কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

ড. মো. মোরশেদুল আলম [সূত্র : জনকণ্ঠ, ১৫ আগস্ট ২০২৫]

বিশ্ব রাজনীতিতে তুরস্কের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব

অটোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকেই তুরস্কের জনসাধারণের রাজনৈতিক অবস্থান বিষয়ে পশ্চিমাদের মনে নানা তর্ক-বিতর্ক চলে আসছিল। অটোমান সাম্রাজ্য সুসংহত হওয়াটা পশ্চিমাদের জন্য ভীতির কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তিতে পশ্চিমাদের মধ্যে তুরস্ক সম্পর্কে এমন মনোভাব আরও চরম আকার ধারণ করে। বলকান, ককেশাস, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত তুরস্ক। দেশটির প্রায় পুরো অংশই এশিয়ায় অবস্থিত, যার মধ্যে এশিয়া মাইনরের আয়তকার উপদ্বীপ রয়েছে; যাকে আনাতোলিয়া বলা হয়। বার্কি অংশ হচ্ছে তুর্কি থ্রেস, ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে অবস্থিত; যা এক সময় বলকান অঞ্চলের বেশির ভাগ অংশজুড়ে বিস্তৃত একটি সাম্রাজ্যের ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশ। তুরস্কের উত্তরে কৃষ্ণ সাগর, উত্তর-পূর্বে জর্জিয়া এবং আর্মেনিয়া, পূর্বে আজারবাইজান এবং ইরান, দক্ষিণ-পূর্বে ইরাক ও সিরিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর ও এজিয়ান সাগর এবং উত্তর পশ্চিমে গ্রিস ও বুলগেরিয়া অবস্থিত। মোট সীমানা দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার মাইল; যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সামুদ্রিক অঞ্চল। এর মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণ সাগর, এজিয়ান এবং ভূমধ্যসাগর বরাবর উপকূলরেখা; একইসঙ্গে কৃষ্ণ ও এজিয়ান সাগরকে সংযুক্তকারী সংকীর্ণ রেখা। এগুলো হচ্ছে বসফরাস, মারমারা সাগর এবং দারদানেলিস প্রণালী; সম্মিলিতভাবে এটি ‘তুর্কি প্রণালি’ হিসেবে পরিচিত। এটি কৃষ্ণ সাগর থেকে একমাত্র নির্গমন পথ। এই প্রণালির ওপর তুরস্কের নিয়ন্ত্রণ অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের একটি অন্যতম প্রধান কারণ।

 

 


আরব বসন্তের সময় তথা ২০১০ সাল থেকে একটি ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে আসছে তুরস্ক। নতুন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর নিকটও তুরস্কের গুরুত্ব ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তুরস্কের গুরুত্ব পশ্চিমাদের নিকট এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, ইরানে ইসরাইলের সম্ভাব্য হামলার আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র যে কযেকটি মিত্র রাষ্ট্রকে সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে আগাম তথ্য প্রদান করেছিল, তুরস্ক ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। তবে তুরস্ক এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, ইরানে ইসরাইলের আক্রমণ ছিল অপ্রয়োজনীয়। তুরস্ক বলেছে, ইসরাইলের এই হামলা মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বিভাজন ডেকে আনছে এবং বিস্তৃত পরিসরে যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সমালোচনা করে তুরস্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র যে হামলা চালিয়েছে, তার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে উদ্বিগ্ন তুরস্ক। চলমান পরিস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতকে বৈশি^ক স্তরে নিয়ে যেতে পারে। এ রকম বিপর্যয়কর দৃশ্যপট বাস্তবে পরিণত হোক তুরস্ক সেটি চায় না বলেও জানানো হয়। ইরানে চলা ইসরাইলি হামলাকে এরদোয়ান দস্যুতা বলে অভিহিত করেছিলেন। তবে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে আসছিল। তবে সব সময়ই সমস্যাটির কূটনৈতিক সমাধানের বিষয়ে বলে আসছিল। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুরাত ইয়েশিলতাশ বলেছেন, ইরানের কথিত পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টা, যাকে দেশটির নেতারা আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে যুক্তি দেখাচ্ছেন, তুরস্কের দৃষ্টিতে সেটি একটি বিপজ্জনক জুয়াসদৃশ। এটি মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিস্তার ঘটাতে পারে। ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতি তুরস্কের বিরোধিতা মানেই এই নয় যে, তারা ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাক্সক্ষাকে সমর্থন করছে। তবে তুরস্ক যে শুধু ইসরাইলের বর্তমান সমারিক সক্ষমতার কারণেই উদ্বিগ্ন তা নয়। বরং পারমাণবিক ইস্যু বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা চলাকালীন ইসরাইল এ হামলা চালানোর পরও ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর এত সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি তুরস্ককে আশাহত করেছে। 

 


বর্তমান সময়ে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা গোষ্ঠী বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের জটিল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন সৈন্যদের ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় তুরস্ক তাদের ভূমি ব্যবহার করতে দেয়নি। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কে এক ধরনের বৈরিতা তৈরি হয়। তুরস্ক ইসরাইলের সঙ্গে ২০১১ সালে সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও তুরস্ক জোট ভেঙে দেয়। আবার একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে গিয়ে সিরিয়া বিষয়ে তুরস্ক স্বতন্ত্র নীতি গ্রহণ করে। সিরিয়া প্রশ্নে তুরস্কের অবস্থান পশ্চিমাদের সঙ্গে বিরোধের কারণ হয়েছে। কারণ সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়া ও ইরানের পথ অনুসরণ করেছিল তুরস্ক। ২০১৬ সালে তুরস্কে যে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা হয়েছিল তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয়প্রাপ্ত তুরস্কের নেতা ফেতুল্লাহ গুলেনকে দায়ী করা হয়। তুরস্কের হাতে তাঁকে তুলে দেওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হলেও সাড়া না দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার পর বেশ উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই স্বাগত জানিয়েছিলেন এরদোয়ান। ট্রাম্পও এরদোয়ানকে বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে সিরিয়ার বাশাার আল-আসাদ সরকারের পতনে তুরস্কের ভূমিকার জন্য প্রশংসা করেছেন। তুরস্ক একদিকে যেমন রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, আবার অন্যদিকে ইউক্রেনকেও সামরিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে পশ্চিমা মিত্রদের স্বার্থরক্ষায়ও সহযোগিতা করছে।

 

 

এরদোয়ান হামাস ও ফিলিস্তিনদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে নেতানিয়াহুকে গণহত্যাকারী আখ্যা দিয়ে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। মুসলিম প্রধান দেশগুলোকে একত্রিত হয়ে গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এরদোয়ান। ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার আগ্রহও দেখিয়েছে তুরস্ক। চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিস্থিতি শান্ত করতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে তুরস্ক। আল জাজিরা জানিয়েছে, আগামী ৭ অক্টোবরের মধ্যে গাজা শহর থেকে সব ফিলিস্তিনিকে কেন্দ্রীয় শিবির ও অন্যান্য এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

এরপর শহরে থাকা হামাস যোদ্ধাদের অবরুদ্ধ করে স্থল অভিযান চালানো হবে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা দখলের ইসরাইলের সিদ্ধান্ত ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে এরদোয়ান মন্তব্য করেছেন। একইসঙ্গে তুরস্ক সব সময় ফিলিস্তিনের পাশে রয়েছে বলেও তিনি জানান। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা এরদোয়ান স্বাগত জানিয়েছেন। পশ্চিমা বিশ্বে ইসরাইলবিরোধী সমালোচনা বেড়েই চলেছে এবং এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তুরস্ক চালিয়ে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। গাজায় আশা জাগাতে আমরা আমাদের দেশের সমস্ত সম্পদ এবং কূটনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছি বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, আমরা নেতানিয়াহু এবং তার খুনি নেটওয়ার্ককে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার জন্য আমাদের অঞ্চলকে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে টেনে আনতে দেব না।

 

 


সম্প্রতি ইস্তান্বুলে অনুষ্ঠিত ওআইসির বৈঠকে ইরানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। একইসঙ্গে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রশাসনকে আঞ্চলিক শক্তির সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। হাজার বছরের সংহতি ও সহনশীলতার শক্তিতে ইরান কঠিন সময় অতিক্রম করতে সক্ষম হবেন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এবারের ওআইসি সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে চলমান সংঘাতের বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিক্রিয়া গড়ে তোলা। চলমান ইরান-ইসরাইল সংঘাতের প্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত ওআইসির ৫১তম পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের অধিবেশনে সদস্য দেশগুলো ইসরাইলের হামলা মোকাবিলা এবং বিস্তৃত আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওআইসি সম্মেলন শুরুর পূর্বে এরদোয়ান বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন পরমাণু আলোচনা শুরুর ঠিক আগে ইরানের ওপর ইসরাইলের হামলা ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ইরাক বা লেবাননের ওপর হামলার তুলনায় ইরানের ওপর হামলার ঘটনায় ভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া হয় তুরস্কে। ইসরাইল ইরানে হামলা চালিয়ে প্রমাণ করেছে যে, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে।

 

 

আর সেটি হচ্ছে বৃহত্তর ইসরাইল গঠন এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার। তাই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে তুরস্ক। ইরানের ওপর ইসরাইলের আক্রমণটি নিছক কোনো আক্রমণ নয়, এটি ইহুদি রাষ্ট্রটির সামরিক শক্তি প্রদর্শনও বটে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত হলেও ইরান তুর্কিদের নিকট একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র। ইরানিদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা আধিপত্যের প্রতিরোধ এবং নিজেদের ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর আস্থার প্রতি সম্মান করে তুরস্কের নাগরিকরা। তুরস্কের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার প্রদান এবং এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের বিষয়ে এরদোয়ান বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার যুদ্ধ নিয়ে এরদোয়ানের প্রতিক্রিয়া ছিল সংযত ও গঠনমূলক। ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি একটি আলাদা যোগাযোগ চ্যানেল তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে ইস্তান্বুুলে একটি মার্কিন-ইরান বৈঠকের প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। যুদ্ধকালীন এরদোয়ানের করা মন্তব্যগুলোও আগের মতো তেমন আক্রমণাত্মক ছিল না। 

 

 


সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তুরস্কের সঙ্গে পশ্চিমাদের বিরোধ চরমে ওঠে। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে পাইপলাইনে তুরস্কে গ্যাস ও তেল সরবরাহ, তুরস্কের নিকট রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অস্ত্র বিক্রির বিষয়, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে রাশিয়ার সহযোগিতা, দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কই একমাত্র রাষ্ট্র, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়াকে কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেনি। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে তুরস্ক রাশিয়ার জ্বালানি চীন ও ইরানে পরিবহনের ব্যবস্থা করেছে। তুরস্ক সম্প্রতি চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্বাধীন ব্রিকসে যোগ দেয়ার আবেদন করেও ব্যর্থ হয়েছে। ফিনল্যান্ডের ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার পেছনে তুরস্কের মূল ভূমিকা ছিল।

 

 

সুইডেনের ন্যাটোতে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রথম দিকে আপত্তি থাকলেও পরবর্তী সময়ে সম্মতি দিয়েছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের পদস্যপদ পাওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। পশ্চিমাদের সঙ্গে তুরস্কের উত্তেজনা চলমান থাকার এটি একটি অন্যতম কারণ। তবে সময়ের পরিক্রমায় এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রয়োজনে ইসরাইলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তুলেছে তুরস্ক। এরই অংশ হিসেবে ২০২২ সালে তুরস্ক সফর করেছিলেন ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট। দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা ছিল এটি। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এমন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছিল। তবে ন্যাটোর সদস্য গ্রীসের সঙ্গে তুরস্কের বিভিন্ন সময়ের উত্তেজনা পশ্চিমাদের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। ইসরাইল সম্প্রতি সিরিয়ায় বিমান হামলা চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইসরাইলের হামলার কারণে সিরিয়ায় নতুন করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তাতে তুরস্ক একটি নাজুক পরিস্থিতিতে পতিত হয়েছে। তুর্কি নিরাপত্তা বিশ্লেষক এরসান এরগুর বলেছেন, সিরিয়ার আঞ্চলিক অখন্ডতা রক্ষা করা এখন তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ভিত্তিস্বরূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিরিয়ার আঞ্চলিক বিভাজন থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শরণার্থীর ঢল নামতে পারে তুরস্কে। 

