বঙ্গভঙ্গ এবং এর পরিণাম
মোহাম্মদ হাসান শরীফ [সূত্র : যুগান্তর, ১৬ অক্টোবর ২০২৫]

ব্রিটিশরা নিজেদের স্বার্থেই বঙ্গভঙ্গ করেছিল। একইসঙ্গে যে খেলাটা ১৮ শতকে খেলেছিল, সেটারই পুনরাবৃত্তি করেছিল বিশ শতকে। ১৮ শতকে সুযোগটি লুফে নিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ না, বটগাছ হয়েছিল যারা, তারা এবার সুযোগ খানিকটা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সহিংস কার্যক্রমের মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গ তারা রোধ করতে পেরেছিল। কিন্তু যে পরিণাম তাদের ভোগ করতে হয়েছিল, তা ছিল ভয়াবহ। কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়া হয় রাজধানী, বাংলার আয়তনও কমানো হয়। আর এর মাত্র ৩০ বছর পর তারাই আবার বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন করেছিল, পরাজয়ের দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে। অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে যারা কষ্ট পেয়েছিল, তারাই শেষ হাসিটি হেসেছিল, আজ নতুন পতাকা আর নতুন মানচিত্র পেয়েছে। ১৯০৫ সালে যে অঞ্চলটি নিয়ে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, অনেকটা সেই এলাকা নিয়েই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট জন্মলাভ করে পূর্ব পাকিস্তান এবং আড়াই দশকের কম সময় পর একই সীমারেখা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এ ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে এটিই প্রমাণিত হয়েছে যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল যথার্থ পদক্ষেপ।
বঙ্গভঙ্গ ১৮০৫ সালের ১৬ অক্টোবর কার্যকর হয়। তবে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আরও প্রায় অর্ধশত বছর আগে। ১৮৫৩ সালে স্যার চার্লস গ্র্যান্ট এবং ১৮৫৪ সালে লর্ড ডালহৌসি বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব করেন। ব্রিটিশরা বাংলা দিয়েই ভারতবর্ষে তাদের উপনিবেশ শুরু করেছিল। বাংলা ছিল ওই সময়ের ব্রিটিশ ভারতের সর্বপ্রধান ও সবচেয়ে বড় প্রদেশ। প্রায় ২,৪৮,১২০ বর্গমাইলের এ বিশাল প্রদেশের শাসনকাজ সহজ করাই ছিল বঙ্গভঙ্গের প্রধান লক্ষ্য। ১৮৯৮ সালে লর্ড কার্জন ভাইসরয় নিযুক্ত হলে তিনি বঙ্গ প্রদেশের প্রশাসনিক সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হন এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৩ সালে বঙ্গ বিভাগের একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। ১৯০৪ সালে তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বাংলার পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহর পরিদর্শন করেন। এর মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে অনুভব করেন যে, বাংলাকে ভাগ করা অপরিহার্য। অবশেষে বিলেতে বিশেষভাবে পরীক্ষার পর ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। নতুন প্রদেশের নাম রাখা হয় ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’। প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হন ব্যামফিল্ড ফুলার (১৮৫৪-১৯৩৫)।
পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশের মানুষের জন্য বঙ্গভঙ্গ কেন জরুরি ছিল? বাংলা ভাগ নিয়ে গবেষণাকারী মার্কিন অধ্যাপক জন আর ম্যাকলেইন উচ্চপদে সরকারি পদে হিন্দুদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯০১ সালে তৎকালীন বাংলার সরকারের অধীনে উচ্চ পর্যায়ের নিয়োগের ক্ষেত্রে মুসলিমরা মাত্র ৪১টি পদ পেয়েছিল। অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যার তিনভাগের একভাগ হয়েও হিন্দুরা নিয়োগ পেয়েছিল ১২৩৫টি উচ্চপদ।
১৯০৫ সালে আরেক সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বঙ্গভঙ্গের আগে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা এবং সাবডিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর মাত্র ছয় ভাগের এক পদে মুসলিমরা নিয়োজিত রয়েছে। পুলিশ বিভাগে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল আরও খারাপ। শতকরা ৫৯ ভাগ মুসলমান জনসংখ্যা থাকার পরও তখন ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল রেঞ্জ’ নামে পরিচিত পুলিশ বিভাগে মোট ৫৪ জন ইনস্পেক্টরের মধ্যে চারজন, ৪৮৪ জন সাব ইনস্পেক্টরের মধ্যে ৬০ জন, ৪৫০ জন হেড-কনস্টেবলের মধ্যে ৪৫ জন এবং ৪৫৯৪ জন কনস্টেবলের মধ্যে মাত্র ১০২৭ জন কনস্টেবল ছিলেন মুসলমান।
