কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বিশ্বে ফের পরমাণু অস্ত্রের ‘গর্জন’

হুমায়ূন কবির [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৬ নভেম্বর ২০২৫]

বিশ্বে ফের পরমাণু অস্ত্রের ‘গর্জন’

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক অস্ত্র আছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের কাছে। গত বছর তারা একাধিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষা চালিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী অন্যদের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে গত ২৬ অক্টোবর পারমাণবিক শক্তিচালিত আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ‘বুরেভেস্তনিক’র সফল পরীক্ষা চালায় রাশিয়া। এর দুদিন পর ২৯ অক্টোবর তারা উৎক্ষেপণ করে পারমাণবিক সুপার টর্পেডো ‘পোসেইডন’। আর চীন তো ২০২০ সালের পর থেকে ভয়াবহ মাত্রায় অস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৫ নভেম্বর ওয়াশিংটন মিনিটম্যান থ্রি নামে পরমাণু ওয়ারহেড বহনে সক্ষম আইসিবিএম পরীক্ষা চালিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অস্ত্র বিস্তারবিরোধী বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তা বিস্তারে লাগাম টেনেছিল। তবে সম্প্রতি এসব দেশ চুক্তি উপেক্ষা করে আইসিবিএস পরীক্ষা শুরু করেছে। এতে বিশ্বের কৌশলগত ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর কারণগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন হুমায়ূন কবির

 

 

নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরই) বলছে, বর্তমানে ৯টি দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে—দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়া; সবার কাছে মোট ১২ হাজার ২৪১টি পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে। প্রায় ৯ হাজার ৬১৪টি সম্ভাব্য ব্যবহারের জন্য সামরিক মজুতে রয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৯১২টি বতর্মানে মোতায়েন অবস্থায় আছে।

 

 

সম্প্রতি রাশিয়া পারমাণবিক শক্তিচালিত বুরেভেস্তনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়, যার ড্রোনটিকে বলা হচ্ছে ‘ডুমসে মেশিন বা কেয়ামতের হাতিয়ার’। আরেকটি পরমাণু শক্তিচালিত ‘পোসেইডন টর্পেডো’ পরীক্ষা চালায় তারা। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিপক্ষদের মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে অবিলম্বে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার শুরুর নির্দেশ দেন। এরই মধ্যে উদীয়মান পারমাণবিক শক্তিধর চীন তার নতুনতম আইসিবিএম শক্তি প্রদর্শন করেছে।

 
 

এরপরই যুক্তরাষ্ট্র মিনিটম্যান থ্রি আইসিবিএম পরীক্ষা চালায়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, সামরিক বাহিনীর এ পরীক্ষা বহু বছর আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। ট্রাম্প পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার নির্দেশ দিলেও বলেন, তিনি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য কাজ করতে পারেন। যারা আগামী চার বা পাঁচ বছরের মধ্যে এ অস্ত্রে তাদের ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি করেন তিনি।

 
 
 

সিএনএনের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২০ সালের পর থেকে চীন যে মাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন-সংক্রান্ত স্থাপনা বিস্তার করেছে, তা এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পুনঃসরবরাহ নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার পুরো বিপরীতে চীন নিয়ন্ত্রিত গবেষণা কেন্দ্র, কারখানা ও পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এমনই চিত্র ফুটে উঠেছে সর্বশেষ উপগ্রহচিত্র, খোলা নথি ও ভৌগোলিক বিশ্লেষণে।

 
 

এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও পিপলস লিবারেশন আর্মি রকেট ফোর্সের সঙ্গে যুক্ত ১৩৬টি স্থাপনার মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এ স্থাপনাগুলোর মোট নির্মিত ফ্লোর স্পেস বেড়েছে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ বর্গফুটেরও বেশি, যেখানে নতুন টাওয়ার, বাঙ্কার ও নিরাপত্তাবেষ্টনী স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশও চিহ্নিত করা গেছে।

 

 

এ বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক উইলিয়াম আলবার্গে বলেন, ‘চীন স্পষ্টতই সুপারপাওয়ারের অবস্থান দৃঢ় করছে। এটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার প্রাথমিক ধাপ।’

 

 

২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সামরিক আধুনিকায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর চীন ক্ষেপণাস্ত্র-সম্পৃক্ত নির্মাণকাজ প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়িয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অভিজ্ঞতাকে চীন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে—বিশেষত সস্তা ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রেখে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের কৌশলটি। মূলত বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি নবায়ন না হওয়ার মতো কারণে পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে কিছু দেশ।

