কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বিশ্বায়ন বাহাস

আব্দুল বায়েস [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ১৩ আগস্ট ২০২৫]

বিশ্বায়ন বাহাস

বিশ্বায়ন দরিদ্রদের জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ এ প্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি আজ সর্বত্র আলোচিত। যারা বিশ্বায়নকে অভিশাপ হিসেবে দেখে, তাদের যুক্তিগুলো মোটেও অগ্রাহ্য করার মতো নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কথা ধরা যাক। এর ফলে বাংলাদেশে নাকি ১০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়, যার অর্থ দাঁড়ায় প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য উৎপাদন কমে যায়। যার বাজারমূল্য ২৫০ কোটি ডলার বা জিডিপির ২-৩ শতাংশ। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, এমনকি ধনী বিশ্বের কেউ কেউ, বিশেষত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে, মনে হয় যে- বৈশ্বকরণের ফলে ধনী দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যেমন, অনুন্নত বিশ্বে সস্তা শ্রম দ্বারা তৈরি পণ্যের প্রবাহ তাদের আপেক্ষিক সুবিধাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ। যুক্তিতর্ক শেষে কথা একটাই, আর তা হচ্ছে বৈশ্বকরণ ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে গ্রাস করছে গরিবকে; সুতরাং বিশ্বায়ন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর বিপরীতে বিশ্বায়নের সমর্থকদের যুক্তি হচ্ছে, দেশগুলোর মধ্যকার ক্রমবর্ধমান যোগাযোগের কারণে, বিশেষত চীন ও ভিয়েতনামে, দারিদ্র্য ব্যাপক হারে হ্রাস পেয়েছে। ইউরোপের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ট্রেনে উঠে আয় বৃদ্ধিতে সামর্থ্য অর্জন করেছে এবং আফ্রিকা মহাদেশের কিছু দেশের জন্যও তা আশার আলো দেখাতে শুরু করেছে।

 

 


দুই. তবে এ কথা  সত্য যে, যদিও বিশ্ববাজারের বিস্তৃতি উন্নয়নশীল দেশের জন্যে ভালো করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু যে সমস্ত নিয়মকানুন বা বিধিনিষেধ পেরিয়ে উন্নত দেশের বাজারে প্রবেশ করতে হয় তাতে সে উদ্দেশ্য সফলতা পায় না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে সুন্দর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন  বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ডি রডরিক : বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার চাহিদা, বিশ্বব্যাংকের কঠোর নিয়মানুবর্তিতামূলক নির্দেশ, আইএমএফ-এর শর্ত, এবং অর্থবাজারের আস্থা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা এসব বহুমুখী বেড়াজালে পড়ে উন্নয়নশীল দেশগুলো দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাদের নিজস্ব পথ ও পাথেয় প্রণয়ন করার অবকাশ থেকে ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে বৈশ্বীকরণের বিরুদ্ধে যুক্তিগুলো দরিদ্র দেশের সমস্যা সমাধানে অসমর্থ এবং অনেক ক্ষেত্রে দাতা দেশগুলোর ভুল উপদেশের ওপর গ্রোথিত। এর ফলে কেন্দ্রে থাকা (সেন্টার) ও কেন্দ্র থেকে দূরে থাকা (পেরিফারি) দেশগুলোর মধ্যকার ব্যবধান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

 


তিন. তবে, আমরা মনে করি উন্নয়নশীল দেশের দারিদ্র্যের ওপর বিশ্বায়নের প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বেশ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। কারণ, বিশ্বায়ন যেমন বহুবিধ, দরিদ্র মানুষও তেমনি কোনো সমজাতীয় গোষ্ঠী নয়। লিঙ্গ, অঞ্চল, পেশা, জমির মালিকানা, বাসস্থান, শিক্ষা, অবকাঠামোগত সুযোগ এবং এমনকি পরিধানেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে তীক্ষè বিভাজন লক্ষ করা যায়। সুতরাং এটা ভাবাই স্বাভাবিক যে, বিশ্বায়ন বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর বিভিন্ন উপায়ে এবং বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাব ফেলবে। আবার, বিশ্বায়নের কোনো একটা উপাদান উপকারী হলেও অন্য একটা উপাদান  অপকারী হতে পারে। দ্বিতীয়ত, বিশ্বায়ন একমাত্রিক কোনো ধারণা নয়। বিভিন্ন উপাদান নিয়ে বৈশ্বীকরণ প্রবাহিত যেমন বাণিজ্য, অর্থ, সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিগত সেবা ইত্যাদি। আরও মনে রাখা দরকার যে, এমনকি অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশ্বায়নের বহু মাত্রা রয়েছে বাণিজ্য, দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ, স্বল্পকালীন পোর্টফোলিও বিনিয়োগ প্রবাহ ইত্যাদি। আবার এর সঙ্গে আছে আইনি-বেআইনি অভিবাসন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর।

 

 

এগুলো সাংস্কৃতিক বা যোগাযোগজনিত বিশ্বায়ন থেকে আলাদা প্রভাব নিয়ে হাজির হয়, যদিও সাংস্কৃতিক বিশ্বায়ন অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন দ্বারা প্রভাবিত এবং যোগাযোগজনিত বিশ্বায়ন অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে গভীরতর করে। সবশেষে, এ যাবৎকালের দেশভিত্তিক রিগ্রেশন থেকে সাধারণভাবে যে     মন্তব্যগুলো এসেছে তা নিতান্তই বিশ্বায়ন ও দারিদ্র্যের মধ্যকার অনুবন্ধ, কার্যকর সমৃদ্ধ বা অনুঘটক নয়। বিশ্বায়নবাদীরা মনে করেন, সাম্প্রতিককালের ব্যাপক অর্থনৈতিক অখ-তার ফলে চীন ও ভারতে দারিদ্র্যের মাত্রা বেশ কমেছে। কিন্তু এর পেছনে যে অভ্যন্তরীণ উপাদান যেমন অবকাঠামোর বিস্তৃতি অথবা ১৯৭৮ সালের বড়মাপের ভূমিসংস্কার, পল্লী থেকে নগরে অভিবাসনের ওপর বিধিনিষেধ শিথিলকরণ, সবুজ বিপ্লব, সামাজিক আন্দোলন কিংবা দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি (বিশেষত ভারতে) বড় ভূমিকা রাখেনি সেটা জোর দিয়ে বলা যাবে না।

 

অন্যদিকে, বিশ্বায়নবিরোধীদের বক্তব্য হচ্ছে, একই শতাব্দীতে সাব-সাহারা আফ্রিকায় কোনো উন্নতি ঘটেনি বরং দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এমনও হতে পারে যে, এর পেছনে বিশ্বায়নের কোনো প্রভাব নেই কিন্তু  প্রভাব আছে যুদ্ধবিগ্রহ, অস্থিতিশীলতা অথবা ব্যর্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার। যেসব কারণে বিশ্বায়নের প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। এটা সত্য যে, সব ক্ষেত্রেই উদীয়মান বৈষম্য, ক্ষমতায়নের পরিবর্তন এবং সংস্কৃতি সংকট অবিশ্বাস সৃষ্টি করে চলেছে। তবে এর সঙ্গে ঠিক কোন অংশটি দরিদ্রের বাঁচার বিরুদ্ধে কাজ করছে, তা শনাক্ত করা কঠিন কাজ। বৈশ্বীকরণ ও দারিদ্র্য উভয় যদি বহুমাত্রিক হয়, তা হলে তাদের মধ্যকার সংযোগটিও বহুমাত্রিক থেকে যাচ্ছে। যেমন, মানব সূচকের মাত্রায় একটা দেশের উন্নতি হতে পারে, কিন্তু ক্ষুধা ও অপুষ্টির মাত্রায় সে দেশটির অবনতি হতে পারে। সুতরাং, বিশ্বায়নের মূল্যায়ন একদিকে আলো থেকে অন্ধকারে পতিত হওয়ার কথা বলে আবার একইসঙ্গে, অন্ধকার থেকে আলোতে উত্তরণের গল্পও শোনায়। অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাজ্যের মাথাপিছু আয় স্থির মূল্যে দ্বিগুণ হয় ৫৭ বছরে অথচ চীনে দ্বিগুণ হয় ১০০ বছর বা তার কম সময়ে, এমনকি এই বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হয়েছে ৪০ বছরের কম সময়ে। চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতা বলে দিচ্ছে যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্বায়নের ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর।

