কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বিশ্ববাজার রাজনীতি ন্যায্যতা

এম এ হোসাইন প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ১১ অক্টোবর ২০২৫

বিশ্ববাজার রাজনীতি ন্যায্যতা

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাসে রয়েছে এক ধরনের সংযত আতঙ্কের সুর। এক সময় মহামারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুত্থানের প্রতীক হিসেবে যে দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল, এখন সেই অঞ্চলের অগ্রযাত্রা থমকে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। কারণ আবারও সুরক্ষাবাদ। বিশ্বব্যাংক অনুমান করছে, ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬.৪% থেকে নেমে ৫.৮%-এ দাঁড়াবে, যার প্রধান কারণ মার্কিন শুল্কবৃদ্ধি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে ওয়াশিংটনের নবজাগরিত বাণিজ্য জাতীয়তাবাদ। এই সংখ্যাগুলো শুধু অর্থনৈতিক টানাপড়েনের গল্প নয় এগুলো ক্ষমতা ও দুর্বলতার এমন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে ভূরাজনীতির আত্মকেন্দ্রিকতা বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোকেই নড়বড়ে করে তুলছে।

 

 

যে বৈশ্বিক অর্থনীতি একসময় দক্ষিণ এশিয়ার সস্তা শ্রম ও দ্রুত উৎপাদনের ওপর ভর করে চলত, এখন সেই ব্যবস্থাই তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ব্যাপক শুল্ক আরোপ করেছে ভারতের বেশির ভাগ পণ্যে ৫০%, বাংলাদেশের রপ্তানিতে ২০% এবং শ্রীলঙ্কার পণ্যে ২০% পর্যন্ত। যুক্তি হিসেবে বলা হচ্ছে, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ধারাবাহিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রাখার জন্য এসব দেশকে ‘শাস্তি’ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাসে দেখা গেছে, অর্থনৈতিক কূটনীতির এই ভোঁতা অস্ত্র প্রমাণ করেছে যাদের টার্গেট করা হয়, তাদের নয়, বরং নিরপরাধরাই এর সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত। 

 

 


দক্ষিণ এশিয়ার জন্য সময়টা অত্যন্ত কঠিন। মহামারী-পরবর্তী পুনরুদ্ধার ও ২০২২ সালের জ্বালানি সংকট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন এক বহিরাগত ধাক্কা এসে পড়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পোশাক খাত, ভারতের ওষুধ ও অটোমোবাইল শিল্প এবং শ্রীলঙ্কার তৈরি পোশাক রপ্তানি এখন এমন এক আঘাতের মুখে, যা কোনো প্রণোদনা দিয়েই সহজে সামাল দেওয়া কঠিন। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের শিল্প খাত মূলত আমদানি করা সুতা, যন্ত্রপাতি ও রঙের ওপর নির্ভরশীল। এসব উপকরণে বাড়তি শুল্ক মানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেবে।

 

 

লাখ লাখ নারীশ্রমিকের জন্য এর মানে হতে পারে কাজ হারানো, মজুরি হ্রাস, এমনকি কারখানা বন্ধ। এটি এক নির্মম বিদ্রুপ। বিশ্ব শুধু এবারই প্রথম সুরক্ষাবাদের ফাঁদে পড়েনি। ১৯৩০-এর দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্মুট-হাওলি ট্যারিফ অ্যাক্ট ২০,০০০ পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে তৎকালীন মহামন্দাকে আরও গভীরতর করেছিল। তখনকার যুক্তিও ছিল এ সময়ের মতো আমেরিকান চাকরি রক্ষা, অন্যায্য বাণিজ্যকারীদের শাস্তি। কিন্তু ফল হয়েছিল ভয়াবহ।  দুই বছরের মধ্যে বৈশি^ক বাণিজ্য প্রায় ৭০% কমে যায়, যার ফলে অর্থনৈতিক মন্দা আরও তীব্র হয় এবং বিশ্ব জুড়ে চরমপন্থা বেড়ে যায়।

 


আজকের অর্থনীতি অনেক জটিল হলেও ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে বাণিজ্যপ্রাচীর কখনোই স্থিতি আনে না, বরং প্রতিশোধ, বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তা ডেকে আনে। বর্তমান পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক কারণ এটি ঘটছে এমন এক অস্থির ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যেখানে ইউক্রেন যুদ্ধ, মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রতি আস্থাহীনতা একই সঙ্গে কাজ করছে।  দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে স্থিতিশীল অর্থনীতি হিসেবে ভারত এখনো এগিয়ে। বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার, শক্তিশালী ভোক্তা ব্যয় ও ডিজিটাল পরিবর্তনের কারণে দেশটি এখনো বিশ্বের দ্রুততম প্রবৃদ্ধিশীল বড় অর্থনীতি হিসেবে টিকে আছে।