 

 

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকিতে: এসআইপিআরই বলছে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ প্রযুক্তি প্রসারের ফলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।

 

 

বর্তমানে অন্তত পাঁচটি দেশ পরমাণু কর্মসূচির আধুনিকায়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এ আধুনিকায়নের মধ্যে রয়েছে, তাদের হাতে থাকা বর্তমান অস্ত্রগুলোর উন্নয়ন এবং এতে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা।

 

 

ইয়ারবুক ২০২৫ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাপী নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেড, বোমা এবং শেলের সংখ্যা ছিল ৬৪ হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা ১২ হাজার ২৪১। কমে আসার এ প্রবণতা এখন আবার উল্টো দিকে ঘুরছে বলে প্রতিবেদনটিতে আশঙ্কা করা হয়। সংস্থাটির পরিচালক ড্যান স্মিথ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এ অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনার পদক্ষেপের বিষয়টি আর থাকছে না।’

 

 

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং শীতল যুদ্ধ অবসানের পর থেকে পরমাণু অস্ত্র কমিয়ে আনার হারের চেয়ে নতুন করে তৈরি করার হার বেড়েছে। এদিকে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলোর মধ্যে এ অস্ত্রের আধুনিকায়নের বিষয়টি সাধারণ হলেও, স্মিথ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের সময় থেকে এ প্রক্রিয়াটি তীব্রতর হয়েছে। এ ছাড়া এ সময়ে নতুন প্রযুক্তির মিসাইল এবং বোমা বহনের খাতেও বিনিয়োগ বাড়ছে।

 

 

গবেষকরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশই এখন পারমাণবিক বোমা বানানোর কথা বিবেচনা করছে, বা বিধ্বংসী এ অস্ত্র নিজেদের কাছে রাখতে চায় নিউক্লিয়ার শেয়ারিং চুক্তির মাধ্যমে।

 

 

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকিতে

 

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, চীনের কাছে বর্তমানে অন্তত ছয়শ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় চীন দ্রুত গতিতে তার পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার প্রসারিত করছে।

 

 

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির অনুমান, ভারতও ২০২৪ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার কিছুটা সমৃদ্ধ করেছে। একই কাজ করছে পাকিস্তানও। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জড়ো করছে দেশটি।

 

 

ইসরায়েল অবশ্য নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে কখনোই স্পষ্ট তথ্য দেয়নি। তবে পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার আধুনিকায়ন করছে দেশটি—এমন সন্দেহ গবেষকদের।

 

 

ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এআই: ইয়ারবুক ২০২৫-এর সূচনায় গবেষক স্মিথ নতুন পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতার বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘এতে শীতল যুদ্ধের সময়ের চেয়েও আরও বেশি ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তা রয়েছে।’ এর কারণ হিসেবে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই), সাইবার সক্ষমতা এবং মহাকাশ প্রযুক্তির কথা বলেন।

 

 

কার কত পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে সে বিষয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হলে, তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারি করা হবে—সেই প্রশ্ন উঠেছে।

 

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন কিলার রোবটের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কিংবা রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় এবং আধা স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রের সম্পর্কের বিষয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না।

 

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তথ্য যাচাই-বাছাই করা যায়, যার ফলে সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ খুব দ্রুত নেওয়া যায়। কিন্তু এমন সফটওয়্যারে বা সিস্টেমে যেটি মেশিন লার্নিং, কিংবা এআইয়ের সঙ্গে জড়িত, সেখানে ছোট্ট ভুলেরও ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।

 

 

স্মিথ বলেন, ‘আমার মনে হয়, একটি সীমারেখা থাকা উচিত। এটি এমন হতে পারে যে, সব রাজনৈতিক নেতা, সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা একমত হবেন যে, পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের বিষয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নেওয়া হবে না।’

 

 

এ বিষয়ে তিনি রাশিয়ার লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টানিসলাভ পেত্রোভের উদাহরণ তুলে ধরেন। ১৯৮৩ সালে মস্কো থেকে ৬২ মাইল দক্ষিণে রাশিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় সিস্টেম থেকে জানানো হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আইসিবিএম ছোঁড়া হয়েছে। জবাবে ওয়ার্নিং সিস্টেমের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পেত্রোভ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। এর ফলে ভয়ানক যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া গিয়েছিল।

 

 

তবে গবেষক স্মিথ বলছেন, ‘আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ যুগে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পেত্রোভের দায়িত্ব কে পালন করবে?’