 

 

চার. গণতন্ত্র ও সুশাসন যে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে এবং দারিদ্র্য কমাতে সাহায্য করে, সেটা স্বীকার করে নিলেও বিশ্বায়ন এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মান-এর মধ্যকার যোগসূত্রতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাচ্ছে। বিশ্বায়নের ভক্তদের মত এই যে, অবাধ বাণিজ্য ও পুঁজিপ্রবাহ প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা অর্জনে সহায়তা দিয়েছে। যার ফলে মধ্যআয়ের শ্রেণি লাভবান হওয়ার এবং তার সঙ্গে রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র ও সুশাসনের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বায়নবিরোধীদের বক্তব্য হচ্ছে, বিশ্বায়ন দারিদ্র্যের প্রকোপ এবং আয়-বৈষম্য বাড়ায়, সংকট সৃষ্টি করে এবং সমাজের একটা অংশের হাতে ক্ষমতা পুঞ্জীভূত করে অন্যকে দুর্বল করার ক্ষেত্র তৈরি করে। এর ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা হুমকির মুখে পড়ে। প্রায়োগিক পর্যবেক্ষণ দেখায় যে, বিশ্বায়নের ফলে বর্ধিষ্ণু তথ্যপ্রবাহ ও যোগাযোগের কারণে বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র উৎসাহিত হয়। পর্যায়ক্রমে প্রত্যাশা এই, গণতন্ত্রায়নের দিকে যাওয়ার প্রবণতা দুর্নীতি ও সহচারিতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, নাগরিক সমাজের ভূমিকা বৃদ্ধি পাবে এবং আইনের শাসনের ওপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টি করবে। এ সবই দরিদ্রের জন্য উপযোগী কারণ তারাই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ। তাছাড়া, অপেক্ষাকৃত মুক্ত সংবাদ প্রবাহ থাকা স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে তেমন বিপর্যয়কর দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়নি।

 

 

প্রত্যেক সমাজেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটতে থাকলে একটা মিড্ল ক্লাস জন্ম নেয় যারা থেমে থেমে রাজনীতিতে গণতন্ত্রায়নের কার্যকর চাহিদা সৃষ্টি করে। এই নতুন বুর্জোয়া গোষ্ঠী একটু মোটা মানিব্যাগ পকেটে নিয়ে শুধুমাত্র পণ্যের বাজারে নয়, রাজনীতির বাজারেও প্রভাব ফেলতে চায়। ভ্রমণ, ভিডিও, রেডিও ও টেলিকমিউনিকেশনের মাধ্যমে আজকাল এই শ্রেণি বিশ্বের অন্যান্য সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। আর গণতন্ত্রের উপস্থিতিতে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা কম থাকে। যাই হোক, বিশ্বায়নের বিপক্ষে একটা জোরালো যুক্তি এই যে, বিশ্বায়ন প্রথাগত মূল্যবোধকে খাটো করে দেয়। অভিযোগ আছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নগরায়ণ সৃষ্টি করে এবং গ্রামীণ সমাজকে অবজ্ঞা করে।

 

 এক্ষেত্রে বিশ্বায়নের গতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অপেক্ষাকৃত ধীরে ধীরে বিশ্বায়ন হওয়া মানে, প্রথাগত প্রতিষ্ঠান ও মূল্যবোধ খাপ খাওয়ানোর সুযোগ পায়। বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক প্রভাবের কথা সবার জানা। ম্যাকডোনাল্ড বা কেনটাকি ফ্রাইড চিকেনের মতো চটজলদি খানার দোকানগুলো উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করেছে। ছেলেমেয়ে হেডফোনে যে গান শুনতে শুনতে যায়, তার বেশ কিছু পশ্চিমা গান। টিভি চ্যানেলগুলোর বড় একটা অংশ বিদেশি সংস্কৃতির বাহক। এতে অবশ্য সবচেয়ে বেশি বিরূপ প্রভাব পড়েছে আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর। তবে দুই পরস্পরবিরোধী সংস্কৃতির মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টার কমতি নেই। যাই হোক, সাংস্কৃতিক বিশ্বায়নের কারণে মানুষ অনেকটা নিজ গৃহে পরবাসী ঘর নিজের, কিন্তু মন হয় না নিজের।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়