বিশ্বের স্মরণকালের সর্ববৃহৎ জানাজা
শামীম আহমেদ [সূত্র : প্রথম আলো, ০১ জানুয়ারি ২০২৬]

ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জানাজার সাক্ষী হলো রাজধানী ঢাকা। গতকাল পুরো মহানগরী যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল জানাজার মাঠে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শেষ বিদায়ে সকাল থেকেই রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অভিমুখে নামে মানুষের ঢল। বলা হচ্ছে এটি মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের বৃহৎ জানাজা। দলমত, ধর্মবর্ণনির্বিশেষে হাজির হয় মানুষ। জাতীয় সংসদ ভবনের সব মাঠ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবনের চারপাশের প্রতিটি সড়ক হয়ে যায় লোকারণ্য। কফিন থেকে চতুর্দিকে দুই-তিন কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায় জানাজার সারি। যারা সময়মতো পৌঁছাতে পারেননি, তারা টেলিভিশনের লাইভের সঙ্গে যে যার অবস্থানে থেকে জানাজায় শরিক হন।
বলা হচ্ছে, এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ জানাজা। এই ব্যাপ্তি শুধু মানুষের সংখ্যা দিয়েই নয়, আবেগ, ভালোবাসা ও অশ্রু দিয়েও যা ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব রেকর্ড। প্রতিটি মুখে একটাই অনুভূতি হারানোর বেদনা। রাজনীতির বাইরে দাঁড়িয়েও অনেকে এসেছিলেন কেবল একজন নারীর সংগ্রাম, সাহস আর দৃঢ়তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। নারীদের জন্যও জানাজা পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। জানাজা ও দাফন শেষে সন্ধ্যায়ও এলাকাটি ছিল লোকারণ্য।
জানাজা উপলক্ষে সকাল থেকেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের দিকে মানুষের স্রোত নামতে শুরু করে। রাজধানীর বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া হয়ে খামারবাড়ি ও বিজয় সরণি- সব সড়কেই শুধু মানুষ আর মানুষ। এমনকি অলিগলিতেও দাঁড়িয়ে জানাজায় অংশ নেন অসংখ্য মানুষ। কোথাও গাড়ি চলার জায়গা ছিল না, ছিল না পা ফেলার স্থানটুকুও। দুপুর ২টায় জানাজা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বেলা ১১টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে পা ফেলার জায়গা ছিল না। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজাও ততক্ষণে লোকারণ্য। এ সময় মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংসদ ভবনের পশ্চিম ও পূর্ব দিকের মাঠে অবস্থান নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। ভিড় ঠেলে খামারবাড়ি মোড় থেকে সংসদের গেট পর্যন্ত যেতেই পার হয়ে যায় আধা ঘণ্টার বেশি।
দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ দুই থেকে তিন কিলোমিটার আগে গাড়ি রেখে হেঁটে আসেন জানাজাস্থলের দিকে। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সি মানুষ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাঁটছিলেন। কেউ হাতে জাতীয় পতাকা, কেউ হাতে দলীয় পতাকা, আবার কেউ নিঃশব্দে চোখ মুছতে মুছতে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ৮-১০ কিলোমিটার হেঁটেও অসংখ্য মানুষ জানাজায় উপস্থিত হন। রাজধানীর মেট্রোরেলেও ছিল অস্বাভাবিক ভিড় মানুষের একটাই গন্তব্য, শেষবারের মতো ‘আপন নেত্রীকে’ বিদায় জানানো। ভিড়ের কারণে স্টেশনে মেট্রো থামার নির্ধারিত সময়ে অনেকেই নির্দিষ্ট স্টেশনে নামতে পারেননি। মানিক নামের এক ব্যক্তি বলেন, আমি সচিবালয় স্টেশন থেকে উঠে ফার্মগেট স্টেশনে নেমে জানাজাস্থলে যেতে চেয়েছিলাম। ভিড়ের কারণে ফার্মগেট, এমনকি পরবর্তী বিজয়সরণি স্টেশনেও নামতে পারিনি। পরে আগারগাঁও স্টেশনে নামি। এদিকে সড়কের পাশাপাশি মেট্রোস্টেশনগুলোতে দাঁড়িয়েও জানাজায় অংশ নেয় হাজার হাজার মানুষ।
বিকাল ৩টায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হয় জানাজা। জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক। তার কণ্ঠে যখন দোয়ার শব্দ ভেসে আসে, তখন পুরো জানাজাস্থল নিস্তব্ধ হয়ে যায়। লাখ লাখ মানুষের সেই নীরবতা যেন এক গভীর শোকগাথা যেখানে কান্নার শব্দও চাপা পড়ে যায় আবেগের ভারে।
