বৈসাবি উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলা উৎসবে মাতোয়ারা
শতদল বড়ুয়া [প্রকাশ: সময়ের আলো, ১৩ এপ্রিল ২০২৬]

‘কাট্টোল পাযোগ বিঝু এজোক’... অর্থাৎ কাঁঠাল পাকবে বিঝু বা চৈত্রসংক্রান্তি আসবে। এ বচন দিয়ে লেখা শুরু করছি। যখন বউ কথা কও পাখিটি ডাকতে শুরু করে, কোকিল যখন কুহু কুহু ডাকে, তখনি বিঝু বা চৈত্রসংক্রান্তি উৎসবের আগমনের বার্তা নিয়ে আসে।
বিঝুর আগমনের প্রতীক্ষায় আবেগ নিবিড় হয়ে অতিবাহিত করতে হয়। কখন যে বিঝু আসবে? এভাবে দিনের পর যেতে এমনি মুহূর্তে হঠাৎ চলে আসে বিঝু বা ‘বৈসাবি’ নামক উৎসবটি।
আজ সোমবার চৈত্র মাসের ৩০ তারিখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিন। কাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হবে নতুন বঙ্গাব্দ। অর্থাৎ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১ বৈশাখ। পাহাড়িরা চৈত্র মাসের শেষ দিনকে ‘বৈসাবি’ উৎসব হিসেবে পালন করে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে। পাহাড়ের তিন সম্প্রদায় আজকের দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। পাহাড়ে বসবাসরত সব মানুষের মাঝে প্রতি বছর এক আনন্দের বন্যা আসে, যা জাতিগত দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে গিয়ে একে অপরের স্নেহ ভালোবাসার ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলে।
তাই বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, ‘বৈসাবি’ অহিংসার প্রতীক, বন্ধুত্বের প্রতীক, মৈত্রীর প্রতীক। বৈসাবি অর্থ- ‘বৈ’ এই প্রথম অক্ষর দিয়ে বৈশাখীও বলতে পারি। বৈ+সা+বি=বৈসাবি, অর্থাৎ, ‘বৈ’ মানে ‘বৈষু’- এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা। ‘সা’ মানে ‘সাংগ্রাই’- এটি মার্মা সম্প্রদায়ের ভাষা। ‘বি’ মানে ‘বিঝু’- এটি চাকমা সম্প্রদায়ের ভাষা।
সুতরাং, বছরের প্রথম দিনকে ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষু’, মার্মা সম্প্রদায় ‘সাংগ্রাই’, চাকমা সম্প্রদায় ‘বিষু’ নামে অভিহিত করে থাকে। তিন সম্প্রদায়ের আদি অক্ষর দিয়ে গঠিত হয়েছে ‘বৈসাবি’। এখন এ বিষয়ে আলোকপাতে যাচ্ছি কোন সম্প্রদায় কীভাবে বৈসাবি উদযাপন করে।
বৈষু : পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী ত্রিপুরা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে ‘বৈষু’ বলে। এরা মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এদিনে এরা অনাগত দিনগুলোতে সুখে শান্তিতে বসবাস করার জন্য মন্দিরে গিয়ে পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করে। কিশোর-কিশোরীরা এদিনে প্রতি বাড়িতে গিয়ে ফুল বিতরণ করে এবং যুবক-যুবতীরা তার প্রিয়জনকেও ফুল দিয়ে ভালোবাসার শুভেচ্ছা জানায়।
ত্রিপুরা সম্প্রদায় ‘বৈষু’ তিনটি পর্বে উদযাপন করে। হারি বৈষু, বিষুমা বৈষু ও বিসিকাতাল বৈষু। এ উৎসবে তারা জাতি ভেদাভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ, শত্রুতা সবকিছু ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। বৈষু দিনে এরা পাচন, সেমাই, পিঠা ইত্যাদি খাবারের আয়োজন করে থাকে।
গরু, মহিষের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ তিতিক্ষার ফলে তাদের দ্বারা বছরের অন্ন সংস্থান হয় বলে এদিনে গরু, মহিষকে স্নান করিয়ে দেওয়া হয় এবং গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। ধূপ, প্রদীপ জ্বেলে শ্রদ্ধা নিবেদন করার মধ্য দিয়ে তারা বৈষু পালন করে।
সাংগ্রাই : সাংগ্রাই, এটি মার্মা ভাষা। মার্মা সম্প্রদায় বছরের শেষ দিনকে সাংগ্রাই নামে অভিহিত করে থাকে। বৈশাখের প্রথমদিন তারা সাংগ্রাই উৎসব পালন করে। পিঠা, পাচন, সেমাইয়ের আয়োজন থাকে। সব বয়সি লোকেরা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে বেড়ায় ও আনন্দ উৎসব করে।
তবে দিনের প্রধান আকর্ষণ জলোৎসব। মার্মা ভাষায় এটিকে বলে ‘রিলংপোয়ে’। জলখেলার জন্য আগে থেকে প্যান্ডেল তৈরি করে। এখানে যুবক-যুবতীরা একে অপরকে লক্ষ্য করে জলছিটিয়ে কাবু করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। বয়োবৃদ্ধরা এদিনে ধর্মীয় প্রথা অনুসারে বিহারে বা মন্দিরে গিয়ে ধর্মীয় কাজে লিপ্ত হয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা অতর্কিত জল ছিটিয়ে দিয়ে আনন্দ উল্লাস করে সাংগ্রাই উৎসবকে বিদায় জানায়।
বিঝু : বিঝু, এটি চাকমা ভাষা। চাকমারা বিঝু উৎসবকে তিন পর্বে ভাগ করে উপভোগ করে। বছরের শেষ অর্থাৎ, চৈত্র মাসের ২৯ তারিখ ফুল বিঝু, ৩০ চৈত্রকে মূল বিঝু ও নববর্ষের প্রথমদিন অর্থাৎ, ১ বৈশাখ ‘গজ্যাপজ্যা’ বিঝু হিসেবে উৎসব পালন করে।
ফুল বিঝু : ফুল বিঝুর দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান করে নানা রকমের ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে কিশোর-কিশোরীরা। ফুল সংগ্রহ করার পর চারভাগে ভাগ করে একভাগ দিয়ে নিজের মনের মতো করে বাড়ি সাজায়, অন্য একভাগ দিয়ে বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে সমবেতভাবে বুদ্ধের উপাসনা করে এবং ভিক্ষুদের কাছ থেকে পঞ্চশীল গ্রহণপূর্বক ধর্মদেশনা শোনেন।
অপর একভাগ দিয়ে ছড়া বা নদীতে বা পুকুরপাড়ে পূজামণ্ডপ তৈরি করে প্রার্থনা করে যেন সারা বছর পানির ন্যায় অর্থাৎ, পানি যেমন শান্ত-শিষ্ট সেরূপ নিজেও শান্ত-শিষ্ট বা ভালোভাবে জীবনযাপন অতিবাহিত করতে পারে। আর একভাগ ফুল নিয়ে প্রিয়জনকে ভালোবাসার উপহার দেয়। কেউ কেউ ফুল দিয়ে বন্ধুকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানায়।
মূল বিঝু : মূল বিঝু হচ্ছে বিঝুর প্রথমদিন। ফুল বিঝু দিনে মূল বিঝুর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। এ দিনে ঘরের মহিলারা খুবই ব্যস্ত থাকে। তারা ৩০-৪০ প্রকার তরিতরকারি মিশ্রণে ঘণ্ড বা পাচন তৈরি করে। প্রচলিত আছে- এ দিন যে যত বাড়িতে গিয়ে যতবেশি পাচন খাবে ততবেশি মঙ্গল হবে। পাচন ছাড়াও নানা ধরনের পিঠা, বিন্নিধানের খই, লাড়ু, সেমাই, মদ ইত্যাদির আয়োজন করে। এদিনে সবার বাড়ির দরজা খোলা থাকে, যখন যার ইচ্ছা আসতে কোনো বাধা নেই।
যারা বেড়াতে আসে তাদের বাড়ির মালিক যথাযথ আপ্যায়নের কোনো কমতি রাখে না। ওপরে উল্লিখিত আইটেম পরিবেশন করা হয়। সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে বাড়ির দরজা, উঠানে, গো-শালায়, বৌদ্ধ বিহারে প্রদীপ জ্বালিয়ে মঙ্গল কামনা করা হয়।
গজ্যাপজ্যা বিষু : নববর্ষের প্রথমদিনটিকে চাকমারা গজ্যাপাজ্যা বিঝু হিসেবে উদযাপন করে। এই দিন বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে বিশ্রামের সঙ্গে দিনটিকে অতিবাহিত করা হয়। ছোটরা বড়দের নমস্কার করে এবং স্নান করিয়ে দিয়ে আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। সন্ধ্যায় স্থানীয় বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে পঞ্চশীল গ্রহণ করে অনাগত দিনগুলো যাতে সবার জন্য মঙ্গলময় হয় এই প্রার্থনা শেষের পর গজ্যাপজ্যা বিঝুর পরিসমাপ্তি ঘটানো হয়।
পরিশেষে এইটুকু বলতে চাই, ‘বৈসাবি’ হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের উৎসব। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে অতীতের সব দুঃখ, গ্লানি, বেদনা, ক্ষোভ, উঁচু- নিচু, ধনী-গরিব বৈষম্য পরিহার করে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হয়। একদিকে যেমন ধর্মীয় বিধান, অন্যদিকে সামাজিকতার বহিঃপ্রকাশও ‘বৈসাবি’ বহন করে। এটি উপজাতীয়দের উৎসব হলেও সবার অংশগ্রহণে পুরো আয়োজন সফলতা লাভ করে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রাবন্ধিক