এটা ঠিক, নতুন ব্যবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা ভাষাগত দিক থেকে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছিল। তবে তারা এর বিরোধিতা করেছিল মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে। তাদের আশঙ্কা ছিল, বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলা এবং হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম বাংলা সৃষ্টি হবে, যা সামগ্রিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কমিয়ে দেবে। তাদের আশঙ্কা ছিল, কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু আইনজীবী, জমিদার, শিল্পপতি এবং রাজনীতিবিদদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আর বহাল থাকবে না।
বঙ্গভঙ্গ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ছয় বছর-১৯০৫ থেকে ১৯১১। এর মধ্যেই যে উন্নতি-অগ্রগতি হয়েছিল, তা রাজধানী-কলকাতার অধীনে ইংরেজ শাসনের ১৭৫৭ থেকে ১৯০৪ সাল এবং ১৯১২ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত কয়েকশ বছরে হয়নি। এ সময়ে মোগল রাজধানী ঢাকা নিজের লুপ্ত গৌরব ফিরে পেতে থাকে, দ্রুত প্রসার লাভ করতে থাকে। প্রতি ক্ষেত্রেই উন্নতি দেখা যেতে থাকে। নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেনেন্ট গভর্নর স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার সচেতন ছিলেন যে, মুসলমানরা শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসর এবং সরকারি চাকরিতে তাদের সংখ্যা খুবই কম। অতএব নতুন প্রদেশের উন্নয়নের প্রতি তিনি বিশেষ যত্নবান হন। তা ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও সড়ক পথের উন্নতি সাধনের জন্য এক বছরের মধ্যে বিরাট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে স্থানীয় বণিক ও বাণিজ্যিক পণ্যের নিরাপত্তা বিধানের জন্য নৌ-পুলিশের শক্তি বাড়ানো হয়। গ্রামের সঙ্গে শহর এবং বাণিজ্য কেন্দ্রের সংযোগের জন্য পুরোনো রাস্তাগুলোর সংস্কার এবং নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।
উল্লেখ্য, এ সময়ই নির্মিত হয় গভর্নর হাউস (বঙ্গভবন), রমনা এলাকায় সরকারি ভবনাদি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বর্ধমান হাউস (বাংলা একাডেমি), হুদা হাউস, কাকরাইল ও বেইলি রোড এলাকায় সার্কিট হাউসসহ বহু অফিস ও আবাসস্থল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চিন্তা এ সময়েই হয়।
নতুন প্রদেশের মুসলমানদের শিক্ষা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো বিশেষভাবে পর্যালোচনা করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মুসলমান ছাত্রদের জন্য সরকারি বৃত্তি বাড়ানোর ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই স্কুল-কলেজের ছাত্র সংখ্যা বেড়ে যায়। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাপ্রসারের জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ হিসাবে বেশি সংখ্যক মুসলমান শিক্ষক ও স্কুল পরিদর্শক নিযুক্ত করা হয়।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯০৬ সালে নবগঠিত পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশে কলেজিয়েট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১,৬৯৮ এবং কলেজিয়েট শিক্ষার জন্য ব্যয় হতো ১,৫৪,৯৫৮ টাকা। ১,৯১২ সালে ছাত্র সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৫৬০ এবং শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩,৮৩,৬১৯ টাকায়, যা বঙ্গভঙ্গ রদের মাধ্যমে নতুন প্রদেশ বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে আবার কমতে থাকে। একই চিত্র দেখা যায় সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রেও। ১৯০৫ সালে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৬,৯৯,০৫১। তা ১৯১০-১১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৯,৩৬,৬৫৩। এ সময় প্রাদেশিক সরকারের শিক্ষা খাতের ব্যয় ১১,০৬,৫১০ টাকা থেকে ২২,০৫,৩৩৯ টাকায় বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় শিক্ষা ব্যয়ও ৪৭,৮১,৮৩৩ টাকা থেকে ৭৩,০৫,২৬০ টাকায় বাড়ে।
