বঙ্গোপসাগরে ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ
মহামূল্যবান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দেশের জলসীমা, বছরে অন্তত আড়াই লাখ কোটি ডলার আহরণ সম্ভব জিয়াউল হক মিজান [প্রকাশিত : জনকণ্ঠ, ৯ অক্টোবর ২০২৫]

বাংলাদেশের অগভীর ও গভীর সমুদ্রের তলদেশে ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যমানের খনিজ সম্পদ ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। অগভীর সমুদ্রে মিলেছে বিপুল পরিমাণ সিমেন্ট তৈরির কাঁচামাল ‘ক্লে’র সন্ধান। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের ১৩টি স্থানে পাওয়া গেছে ইলমেনাইট, গার্নেট সিলিমানাইট, জিরকন, রুটাইল ও ম্যাগনেটাইট সমৃদ্ধ ভারি খনিজ বালু। বাংলাদেশের সমুদ্র ভাগেও রয়েছে বড় ধরনের গ্যাসের মজুত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগর থেকে বছরে আড়াই লাখ কোটি ডলারের সম্পদ আহরণ করা সম্ভব। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় দেশ বর্তমানে আহরণ করছে মাত্র ৯৬০ কোটি ডলারের সম্পদ।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বঙ্গোপসাগরে সম্ভাবনাময় অপ্রাণিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, চুনাপাথর প্রভৃতি। রয়েছে আরও ১৭ ধরনের খনিজ বালু। এর মধ্যে ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, ম্যাগনেটাইট, গ্যানেট মোনাজাইট, কায়ানাইট, লিকোক্সিন উল্লেখযোগ্য। এগুলোর দামও অনেক বেশি। তাদের মতে, বঙ্গোপসাগরে অর্জিত সমুদ্রসীমা থেকে প্রায় ১০ লাখ টন এসব খনিজ বালু আহরণ সম্ভব। এ ছাড়াও সাগরের তলদেশে ক্লেসার ডেপোজিট, ফসফরাস ডেপোজিট, এডাপোরাইট, পলিমেটালিক সালফাইড, মাঙ্গানিজ নডিউল নামক খনিজ পদার্থ আকরিক অবস্থায় পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়।
এদের পরিশোধনের মাধ্যমে লেড, জিংক, কপার, কোবাল্ট, মলিব ডেনামের মতো দুর্লভ ধাতুগুলো আহরণ করা সম্ভব হবে। এ সব দুর্লভ ধাতু উড়োজাহাজ নির্মাণে, রাসায়নিক কারখানায় এবং বিভিন্ন কলকারখানায় উৎপাদন কাজে ব্যবহার করা যাবে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে বছরে তিন থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের কর্মকা- সংঘটিত হচ্ছে সমুদ্রকে ঘিরে। বিশ্বের সাড়ে সাতশ’ কোটি মানুষের ১৫ ভাগ প্রোটিনের জোগান দিচ্ছে সামুদ্রিক মাছ, উদ্ভিদ ও জীবজন্তু। পৃথিবীর ৩০ ভাগ গ্যাস ও জ্বালানি তেল সরবরাহ হচ্ছে সমুদ্রতলের বিভিন্ন গ্যাস ও তেলক্ষেত্র থেকে। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা হবে প্রায় ৯০০ কোটি। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর খাবার জোগান দিতে বিশ্ববাসীকে তাকিয়ে থাকতে হবে সমুদ্রের দিকেই।
বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যাবে সমুদ্রনির্ভর ব্লু-ইকোনোমির বদৌলতে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বঙ্গোপসাগরের তলদেশে যে খনিজ সম্পদ রয়েছে, তা পৃথিবীর অন্য কোনো সাগর-উপসাগরে নেই। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সমুদ্র সম্পদের অবদান মাত্র ৯.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৬ শতাংশ।
জানা যায়, দেশের সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ব্লু ইকোনোমি খাতের সম্ভাবনাকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করতে ৯টি খাতে সুনির্দিষ্ট করে কাজ চালাচ্ছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় প্রায় দুবছর গবেষণার পর গতবছর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের একান্ত সমুদ্র এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির কিছু মূল্যবান উদ্ভিজ এবং প্রাণিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে।
যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় বিপুল পরিমাণ গ্যাস হাইড্রেট ছাড়াও ২২০ প্রজাতির সি-উইড বা শ্যাওলা, ৩৪৭ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪৯৮ প্রজাতির ঝিনুক, ৫২ প্রজাতির চিংড়ি, ৫ প্রজাতির লবস্টার, ৬ প্রজাতির কাঁকড়া এবং ৬১ প্রজাতির সি-গ্রাস রয়েছে।
জানা যায়, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিজয়ের পর ২০১৪ সালে স্বল্প, মধ্য ও দীঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা প্রণয়ন করে সরকার। এ কর্মপরিকল্পনা জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির সঙ্গে সমন্বয় করে ২০১৮ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হালনাগাদ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনায় সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের মজুত নিরূপণ ও মৎস্য আহরণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে।
এছাড়া দেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনোমিক জোন ও ২০০ মিটার গভীরতার ঊর্ধ্বে বাণিজ্যিকভাবে টুনা ও বৃহৎ মৎস্য আহরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এরই মধ্যে ১১টি লং-লাইনার এবং ৮টি পার্স সেইনার প্রকৃতির মোট ১৯টি ট্রলার কোম্পানিকে ফিশিং লাইসেন্সের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