জানাজার আগে বিএনপির সদ্যপ্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য সবার কাছে দোয়া চান তাঁর বড় ছেলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জানাজার আগে খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন তুলে ধরেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসসহ সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং বেগম খালেদা জিয়ার পরিবার-পরিজন। জানাজায় উপস্থিত হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার শোকাহত জ্যেষ্ঠ পুত্র ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সান্ত্বনা জানান প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস।
জানাজায় এসে বহু মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ বলছিলেন, ‘তিনি আমাদের শেষ ভরসা ছিলেন।’ কেউ আবার নীরবে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছিলেন। জানাজায় ভিড়ের চাপে একজনের মৃত্যু হয়েছে। ভিড় এড়িয়ে সংসদ এলাকার প্রাচীর ডিঙিয়ে ঢোকার চেষ্টা করতে গিয়ে কেউ কেউ আহত হন। তবু কেউ সরে যাননি।
কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ ধরে যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম, মানুষের উপস্থিতি ততই বাড়ছিল। মূল সড়কের দুই পাশে মানুষ, ফুটওভারব্রিজে মানুষ, রাস্তার পাশের বিভিন্ন ভবনের ছাদে মানুষ, ঢাকা শহর যেন শোকযাত্রার নগরীতে পরিণত হয়। কেউ স্লোগান দিচ্ছেন না, কেউ নির্দেশনা দিচ্ছেন না, তবু সবাই একই দিকে যাচ্ছে। এক নীরব শৃঙ্খলা, যা কেবল শোক থেকেই জন্ম নেয়।
জানাজাস্থলের দিকে ছুটতে থাকা হাজার হাজার মানুষের সবাই বিএনপির নেতা-কর্মী নন। এঁদের মধ্যে ছিলেন সাধারণ পেশাজীবীরাও। এঁদের কেউ পাঁচ কিলোমিটার, কেউ সাত কিলোমিটার হেঁটে পাড়ি দিচ্ছেন। হাঁটতে হাঁটতেই কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী আমিরুল ইসলামের সঙ্গে। শাহবাগ এলাকা থেকে হাঁটা শুরু করেছেন তিনি। আমিরুল বলেন, ‘আমি রাজনীতি করি না। কিন্তু একজন নেত্রী দেশের মানুষের জন্য জীবনে এত অত্যাচার সহ্য করেছেন। তাঁর জানাজায় অংশ নিতে কয়েক কিলোমিটার হাঁটব, এতে আর কষ্ট কী?’
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর দিকে যত এগোচ্ছি, মানুষের ঢল তত ঘন হচ্ছে। ফার্মগেট মোড় পর্যন্ত পৌঁছাতেই হাঁটার গতি কমাতে হলো। সামনে মানুষ আর মানুষ। কেউ দলবদ্ধভাবে, কেউ একা। অনেকের মাথায় টুপি। কারও কারও হাতে বাংলাদেশের পতাকা-সবার লক্ষ্য সামনের দিকে যাওয়া।
অনীক নামের এক যুবক বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজায় অংশ নিতে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম বেলা ১১টায়। লাখো মানুষের পিছে পিছে হেঁটে দুই ঘণ্টায় পৌঁছাই সংসদ ভবনের কাছাকাছি লালমাটিয়ায় (আড়ংয়ের পেছনের রাস্তায়)। বেলা ১২টার পর থেকেই ওই এলাকার কোনো পথ-গলি, মোড়, মাঠ, বাসা-বাড়ির পার্কিং খালি ছিল না। শুধু মানুষ আর মানুষ। ওদিকে রংপুর থেকে আসা গাড়ি বহরের বিএনপি নেতা-কর্মীরা ফোনে জানাচ্ছিলেন, তারা টেকনিক্যাল মোড়েই দাঁড়িয়েছেন। মানুষের ঠাসা ভিড়ে সংসদ ভবনের দিকে এগোনো যাচ্ছে না। কারওয়ান বাজারে এটিএন বাংলা অফিস থেকে সহকর্মীরা জানালেন সার্ক ফোয়ারা মানে সোনারগাঁও হোটেলের মোড় থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রাস্তায়ও মানুষ দাঁড়িয়েছেন জানাজায়। ওদিকে আগারগাঁও রোকেয়া সরনিতেও কয়েক লাখ মানুষ। তার মানে এপার ওপার মিলিয়ে হিসাব করলে সংসদ ভবনের চারপাশ ঘিরে এ জানাজায় মানুষের জনসমাগম হয়েছে ১৫/১৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। ঢাকা কিংবা বাংলাদেশে আর কোনো কর্মসূচিতে কি কখনো এমন মানুষ হয়েছে? ত্রিশ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে অন্তত আমি দেখিনি। জানাজা শেষে, আসাদ গেট থেকে হেঁটে ৩ কিলোমিটার ফিরতেও মানুষের ঠাসা ভিড়ে সময় লাগল প্রায় দেড় ঘণ্টা।
বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি মানুষের এই অবারিত ভালোবাসা বুঝিয়ে দেয়, আগামী নির্বাচনে কী ফলাফল হতে চলেছে। এবার কবরে শান্তিতে ঘুমান, আপসহীন নেত্রী। দেশবাসী আপনার ত্যাগের প্রতিদান দেবে ইনশা আল্লাহ। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা যেন কেবল একটি রাজনৈতিক নেত্রীর বিদায় নয় একটি যুগের সমাপ্তি। লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি যেন প্রমাণ করল, সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও মানুষের ভালোবাসা আর স্মৃতির জায়গা থেকে তাকে মুছে ফেলা যাবে না। ইতিহাসের পাতায় এই জানাজা লেখা থাকবে অশ্রু দিয়ে, লেখা থাকবে মানুষের ঢল দিয়ে ঢাকাজুড়ে এক দিনের জন্য থেমে যাওয়া জীবন আর নিঃশব্দ বিদায়ের সাক্ষী হয়ে।