নতুন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠিত হওয়ার কারণে বিশেষ ইতিবাচক প্রভাব জনগণের অর্থনৈতিক ভাগ্যের চাকা গতিশীল করে। এ সময় নতুন প্রদেশে নিজস্ব বাজার ও বিপণন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রধান অর্থকরী ফসল পূর্ব বাংলার সোনালি আঁশ পাটের চাহিদা ও দাম বাড়ে। ১৯০৪ সালের চেয়ে ১৯০৬-১৯০৭ সালের পাটের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা পরবর্তী কয়েক বছর স্থায়ী হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৮৯৬-১৮৯৭ সালে প্রতি বেল পাটের মূল্য ছিল ৩০ টাকা। তা ১৯০৬-১৯০৭ সালে বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৫৯ টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজারের সুফলও বাড়ে এবং সেটা পূর্ব বাংলার কৃষকরা সরাসরি লাভ করেন। কারণ, কলকাতার ফড়িয়া, ব্যবসায়ী ওই সময় কমিশন ও বাড়তি লভ্যাংশ নিজেদের কবজায় নেওয়ার সুযোগ পায়নি।
বঙ্গভঙ্গ বহাল থাকলে আরও কী কী হতে পারত? অনেক কিছুই হতে পারত। রাজধানী ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানী হিসাবে গড়ে উঠতে পারত। এখানে সচিবালয় থাকত, প্রাদেশিক আইন পরিষদ ভবন থাকত, গভর্নর হাউস থাকত। হাইকোর্ট কমপ্লেক্স থাকত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠত, একটা নয়, গোটা পাঁচেক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, বিদ্যালয়সহ আরও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারত। প্রাসঙ্গিক অনেক অবকাঠামো গড়ে ওঠত। বাঙালি মুসলমানরা বিপুল সংখ্যায় সামরিক ও বেসামরিক আমলামন্ত্রে প্রবেশ করার সুযোগ পেত। উচ্চবর্ণের হিন্দু গোষ্ঠীর কারণে এসব থেকে বঞ্চিত হতে হয় বাঙালি মুসলিমদের। ফলে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার সময় এখানে না ছিল সচিবালয়, না ছিল গভর্নর হাউস। একেবারে শূন্য থেকে এখানকার অবকাঠামো গড়ে নিতে হয়। ’৪৭ সালের পর পলাশি এলাকায় বাঁশের বেড়া দিয়ে প্রথম প্রাদেশিক সচিবালয় বানাতে হয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গ অটুট থাকলে পাটকলসহ অনেক কারখানা স্থাপিত হতো পূর্ববঙ্গে। এর জন্য ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতো না। পূর্ববঙ্গেই পাট হতো। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানে একটি পাটকলও প্রতিষ্ঠা হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরটি আধুনিক সমুদ্রবন্দরে পরিণত হতে পারত। ১৯৪৭ সালে বন্দরবিহীন অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হতো না। বঙ্গভঙ্গ বহাল থাকার অর্থ ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ বন্দরের অস্তিত্ব থাকত এখানে।
বঙ্গভঙ্গ রদ না হলে কি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হতো? খুব সম্ভবত হতো না। বঙ্গভঙ্গ বহাল থাকলে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের মধ্যে আর্থিক-সামাজিক ব্যবধান অনেক কম থাকত। পূর্ববঙ্গের লোকজন ১৮৪৭ সালে এসে সম্ভবত এ অবস্থা দেখতে পেত না যে এখানকার জমিদারদের বেশিরভাগই হিন্দু, কিন্তু প্রজা মুসলমান; উকিল হিন্দু, কিন্তু মক্কেল মুসলমান; বিচারক হিন্দু, কিন্তু আসামি মুসলমান; প্রশাসক হিন্দু, কিন্তু শাসিত ব্যক্তিটি মুসলমান; মহাজন হিন্দু, আর ঋণগৃহিতা মুসলমান। চল্লিব্রিটিশরা নিজেদের স্বার্থেই বঙ্গভঙ্গ করেছিল। একইসঙ্গে যে খেলাটা ১৮ শতকে খেলেছিল, সেটারই পুনরাবৃত্তি করেছিল বিশ শতকে।
