বৈদেশিক বাণিজ্যে ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে
ড. মোস্তফা আবিদ খান [সূত্র : বণিক বার্তা, ২ জানুয়ারি ২০২৬]

২০২৫ সাল দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। সরকারকে ব্যাংক খাত সংস্কার করতে হয়েছে; মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করতে হয়েছে। এখন এটা মোটামুটি স্বাভাবিক হচ্ছে। কিন্তু বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে।
২০২৫ সাল দেশের অর্থনীতির জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। সরকারকে ব্যাংক খাত সংস্কার করতে হয়েছে; মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করতে হয়েছে। এখন এটা মোটামুটি স্বাভাবিক হচ্ছে। কিন্তু বৈদেশিক বাণিজ্যে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ এসেছে।
বাংলাদেশে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ছিল। এখানে দরকষাকষির তাড়াতাড়ি ফল পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিন দরকষাকষির মাধ্যমে ফলাফল পেতে হয়। ডব্লিউটিওর অধীনে এলডিসি হিসেবে আমরা যে শুল্কমুক্ত, কোটামুক্ত সুবিধা পেয়েছি, সেটি অনেক বছরের চেষ্টায় পেয়েছি। কিন্তু এখন এলডিসি উত্তরণের পর আমরা সেই সুবিধা আর পাব না। এটি নিয়ে ব্যবসায়ী ও সরকার চিন্তিত। ডব্লিউটিওর অধীনে মাল্টি ট্রেডিং সিস্টেমের গুরুত্ব অনেক বেশি। এটি সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগ করে। এতে বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলো তারা জানতে পারে কোথায় কী করা সম্ভব? কিন্তু মাল্টি ট্রেডিং সিস্টেম যদি দুর্বল হয়ে যায় তাহলে তারা অনুমান করতে পারবে না কোথায় কী করা উচিত। শুল্কের ব্যাপারে সব দেশের জন্য সমান শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল। সবার জন্য সমান সুযোগ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের জন্যও ১৫ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের জন্যও ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করল তখন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। যদিও সরকার দরকষাকষি করে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ২০ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তার পরও কিছু দেশের কম আছে, আবার কিছু দেশে বেশি আছে। এ কারণে ব্যবসায় চাপ বাড়বে।
ডব্লিউটিওর মাল্টি ট্রেডিং সিস্টেমটি নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। ডব্লিউটিওর সংস্কার করা না গেলে বাণিজ্যে আরো চ্যালেঞ্জ বাড়বে। রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের (পাল্টাপাল্টি শুল্ক) কারণে আমাদের উচ্চশুল্কের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনেক পণ্যের চাহিদা কমে যেতে পারে। চাহিদা কমে গেলে সবার রফতানি কমবে। বাংলাদেশের রফতানিও কমবে। তবে এখনো এর প্রভাব আমরা হয়তো অনুভব করছি না।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) আমরা শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছি; সেখানে প্রধান রফতানিকারক আমরা। কিন্তু চীন ও ভারতের ওপর যখন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চশুল্ক বসবে তখন তারা কী করবে? তারা আমেরিকার বিকল্প বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নকে খুঁজবে। অতএব ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীন ও ভারতের রফতানি বাড়বে। তাতে আমাদের জন্য বড় একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হতে পারে। এভাবে দুটি বড় বাজারে আমাদের রফতানি বাণিজ্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লে তৈরি পোশাক রফতানির কী হবে সেটি একটু চিন্তার বিষয়। এখনো তার প্রভাব হয়তো দেখতে পাচ্ছি না কিন্তু আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে হয়তো বোঝা যাবে।
২০২৬ সালে দেশের অর্থনীতির জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো এলডিসি উত্তরণ। চলতি বছরের নভেম্বরে এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা। সুদের হার বেশি এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বেসরকারি খাত শঙ্কায় আছে। এলডিসি উত্তরণের পর কোটামুক্ত সুবিধা চলে গেলে ব্যবসায়ীরা নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বেন। এজন্য তারা সমন্বয়ের জন্য আলোচনা করছেন। উত্তরণের পর আমরা কী করব সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে গবেষণা করছে। যেকোনো সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় নিতে হবে। এলডিসি উত্তরণের কথা বলছি, উত্তরণের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারব কিনা?