২০১৮ সালে ইন্ডিয়ান ওশেন টুনা কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভ করেছে বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এবং আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনায় সামুদ্রিক মৎস্য নৌযান পরিবীক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা জোরদারকরণ, অবৈধ ফিশিং নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি উপকূলীয় জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন ও সুন্দরবন অঞ্চলের জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের ডাটাবেজ তৈরি ও মেরিকালচার ও কোস্টাল একুয়াকালচার সম্প্রসারণে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন, পরিবীক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসীমায় মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। ৩২ দিনব্যাপী এ অভিযানে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১৩ জন বিজ্ঞানীসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মোট ২৬ জন গবেষক অংশগ্রহণ করেন। জরিপে ছোট পেলাজিক ও মেসোপেলাজিক মাছের প্রাচুর্য ও মজুত নিরূপণ, তলদেশীয় মৎস্যসম্পদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্য মূল্যায়ন এবং সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি সমুদ্রের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, স্রোতের গতি, উৎপাদনশীলতা, গভীর সমুদ্র সঞ্চালন ব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ, টেকসই আহরণ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিযোজন এবং সামুদ্রিক পরিবেশ সুরক্ষায় জাতীয় নীতি প্রণয়নে সহায়তা করবে এবং বাংলাদেশের বিজ্ঞানীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলের সম্পদ ও পরিবেশের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সম্প্রতি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, বঙ্গোপসাগরের একটা অংশও আমাদের দেশ। এর পরিমাণ মোট জমির পরিমাণের চাইতে বেশি। বঙ্গোপসাগর আমাদের দেশের মূল্যবান অংশ, এ কথা সবসময় মাথায় রেখে অগ্রসর হব।
এই অংশের পানির ওপর দিয়ে দেশ-বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করব। এর মাধ্যমে আমরা পুরো পৃথিবীকে আমাদের প্রতিবেশী বানাব। উপকূল অঞ্চল অফুরন্ত সম্ভাবনার আধার মন্তব্য করে তিনি বলেন, কুমিরা থেকে টেকনাফ পর্যন্ত নানা বন্দরের কর্মচাঞ্চল্যে সমগ্র উপকূল অঞ্চলকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে।
বঙ্গোপসাগরে ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, রুটাইল, জিরকন, গার্নেট, ম্যাগনেটাইট, মোনাজাইট, কোবাল্টসহ অত্যন্ত মূল্যবান ভারি খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে জানিয়ে বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক নাদিয়া ইসলাম নদী গণমাধ্যমকে বলেন, এসব মূল্যবান সম্পদ সঠিক উপায়ে উত্তোলন করতে পারলে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।
গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি হলে বাংলাদেশের বন্দরের সুযোগ সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজসমূহের ফিডার পরিষেবা কার্যক্রম বাড়ানোর মাধ্যমে আমাদের বন্দরসমূহ কলম্ব, সিঙ্গাপুর বন্দরের মতো আরও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর হয়ে উঠতে পারে। এ বিষয়ে খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা বা ঢেউকে ব্যবহার করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। কিন্তু ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো এই উৎসের ব্যবহার করতে পারেনি।
ব্লু-ইকোনমিকে সমৃদ্ধ করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে জানিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশনোগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুসলেহ উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, এ জন্য পরিকল্পনার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিও যুক্ত করতে হবে। কারণ, এই অর্থনীতির অংশ হিসেবে সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। আধুনিক জাল ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি না থাকায় আমাদের জেলেরা বঙ্গোপসাগর থেকে কাক্সিক্ষত পরিমাণে মাছ ধরতে পারছে না জানিয়ে তিনি বলেন, ব্লু-ইকোনমির একটা বড় দিক হচ্ছে জীববৈচিত্র্য।
তারপর আরেকটি দিক ট্রান্সপোর্টেশন। বাংলাদেশে সামুদ্রিক ট্রান্সপোর্টেশনের মাধ্যমে বড় একটা অর্থনৈতিক ভূমিকা রাখতে পারে। গত ১০ বছরে কিন্তু আমাদের দেশে অনেক মেরিন আর্কিটেক্ট, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার গড়ে উঠেছে এবং তারা বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশের মেরিন ইঞ্জিনিয়াররাই কাজ করছে। বাংলাদেশের শিপইয়ার্ডের ব্যবসাটাকে আন্তর্জাতিক মানের করতে পারলে আমরা ব্লু-ইকোনমির আরেকটি দিক অর্জন করতে পারব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সুনীল অর্থনীতির সুফল পেতে হলে দূষণ নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সর্বস্তরের জনসচেতনতা একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে। যদি আমরা সঠিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে বঙ্গোপসাগর শুধু আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও এক সমৃদ্ধ সম্পদভাণ্ডার হয়ে থাকবে।