১৮ শতকে সুযোগটি লুফে নিয়ে আঙুল ফুলে কলাগাছ না, বটগাছ হয়েছিল যারা, তারা এবার সুযোগ খানিকটা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সহিংস কার্যক্রমের মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গ তারা রোধ করতে পেরেছিল। কিন্তু যে পরিণাম তাদের ভোগ করতে হয়েছিল, তা ছিল ভয়াবহ। কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নেওয়া হয় রাজধানী, বাংলার আয়তনও কমানো হয়। আর এর মাত্র ৩০ বছর পর তারাই আবার বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন করেছিল, পরাজয়ের দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে। অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে যারা কষ্ট পেয়েছিল, তারাই শেষ হাসিটি হেসেছিল, আজ নতুন পতাকা আর নতুন মানচিত্র পেয়েছে। ১৯০৫ সালে যে অঞ্চলটি নিয়ে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, অনেকটা সেই এলাকা নিয়েই ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট জন্মলাভ করে পূর্ব পাকিস্তান এবং আড়াই দশকের কম সময় পর একই সীমারেখা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এ ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে এটিই প্রমাণিত হয়েছে যে, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ছিল যথার্থ পদক্ষেপ।
বঙ্গভঙ্গ ১৮০৫ সালের ১৬ অক্টোবর কার্যকর হয়। তবে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আরও প্রায় অর্ধশত বছর আগে। ১৮৫৩ সালে স্যার চার্লস গ্র্যান্ট এবং ১৮৫৪ সালে লর্ড ডালহৌসি বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব করেন। ব্রিটিশরা বাংলা দিয়েই ভারতবর্ষে তাদের উপনিবেশ শুরু করেছিল। বাংলা ছিল ওই সময়ের ব্রিটিশ ভারতের সর্বপ্রধান ও সবচেয়ে বড় প্রদেশ। প্রায় ২,৪৮,১২০ বর্গমাইলের এ বিশাল প্রদেশের শাসনকাজ সহজ করাই ছিল বঙ্গভঙ্গের প্রধান লক্ষ্য। ১৮৯৮ সালে লর্ড কার্জন ভাইসরয় নিযুক্ত হলে তিনি বঙ্গ প্রদেশের প্রশাসনিক সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হন এবং এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৩ সালে বঙ্গ বিভাগের একটি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। ১৯০৪ সালে তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বাংলার পূর্বাঞ্চলের বেশ কয়েকটি শহর পরিদর্শন করেন। এর মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে অনুভব করেন যে, বাংলাকে ভাগ করা অপরিহার্য। অবশেষে বিলেতে বিশেষভাবে পরীক্ষার পর ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। নতুন প্রদেশের নাম রাখা হয় ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ’। প্রথম গভর্নর নিযুক্ত হন ব্যামফিল্ড ফুলার (১৮৫৪-১৯৩৫)।
পূর্ববঙ্গ তথা আজকের বাংলাদেশের মানুষের জন্য বঙ্গভঙ্গ কেন জরুরি ছিল? বাংলা ভাগ নিয়ে গবেষণাকারী মার্কিন অধ্যাপক জন আর ম্যাকলেইন উচ্চপদে সরকারি পদে হিন্দুদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ১৯০১ সালে তৎকালীন বাংলার সরকারের অধীনে উচ্চ পর্যায়ের নিয়োগের ক্ষেত্রে মুসলিমরা মাত্র ৪১টি পদ পেয়েছিল। অন্যদিকে মুসলিম জনসংখ্যার তিনভাগের একভাগ হয়েও হিন্দুরা নিয়োগ পেয়েছিল ১২৩৫টি উচ্চপদ।
১৯০৫ সালে আরেক সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বঙ্গভঙ্গের আগে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা এবং সাবডিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর মাত্র ছয় ভাগের এক পদে মুসলিমরা নিয়োজিত রয়েছে। পুলিশ বিভাগে মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল আরও খারাপ। শতকরা ৫৯ ভাগ মুসলমান জনসংখ্যা থাকার পরও তখন ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল রেঞ্জ’ নামে পরিচিত পুলিশ বিভাগে মোট ৫৪ জন ইনস্পেক্টরের মধ্যে চারজন, ৪৮৪ জন সাব ইনস্পেক্টরের মধ্যে ৬০ জন, ৪৫০ জন হেড-কনস্টেবলের মধ্যে ৪৫ জন এবং ৪৫৯৪ জন কনস্টেবলের মধ্যে মাত্র ১০২৭ জন কনস্টেবল ছিলেন মুসলমান।