এলডিসি উত্তরণের পর আমাদের কয়েকটি চ্যালেঞ্জ আসবে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধার বিষয়ে। আমরা ২০২৯ সাল পর্যন্ত পাঁচটি দেশ থেকে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা পাব। এগুলো হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডা ও তুরস্ক। এ কারণে আমাদের রফতানির প্রায় ৯৩ শতাংশ বাজারের প্রবেশাধিকারের কোনো পরিবর্তন হবে না। ২০২৯ সালের পর প্রধান তিনটি দেশ একটি সুবিধা দেবে, সেটি হলো এনহ্যান্স প্রেফারেন্স। এগুলো হলো—ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জিএসপি, যুক্তরাজ্য এনহ্যান্স প্রেফারেন্স এবং কানাডার জেনারেল প্রিফারেন্স অ্যান্ড ট্যারিফ প্লাস। এ তিন দেশের শর্ত হচ্ছে পরিবেশ, শ্রম, মানবাধিকার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে যেসব কনভেশন আছে সেগুলো মেনে চলতে হবে। ইইউর ৩২টি কনভেনশনই স্বাক্ষর ও অনুমোদন করেছি। এখন রিপোর্টিং সিস্টেমটি যেন ভালো থাকে সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে। আমরা যতদিন পর্যন্ত উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত না হই ততদিন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি সুবিধা পাব। আমাদের রফতানির ক্ষেত্রে এ সুবিধা পেলে এটি একটি ভালো সুযোগ।
২০২৯ সালের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের এনহ্যান্স প্রেফারেন্সের আওতায় ঢুকে যেতে পারবে। এক্ষেত্রে কেবল তারা দেখবে, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর আমরা কনভেনশনগুলো ঠিকমতো পালন করছি কিনা, উন্নতি করছি কিনা। যদি ঠিকমতো কনভেনশনগুলো পালন করি তাহলে তারা সুবিধাগুলো বহাল রাখবে। এ সুবিধা থাকবে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে যতদিন পর্যন্ত উন্নীত না হব। এছাড়া পরবর্তী সময়ে পরপর তিন বছর উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে থাকতে হবে বাংলাদেশকে।
কানাডাও কিন্তু একই কাজ করেছে। তারা এখনো বিস্তারিত পলিসি ঠিক করেনি। তবে তারা বলছে, উচ্চমধ্যম আয়ের দেশগুলোকে সুবিধা দেবে। এক্ষেত্রে কনভেনশনগুলোকে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করতে হবে। সেক্ষেত্রে রফতানির ৮৩ শতাংশ বাজারের প্রবেশাধিকারের কোনো পরিবর্তন হবে না। কনভেনশনগুলোকে বাস্তবায়ন করলে রফতানি বাজার একই পর্যায়ে রাখতে পারব।
আমাদের একটা চ্যালেঞ্জ ম্যান মেড ফাইবারের ক্ষেত্রে। ম্যানমেড ফাইবারের ফ্যাব্রিক (সুতা) উৎপাদননির্ভর করবে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর। এটি নিশ্চিত করতে না পারলে ম্যান মেড ফাইবার (কৃত্রিম তন্তু) বিনিয়োগ হবে না। সুদের হারের কথা বলেছি। আমাদের শুল্ক কাঠামো ভালো করতে হবে। পণ্যের আমদানি সহজীকরণ করতে হবে। পণ্যের খালাস যাতে সহজে হয় সেই ব্যবস্থাও করতে হবে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে।
তৈরি পোশাক খাত অটোমেশনের দিকে যাচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান কমে যাবে। আমাদের রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। পণ্যের বহুমুখীকরণে যা দরকার তাই জোর দিয়ে করতে হবে। তৈরি পোশাক খাতে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। সেলাই করতে হয়। আর এ সেলাইয়ের কাজ করছেন নারী শ্রমিকরা। শিল্প যখন মধ্যম পর্যায়ে যায় তখন দক্ষ লোকের দরকার। এ দক্ষ লোক দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়।
ইলেকট্রনিক খাতে দক্ষ শ্রমিকের প্রয়োজন। ইলেকট্রনিক আইটেমে টেকনোলজি বেশি প্রয়োজন। এ খাতের একসঙ্গে অনেক উৎপাদন করা সম্ভব। ইলেকট্রনিক খাত গড়ে তুলতে হলে ন্যূনতম দক্ষতা দরকার। সেই দক্ষতা উন্নয়ন ঘটাতে হবে। কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক তৈরি হচ্ছে না। এটি আমাদের সামাজিক সমস্যা। আমাদের সবাই উচ্চ শিক্ষিত হতে চান। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বিএ, এমএ পাস করে অনেক নিচু পদে চাকরি করেন। এতে সম্পদের অপচয় হচ্ছে। অথচ তারা টেকনিক্যাল শিক্ষা গ্রহণ করে দক্ষতা অর্জন করলে ভালো কাজ করতে পারত। তাহলে আমরা অনেক উন্নয়ন করতে পারতাম। যেমন ধরুন, মোবাইল মেরামত যারা করছে তাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। কিন্তু দক্ষতা অর্জন করে ঠিকই কাজ করছে। শ্রমশক্তিকে যদি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে কারিগরি দক্ষতার উন্নয়ন করি তাহলে দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে উঠবে। তখন ইলেকট্রনিক খাততে আরো সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে পারব। আর রফতানি বৈচিত্র্যকরণের একমাত্র উপায় হচ্ছে দক্ষতা উন্নয়ন। এক্ষেত্রে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে।
কারিগরি শিক্ষা ভালো, এটিকে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। সবার উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার দরকার নেই। এক্ষেত্রে শিল্পের সঙ্গে একাডেমিয়ার সম্পর্ক বাড়াতে হবে। কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে তারা সরাসরি কাজে যোগ দেবেন। কারিগরি শিক্ষাকে আমরা সামাজিকভাবে এত সম্মানজনক মনে করি না, উচ্চশিক্ষাকে সম্মানজনক মনে করা হয়। কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিকভাবে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করাও জরুরি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় চিন্তা করতে শেখাই না, মুখস্থ করতে শেখাই। মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়া যায় না। শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা এবং তা বৈশ্বিক ও স্থানীয় বাজারের জন্য যুগোপযোগী করা এখন সময়ের দাবি।
ড. মোস্তফা আবিদ খান: বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ; বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) সাবেক সদস্য