়ন, কর আরোপ বা তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের মতো ক্ষমতাও রয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত আইনের অভাব, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ, কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীলতা, প্রাতিষ্ঠানিক অক্ষমতা ও আর্থিক দৈন্যের কারণে বাংলাদেশে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। আমরা দেখার চেষ্টা করেছি স্থানীয় সরকারকে কার্যকরী করে তোলার পেছনে প্রতিবন্ধকতাগুলো কী এবং সেগুলো থেকে উত্তরণের উপায় কী হতে পারে।  প্রথমত, সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায় রাজনীতিবিদরা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে অনিচ্ছুক।

 

ফলে তারা কি ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করে রেখেছেন যেন সাধারণ মানুষ আজীবন ক্ষমতাকাঠামো নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে না পারে? দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নীতিনির্ধারণ ও সামঞ্জস্য রক্ষার উদ্দেশ্যে এমপিদের ক্ষমতায়িত করা হলেও, বাস্তবে তারা স্থানীয় জনগণের উন্নয়নের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। এ অবস্থায় জনগণের স্বার্থ গৌণ হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অনিয়ম, বিলম্ব ও দলীয় সংঘাত একটি বড় সংকট। অনেক সময় নির্বাচনের ফলাফল আগেভাগেই ঠিক করে রাখা হয়। এতে বিরোধী প্রার্থীরা বাধ্য হয়ে সরে যান বা তাদের মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়। ফলে নাগরিকদের ভোটাধিকার ক্ষুণœ হয়। ২০১৫ সালে দলীয় প্রতীকের প্রবর্তন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আরও রাজনৈতিক করে তোলে। ভূমি দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট হচ্ছে এবং সেবা প্রদানে বড় বাধা তৈরি করছে। পঞ্চমত, উপজেলা চেয়ারম্যানদের দক্ষতার ঘাটতি বেশ স্পষ্ট এবং ভাইস-চেয়ারম্যানদের দায়িত্ব অস্পষ্ট।

 

দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকের অভিজ্ঞতা-প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাব রয়েছে। ফলে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো দুর্বল থাকে। এই প্রতিনিধিরা প্রায়ই দায়িত্বের বদলে নিজেদের মর্যাদা ও সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেন। সামাজিক জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন সভায় ও কমিটিতে প্রান্তিক জনগণ অংশ নিতে পারে না, ফলে অভিজাত শ্রেণির প্রভাব বৃদ্ধি পায়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)’র ২০১৮ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটি (এসএমসি) ছাড়া অধিকাংশ নাগরিক ফোরাম এনজিওর সহায়তা ছাড়া নিষ্ক্রিয় থাকে। অথচ সক্রিয় হলে এসব ফোরাম নাগরিকদের অধিকার আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারত।

 
তাহলে সমাধান কোথায়?
 

বাংলাদেশে স্থানীয় শাসন সংস্কারের জন্য একটি সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। সাংবিধানিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং শাসনগত চ্যালেঞ্জসমূহকে আমলে নিয়ে একটি স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন করা যেতে পারে। রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাবমুক্ত সদস্য নিয়োগের মাধ্যমে জনবৈচিত্র্য বজায় রাখলে, এই কমিশন স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে পারবে। এছাড়া, কমিশনটি স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে, যা স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কার্যকর এবং জনমুখী করবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রাসঙ্গিক আইনসমূহের প্রয়োজনীয় সংস্কার জরুরি। দলীয় প্রতীক, কার্যপরিধি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ক্ষমতার সুষম বণ্টন, সংসদ সদস্যদের কার্যকর ভূমিকা, রাজস্ব আদায়ের এখতিয়ার, প্রথাগত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বকীয়তা, সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতকল্পে সংরক্ষিত আসন, সভাগুলোর কার্যবিবরণী উন্মুক্তকরণ ইত্যাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হলে নাগরিকদের সম্পৃক্ততা, জবাবদিহি ও আস্থা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়।

 

একই সঙ্গে এসব আইনের বাস্তব প্রয়োগ, তদারকি ও মূল্যায়নের জন্য একটি নিরপেক্ষ পরিদর্শন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে রাজনৈতিক প্রভাব বা প্রশাসনিক অনীহা সংস্কারের গতিকে বাধাগ্রস্ত না করতে পারে। আইনগত ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহির এই সংস্কৃতি গড়ে উঠলে জনকেন্দ্রিক স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নিশ্চিত করা যাবে। স্থানীয় প্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং জনমনে আস্থা গড়ে তুলতে হলে, নিয়মিত নির্বাচন হতে পারে অন্যতম অনুষঙ্গ। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সংসদ সদস্যদের নেতিবাচক প্রভাব কমবে, সময় ও সম্পদের সাশ্রয় হবে, স্থানীয় মানুষের চাহিদা অগ্রাধিকার পাবে ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা হতে হবে স্বাধীন ও দৃঢ়; পাশাপাশি নির্বাচনকালে সহিংসতা, প্রভাব খাটানো ও প্রশাসনিক পক্ষপাত রোধে কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে, যাতে জনগণের ভোটের মূল্য সত্যিকার অর্থে প্রতিফলিত হয়।

 

 

ইউনিয়ন পরিষদ এবং শহরে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনকে প্রধান স্থানীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রদের সমন্বয়ে একটি যৌথ ফেডারেল কাঠামো গঠন করা যেতে পারে। এ কাঠামোর সভাপতিত্ব নির্দিষ্ট মেয়াদে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হবে এবং এর কার্যপরিধি শুধুমাত্র সমন্বয়মূলক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আসলে সামাজিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে নিয়মিত ফোরাম, পরামর্শ সভা ও মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে, যাতে নাগরিকরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে।

 

 

তবে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ফোরামগুলোকে রাজনৈতিক বা অন্য স্বার্থের প্রভাব থেকে মুক্ত করে সত্যিকারের নাগরিক-নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপান্তরিত করা। শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সব প্রতিনিধির অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পারলে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা কার্যকর হবে। এসব ফোরামকে স্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ, গণশুনানি ও অংশগ্রহণমূলক পরিকল্পনার মাধ্যমে আরও জবাবদিহিমূলক করা দরকার, যাতে স্থানীয় জনগণের মতামত, নীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হয়। এগুলোকে সত্যিকার অর্থে নাগরিকদের নেতৃত্বে পরিচালিত করতে হবে। এভাবে স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সব ক্ষেত্রে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা সম্ভব।

 

 

লেখক: সিনিয়র কম্যুনিকেশনস অ্যাসোসিয়েট ও কনটেন্ট এডিটর (বাংলা) ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)