বিশ্বের সবচেয়ে বড় এতিমখানা গাজা
২ বছরে ৫৭ হাজার শিশু অনাথ [প্রকাশ: যুগান্তর, ২৩ অক্টোবর ২০২৫]

গাজায় ইসরাইলি হামলা শুরুর ঠিক ১৮ মাসের মাথায় (৩ এপ্রিল, ২০২৫) ফিলিস্তিনির কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো ঘোষণা দিয়েছিল-গাজা এখন আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় এতিমখানা। ১৮ বছর ধরে ইসরাইলি আগ্রাসনে অবরুদ্ধ বিশ্বের উন্মুক্ত কারাগার হিসাবে পরিচিত সেই গাজা উপত্যকায় আজ হাজার হাজার অনাথ শিশুর হাহাকার। ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে নতুন করে শুরু ইসরাইলি গণহত্যায় আরও হৃদয়বিদারক হয়ে উঠেছে বাবা-মা হারা সেসব অসহায় শিশুর আহাজারি। ইসরাইলের জাতি নিধন হত্যাযজ্ঞে প্রতিদিনই ভেসে উঠেছে নতুন নতুন অনাথের মুখ। চলতি সপ্তাহের শুরুতে (শনিবার) সেই পরিসংখ্যানই দিলেন গাজার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহকারী উপসচিব ড. রিয়াদ আল-বিতার। বলেন, বর্তমানে গাজার এতিমশিশুদের সংখ্যা বেড়ে আনুমানিক ৫৭ হাজারে দাঁড়িয়েছে। গণহত্যার আগে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ১৭,০০০। যুদ্ধের কারণে এই সংখ্যা তিনগুণ হয়েছে। আলজাজিরা।
রিয়াদ বলেন, ইসরাইলের দুই বছরের গণহত্যার ফলে প্রায় ৪০ হাজার শিশু তাদের বাবা ও মা দু’জনের মধ্যে অন্তত একজনকে হারিয়েছে। অনেকে আবার উভয়কে হারিয়ে একাই বেঁচে আছে এই ধ্বংসস্তূপের শহরে। গাজার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এখন এই বিপুল সংখ্যক অনাথ শিশুর জন্য একটি সমন্বিত পুনর্বাসন কৌশল গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিকল্পনায় থাকবে শিশুদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক পুনর্গঠন। একই সঙ্গে ‘পূর্ণাঙ্গ যত্ন’ নিশ্চিত করতে বিশেষ অনাথ আশ্রম ও সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। রিয়াদ আল জাজিরাকে বলেন, গাজা উপত্যকায় বর্তমানে অন্তত পাঁচটি নতুন অনাথ আশ্রম জরুরিভাবে প্রয়োজন।
একই সঙ্গে যেসব পরিবার অনাথ শিশুদের আশ্রয় দিচ্ছে, তাদের জন্যও তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি আরও জানান, মন্ত্রণালয় এখন মানবিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় রেখে একটি সমন্বিত ডিজিটাল সিস্টেম গড়ে তুলছে। যা নাগরিক নিবন্ধন ও সরকারি তথ্যসূত্র থেকে সংগৃহীত তথ্যের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ ডাটাবেস তৈরি করবে। এর লক্ষ্য, সহায়তা কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা, পুনরাবৃত্তি রোধ করা এবং সেবাপ্রদানকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করা। তবে গাজার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনেক স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার প্রবণতা মন্ত্রণালয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে রিয়াদ বলেন, ‘সব পক্ষের মধ্যে এখন সমন্বয়ের ভালো অগ্রগতি হয়েছে। সবাই মিলে কাজের একটি অভিন্ন ধারা তৈরি করতে পেরেছি।’
ইসরাইলি আগ্রাসন শুধু জীবনই কেড়ে নেয়নি, এটি পুরো গাজাকে চরম দারিদ্র্যের কবলেও ফেলে দিয়েছে। ড. রিয়াদ জানান, যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফিলিস্তিনিরা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। তার ভাষায়, গাজায় দারিদ্র্য এখন সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে, যেখানে কে সবচেয়ে দরিদ্র, তা নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। রিয়াদের মতে, বর্তমানে গাজায় দারিদ্র্যের হার ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এর কারণ হিসাবে তিনি উল্লেখ করেন, ইসরাইলি আগ্রাসনে আয়-উৎস হারানো, অনাহার এবং দখলদার বাহিনীর পরিকল্পিত দারিদ্র্যনীতিকে। গাজায় এখন সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো শিশুদের ভবিষ্যৎ। যুদ্ধ তাদের শিক্ষা, পরিবার, নিরাপত্তা ও স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। ফলে ভয়, সহিংসতা ও শিশুশ্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই যুদ্ধে সবচেয়ে ভারী বোঝা বহন করছে গাজার নারীরা।