 

তবুও, এর প্রান্তে ফাটল ধরছে। মার্কিন শুল্কনীতি ভারতীয় রপ্তানিতে বড় ধাক্কা দিয়েছে, পাশাপাশি রুশ তেল আমদানিতে ২৫% শুল্ক ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অটোমোবাইল, ইলেকট্রনিকস ও ফার্মাসিউটিক্যাল বিশ্বের সরবরাহ চেইনের তিনটি খাতই এখন বিঘ্নিত হচ্ছে। ফলে ২০২৬-২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৫% থেকে কমে ৬.৩%-এ নেমে গেছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে রেমিট্যান্স এবং রপ্তানিমুখী শিল্পায়নের ওপর দাঁড়িয়ে।

 

কিন্তু এখন সেখানে চাপ পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিতে শুল্কবৃদ্ধি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাজারকে হুমকির মুখে ফেলেছে। তাই এখন দরকার উচ্চমূল্য সংযোজিত শিল্পে যেমন : ইলেকট্রনিকস, ওষুধ ও চামড়াজাত পণ্য ইত্যাদি এর দ্রুত বিকল্প বাজার সৃষ্টি করা। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, সরবরাহ চেইনের আধুনিকায়ন ও লজিস্টিক উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশ প্রতিযোগী বাজার হারাতে পারে। বাড়তি আমদানি ব্যয় বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াবে এবং টাকার মান দুর্বল করবে, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে। অন্যদিকে ২০২২ সালের অর্থনৈতিক ধস থেকে সামলে উঠতে না উঠতেই শ্রীলঙ্কা আবারও নতুন চাপে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় তাদের রাজস্ব ভারসাম্যকে বিপন্ন করছে। আইএমএফের সহায়তা ও পর্যটন পুনরুদ্ধারের ওপর নির্ভরশীল এই অর্থনীতি সহজেই নড়বড়ে হয়ে পড়তে পারে।

 

 


যে দেশ এখনো ঘাটতি ও প্রতিবাদের ভুতুড়ে স্মৃতিতে তাড়িত, তাদের জন্য হাজার মাইল দূরে আরোপিত শুল্ক যেন এমন এক ভূমিকম্পের পরাঘাত যার সূত্রপাত তারা কখনো ঘটায়নি। ভুটান, নেপাল ও মালদ্বীপের জন্য বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট আরও উদ্বেগজনক। রেমিট্যান্স হ্রাস, জলবায়ুজনিত জলবিদ্যুৎ বিঘœতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি সব মিলিয়ে এসব অর্থনীতি আগেই নাজুক। মার্কিন শুল্ক সরাসরি আঘাত না করলেও এটি বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। এতে বোঝা যায়, আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বের ধাক্কা এক প্রান্তে লাগলেও তার প্রতিধ্বনি দূরতম প্রান্তেও পৌঁছে যায়। এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, নৈতিক সংকটও। যে দেশ মুক্তবাজার ও প্রতিযোগিতার নীতিতে দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই দেশই আজ নিজস্ব স্বার্থকে সর্বোচ্চে স্থান দিচ্ছে।

 

 

 

 আমেরিকার এই শুল্কনীতি হয়তো মধ্য-পশ্চিমে কয়েক হাজার চাকরি বাঁচাবে কিন্তু একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে লাখো শ্রমিকের জীবিকা কেড়ে নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তার সুরক্ষাবাদের ভূরাজনৈতিক মূল্য বিবেচনা করা। দ্রুত বর্ধনশীল অংশীদারদের দূরে ঠেলে দিয়ে, তারা কার্যত চীনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করছে। চীন ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিগুলোর জন্য শুল্ক-ছাড় ও নতুন ঋণসুবিধা দিচ্ছে। এটি যেমন কৌশলগত পদক্ষেপ, তেমনি বুদ্ধিদীপ্ত কূটনীতিও। যদি ওয়াশিংটন শুল্ককে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করতে থাকে, তবে ২০২৬ হয়তো শুধু প্রবৃদ্ধির মন্থরতার বছর হবে না, বরং সেই যুগের অবসান চিহ্নিত করবে যে যুগে উন্নয়নশীল দেশগুলো বুঝতে পারবে, বিশ্ববাজারও এখন শক্তির রাজনীতিতেই চালিত, ন্যায্যতায় নয়।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক