কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

ব্লু ইকোনমি : স্বপ্ন এক সাগর বিনিয়োগ কই?

আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে (তথ্যমতে, এ জলসীমা দেশের স্থলভাগের প্রায় ৮১ শতাংশের সমান)। ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালি, দাউদ ইব্রাহিম হাসান [প্রকাশ : বণিক বার্তা, ২৬ অক্টোবর ২০২৫]

ব্লু ইকোনমি : স্বপ্ন এক সাগর বিনিয়োগ কই?

আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বেশি সমুদ্র এলাকার ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে (তথ্যমতে, এ জলসীমা দেশের স্থলভাগের প্রায় ৮১ শতাংশের সমান)। উপকূলীয় মানুষের কাছে এটা শুধু ভূখণ্ডের বিজয় ছিল না; ছিল ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর এক অলিখিত প্রতিশ্রুতি। যারা শহরে গিয়ে সামান্য বেতনে জীবনযুদ্ধে লড়ছে, তাদের বিশ্বাস ছিল এবার হয়তো সমুদ্রের অফুরান সম্পদে ভর করে তাদের দিন ফিরবে। কিন্তু বছর পেরোতেই সেই স্বপ্ন যেন ভাটার জলে মিলিয়ে যেতে শুরু করল।

 

 
 
 
 
 
 
 
 
 

বর্তমানে মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি ও ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হলেও ব্লু ইকোনমি খাতে বিশেষজ্ঞ, মেরিন বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষিত শ্রমিকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। শিক্ষিত তরুণরা এ বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও সঠিক প্রশিক্ষণ, পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্তের অভাবে বিনিয়োগকারীরাও এ খাতে আকৃষ্ট হচ্ছেন না। এটা কি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা, নাকি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব?

 

 

 

এদিকে পায়রাবন্দর ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প ব্লু ইকোনমিকে শক্তিশালী করার বড় পদক্ষেপ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের আমদানি-রফতানির ৯২ শতাংশই সমুদ্রপথেই সম্পন্ন হয়। এ উন্নয়ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্প্রসারণে সহায়ক হলেও বন্দরের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকা বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরে অফশোর নবায়নযোগ্য শক্তি (যেমন তরঙ্গ, জোয়ার-ভাটা) ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চললেও এখনো পর্যন্ত এ খাতে গবেষণা ও পরীক্ষামূলক প্রকল্পের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি হয়নি।

 

 

অন্যদিকে সরকার সামুদ্রিক মৎস্য আহরণে সময়ভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা দিলেও অবৈধ মাছ ধরা, উন্নত প্রযুক্তির অভাব এবং জেলেদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে মানা কঠিন হচ্ছে। এটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। আবার কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিনসহ উপকূলীয় অঞ্চলের পর্যটন ব্লু ইকোনমির আয়ের উৎস হলেও পরিকল্পনাহীন পর্যটন ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে পরিবেশগত দূষণ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 

 

সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ ব্লু ইকোনমি খাত থেকে প্রতি বছর প্রায় ২৫০ কোটি ডলার আয় করার লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য সমন্বিত নীতি প্রণয়ন ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অপরিহার্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে মেরিন বায়োটেকনোলজি, ওশান ইঞ্জিনিয়ারিং, নেভিগেশন, সামুদ্রিক ওষুধ এবং অফশোর ফিশিং খাতে প্রায় ৩০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এ কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও ডিপ্লোমা পর্যায়ে ব্লু ইকোনমি-কেন্দ্রিক নতুন পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে এবং বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জোরদার করা অত্যাবশ্যক। সামুদ্রিক জৈবপ্রযুক্তি ও ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প স্থাপন করে ওষুধ, কসমেটিকস ও খাদ্যপণ্য তৈরির ব্যাপক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে।

 

 

যদি এ সমস্যাগুলোর সমাধান না হয়, তবে এর ভবিষ্যৎ প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হবে। অদক্ষ জনবল তৈরি হতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেশের সম্পদ ব্যবহারে অক্ষম হয়ে পড়বে। ফলে তরুণরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে বিদেশে পাড়ি দিতে চাইবে। আজ যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেরিন সায়েন্স পড়ছেন, তারা যদি আগামীতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত না হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে বিশাল সমুদ্রসম্পদ অব্যবহৃত থাকবে। এটি সমাজে এক গভীর হতাশার কালো ছায়া ফেলবে, যা বর্তমানে আমাদের চারপাশে দেখা যাচ্ছে। উপকূলীয় পর্যটন পরিকল্পনাহীনভাবে বাড়তে থাকলে পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটবে। ফলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য (যেমন কোরাল রিফ ও সি টার্টল) মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে। ফলে দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ইকো-সিস্টেম নষ্ট হবে, যা সরাসরি স্থানীয় জেলে ও পর্যটন-নির্ভর মানুষের জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

 

 

এ দুর্বিষহ পরিস্থিতিতেও আশার আলো দেখা যায় সাধারণ দায়িত্বশীল মানুষের মধ্যে। কক্সবাজারের একদল স্কুল শিক্ষার্থী সম্প্রতি নিজেদের উদ্যোগে সমুদ্র সৈকত থেকে প্লাস্টিক পরিষ্কারের কাজ শুরু করেছে। তারা হয়তো সংখ্যায় কম, কিন্তু তাদের কাজ প্রমাণ করে যে সাধারণ জনগণ পরিবেশ সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। কিছু স্থানীয় মৎস্যজীবী সংগঠন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ট্রলার ব্যবহার করে এবং সরকারের নিষেধাজ্ঞা মেনে টেকসই মৎস্য আহরণের উদ্যোগ নিয়েছে। মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরাও মেরিন বায়োটেকনোলজি নিয়ে ছোট ছোট গবেষণা শুরু করেছেন। বিশ্বব্যাংক ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা হলে এ বেসরকারি উদ্যোগগুলো উপকূলীয় অঞ্চলভিত্তিক ‘‌ব্লু গ্রোথ হাব’ তৈরি করতে পারে। এ উদ্যোগগুলো প্রমাণ করে, যদি সঠিক কর্মপন্থা ও নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা যায়, তবে এ দেশ আবার ঘুরে দাঁড়াবে।

 

 

ব্লু ইকোনমি বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নিছক একটি অর্থনৈতিক ধারণা নয়, এটি বেঁচে থাকার এক নতুন দিগন্ত। এটি ব্যবসায়িক পরিবেশের পাশাপাশি উন্নত ভবিষ্যৎ তৈরির অপার সম্ভাবনা ধারণ করে। কিন্তু এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের দুর্বলতা দূর করতে হবে, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও দক্ষ জনবল তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব নীতির মাধ্যমে পর্যটন ও খনিজ সম্পদ আহরণ নিশ্চিত করতে হবে। সমস্যার প্রতিরোধ ও প্রতিকারে শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়, প্রতিটি নাগরিকের এগিয়ে আসা অপরিহার্য। তরুণদের স্বপ্ন ও সমুদ্রের বিপুল সম্পদের মেলবন্ধনেই দেশের অর্থনীতি পাবে নতুন গতি। তাই সময় এসেছে দীর্ঘসূত্রতার জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার এবং স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার। যে সমুদ্র আমরা জয় করেছি, তার প্রতিটি সম্পদ কাজে লাগাতে হবে।

 

 

ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব: সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও গ্লোবাল কনসালট্যান্ট ডিরেক্টর, অক্সফোর্ড ইমপ্যাক্ট গ্রুপ (যুক্তরাজ্য)

 

 

দাউদ ইব্রাহিম হাসান: গবেষণা সহকারী, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়