এটা ঠিক, নতুন ব্যবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুরা ভাষাগত দিক থেকে সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছিল। তবে তারা এর বিরোধিতা করেছিল মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে। তাদের আশঙ্কা ছিল, বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ব বাংলা এবং হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম বাংলা সৃষ্টি হবে, যা সামগ্রিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতাকে কমিয়ে দেবে। তাদের আশঙ্কা ছিল, কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু আইনজীবী, জমিদার, শিল্পপতি এবং রাজনীতিবিদদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আর বহাল থাকবে না।
বঙ্গভঙ্গ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ছয় বছর-১৯০৫ থেকে ১৯১১। এর মধ্যেই যে উন্নতি-অগ্রগতি হয়েছিল, তা রাজধানী-কলকাতার অধীনে ইংরেজ শাসনের ১৭৫৭ থেকে ১৯০৪ সাল এবং ১৯১২ থেকে ১৯৪৬ পর্যন্ত কয়েকশ বছরে হয়নি। এ সময়ে মোগল রাজধানী ঢাকা নিজের লুপ্ত গৌরব ফিরে পেতে থাকে, দ্রুত প্রসার লাভ করতে থাকে। প্রতি ক্ষেত্রেই উন্নতি দেখা যেতে থাকে। নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেনেন্ট গভর্নর স্যার ব্যামফিল্ড ফুলার সচেতন ছিলেন যে, মুসলমানরা শিক্ষাক্ষেত্রে অনগ্রসর এবং সরকারি চাকরিতে তাদের সংখ্যা খুবই কম। অতএব নতুন প্রদেশের উন্নয়নের প্রতি তিনি বিশেষ যত্নবান হন। তা ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ নৌপথ ও সড়ক পথের উন্নতি সাধনের জন্য এক বছরের মধ্যে বিরাট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। অভ্যন্তরীণ ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে স্থানীয় বণিক ও বাণিজ্যিক পণ্যের নিরাপত্তা বিধানের জন্য নৌ-পুলিশের শক্তি বাড়ানো হয়। গ্রামের সঙ্গে শহর এবং বাণিজ্য কেন্দ্রের সংযোগের জন্য পুরোনো রাস্তাগুলোর সংস্কার এবং নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।
উল্লেখ্য, এ সময়ই নির্মিত হয় গভর্নর হাউস (বঙ্গভবন), রমনা এলাকায় সরকারি ভবনাদি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বর্ধমান হাউস (বাংলা একাডেমি), হুদা হাউস, কাকরাইল ও বেইলি রোড এলাকায় সার্কিট হাউসসহ বহু অফিস ও আবাসস্থল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চিন্তা এ সময়েই হয়।
নতুন প্রদেশের মুসলমানদের শিক্ষা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো বিশেষভাবে পর্যালোচনা করে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মুসলমান ছাত্রদের জন্য সরকারি বৃত্তি বাড়ানোর ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই স্কুল-কলেজের ছাত্র সংখ্যা বেড়ে যায়। মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষাপ্রসারের জন্য অতিরিক্ত পদক্ষেপ হিসাবে বেশি সংখ্যক মুসলমান শিক্ষক ও স্কুল পরিদর্শক নিযুক্ত করা হয়।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯০৬ সালে নবগঠিত পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশে কলেজিয়েট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১,৬৯৮ এবং কলেজিয়েট শিক্ষার জন্য ব্যয় হতো ১,৫৪,৯৫৮ টাকা। ১,৯১২ সালে ছাত্র সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৫৬০ এবং শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩,৮৩,৬১৯ টাকায়, যা বঙ্গভঙ্গ রদের মাধ্যমে নতুন প্রদেশ বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে আবার কমতে থাকে। একই চিত্র দেখা যায় সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রেও। ১৯০৫ সালে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ৬,৯৯,০৫১। তা ১৯১০-১১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৯,৩৬,৬৫৩। এ সময় প্রাদেশিক সরকারের শিক্ষা খাতের ব্যয় ১১,০৬,৫১০ টাকা থেকে ২২,০৫,৩৩৯ টাকায় বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় শিক্ষা ব্যয়ও ৪৭,৮১,৮৩৩ টাকা থেকে ৭৩,০৫,২৬০ টাকায় বাড়ে।
নতুন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠিত হওয়ার কারণে বিশেষ ইতিবাচক প্রভাব জনগণের অর্থনৈতিক ভাগ্যের চাকা গতিশীল করে। এ সময় নতুন প্রদেশে নিজস্ব বাজার ও বিপণন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় প্রধান অর্থকরী ফসল পূর্ব বাংলার সোনালি আঁশ পাটের চাহিদা ও দাম বাড়ে। ১৯০৪ সালের চেয়ে ১৯০৬-১৯০৭ সালের পাটের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়, যা পরবর্তী কয়েক বছর স্থায়ী হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৮৯৬-১৮৯৭ সালে প্রতি বেল পাটের মূল্য ছিল ৩০ টাকা। তা ১৯০৬-১৯০৭ সালে বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৫৯ টাকায়। আন্তর্জাতিক বাজারের সুফলও বাড়ে এবং সেটা পূর্ব বাংলার কৃষকরা সরাসরি লাভ করেন। কারণ, কলকাতার ফড়িয়া, ব্যবসায়ী ওই সময় কমিশন ও বাড়তি লভ্যাংশ নিজেদের কবজায় নেওয়ার সুযোগ পায়নি।
বঙ্গভঙ্গ বহাল থাকলে আরও কী কী হতে পারত? অনেক কিছুই হতে পারত। রাজধানী ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানী হিসাবে গড়ে উঠতে পারত। এখানে সচিবালয় থাকত, প্রাদেশিক আইন পরিষদ ভবন থাকত, গভর্নর হাউস থাকত। হাইকোর্ট কমপ্লেক্স থাকত, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠত, একটা নয়, গোটা পাঁচেক বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, বিদ্যালয়সহ আরও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারত। প্রাসঙ্গিক অনেক অবকাঠামো গড়ে ওঠত। বাঙালি মুসলমানরা বিপুল সংখ্যায় সামরিক ও বেসামরিক আমলামন্ত্রে প্রবেশ করার সুযোগ পেত। উচ্চবর্ণের হিন্দু গোষ্ঠীর কারণে এসব থেকে বঞ্চিত হতে হয় বাঙালি মুসলিমদের। ফলে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার সময় এখানে না ছিল সচিবালয়, না ছিল গভর্নর হাউস। একেবারে শূন্য থেকে এখানকার অবকাঠামো গড়ে নিতে হয়। ’৪৭ সালের পর পলাশি এলাকায় বাঁশের বেড়া দিয়ে প্রথম প্রাদেশিক সচিবালয় বানাতে হয়েছিল।
বঙ্গভঙ্গ অটুট থাকলে পাটকলসহ অনেক কারখানা স্থাপিত হতো পূর্ববঙ্গে। এর জন্য ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হতো না। পূর্ববঙ্গেই পাট হতো। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানে একটি পাটকলও প্রতিষ্ঠা হয়নি। চট্টগ্রাম বন্দরটি আধুনিক সমুদ্রবন্দরে পরিণত হতে পারত। ১৯৪৭ সালে বন্দরবিহীন অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হতো না। বঙ্গভঙ্গ বহাল থাকার অর্থ ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ বন্দরের অস্তিত্ব থাকত এখানে।
বঙ্গভঙ্গ রদ না হলে কি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হতো? খুব সম্ভবত হতো না। বঙ্গভঙ্গ বহাল থাকলে পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের মধ্যে আর্থিক-সামাজিক ব্যবধান অনেক কম থাকত। পূর্ববঙ্গের লোকজন ১৮৪৭ সালে এসে সম্ভবত এ অবস্থা দেখতে পেত না যে এখানকার জমিদারদের বেশিরভাগই হিন্দু, কিন্তু প্রজা মুসলমান; উকিল হিন্দু, কিন্তু মক্কেল মুসলমান; বিচারক হিন্দু, কিন্তু আসামি মুসলমান; প্রশাসক হিন্দু, কিন্তু শাসিত ব্যক্তিটি মুসলমান; মহাজন হিন্দু, আর ঋণগৃহিতা মুসলমান। চল্লিশের দশকেও যখন বাঙালি মুসলিম অব্যাহত বঞ্চনা, শোষণের শিকার হতে থাকল এবং দেখল যে তাদের ওপর হিন্দু জমিদারতন্ত্র, মহাজনতন্ত্র, আমলাতন্ত্র চেপে বসেছে, তখন তাদের মনে হয়েছিল যে অখণ্ড ভারতবর্ষে থাকা মানে এসব জুলুম, নির্যাতন অব্যাহত থাকা। তখন এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পাকিস্তান আন্দোলনকে সফল করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল বাঙালি মুসলমানরাই।
মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিকশের দশকেও যখন বাঙালি মুসলিম অব্যাহত বঞ্চনা, শোষণের শিকার হতে থাকল এবং দেখল যে তাদের ওপর হিন্দু জমিদারতন্ত্র, মহাজনতন্ত্র, আমলাতন্ত্র চেপে বসেছে, তখন তাদের মনে হয়েছিল যে অখণ্ড ভারতবর্ষে থাকা মানে এসব জুলুম, নির্যাতন অব্যাহত থাকা। তখন এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পাকিস্তান আন্দোলনকে সফল করতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল বাঙালি মুসলমানরাই।
মোহাম্মদ হাসান শরীফ : সাংবাদিক