 

 


সিরিয়ায় ইসরাইলি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন এরদোগান। তিনি অভিযোগ করেন, তেল আবিবের বিরুদ্ধে দ্রুজ সংকটকে কাজে লাগিয়ে সিরিয়ায় হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা প্রদান এবং সিরিয়ার আঞ্চলিক অখ-তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার সঙ্গে গভীর সংযোগের কারণে তুরস্ক সিরিয়াকে স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে হায়। এটি যে শুধু তুরস্কের সীমান্ত রক্ষা করার জন্য নয়, বরং আশপাশের ব্যর্থ রাষ্ট্রগুলোর উত্থান রোধ করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। সিরিয়াকে ভাঙতে দেয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে এরদোয়ান বলেন, ইসরাইল একটি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। সিরিয়ার দ্রুজ জনগোষ্ঠীকে অজুহাত বানিয়ে দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলে রক্তপিপাসু ইসরাইল হামলা চালাচ্ছে। ইসরাইল আইনের তোয়াক্কা না করা, সীমাহীন উদ্ধত, নিয়ম ভঙ্গকারী, নীতিহীন, অহংকারী, লুণ্ঠনকারী, রক্তপিপাসু সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলে তিনি অভিহিত করেন। সিরিয়ার ভৌগোলিক অখন্তাড, জাতীয় ঐক্য, একক রাষ্ট্র কাঠামো এবং বহুসাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা করাই তুরস্কের মূলনীতি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমরা সম্মানজনক পররাষ্ট্রনীতি, শান্তিপূর্ণ উদ্যোগ ও কূটনৈতিক প্রয়াসের মাধ্যমে সবসময়ই শান্তির পক্ষে রয়েছি। ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সম্প্রসারণের জন্য তুরস্ককে একটি ঐতিহাসিক ও কৌশলগত প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচনা করে। গাজা ছিল ইসরাইলের কেবল শুরু। এরপর লেবানন, ইয়েমেন ও সিরিয়া।

 

 

তবে ইসরাইলের চূড়ান্ত লক্ষ্য তুরস্ক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এরদোয়ান দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কৌশলী ভারসাম্য বজায় রেখে পশ্চিমা বিশ্ব, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে আসছেন। তাঁর গৃহীত কৌশলী নীতির কারণে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে দুই পক্ষই একদিকে তুরস্কের সহযোগিতা পেয়েছে, আবার তেমনি মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি এবং প্রভাব বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়েছে। ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার চলমান সংঘাতের জেরে সম্ভাব্য যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তুরস্ক প্রস্তুতি নিয়েছিল। তুরস্ক নিজস্ব উৎপাদিত রাডার ও অস্ত্র ব্যবস্থা ব্যবহার করে সমন্বিত আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ কিন্তু চালিয়ে যাচ্ছ। যুক্তরাষ্ট্রের পর ন্যাটোতে দ্বিতীয় বৃহত্তর সামরিক বাহিনীর অধিকারী কিন্তু তুরস্ক। ন্যাটোর দক্ষিণ দিক বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকা, কৃষ্ণসাগর এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখছে। তবে তুরস্কের রাজনীতি যে সবসময় ন্যাটো ও ইইউর অংশীদারদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তা কিন্তু নয়। ন্যাটো ও ইইউ তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করা, অর্থনীতির স্বার্থ জোরদার করা এবং ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার প্রদান করলেও তুরস্ক কিন্তু আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর বেশি জোর দিয়ে থাকে।

 

এতে করে তুরস্ক তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর জন্য নিজস্ব পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি অনুসরণ করে আসছে। রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে তুরস্ক, একইসঙ্গে ন্যাটো ও ইইউ অংশীদারদের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলার নীতি মেনে চলছে। সিরিয়া, লিবিয়া, ককেশাস, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও উপসাগরীয় এলাকায় তুরস্কের শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসঙ্গে আফ্রিকা, মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম বলকানে তুরস্ক নিজেদের ‘সফট পাওয়ার’ বিস্তার করতে পেরেছে। আবার একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও তুরস্ক গড়ে তুলেছে। ভূকৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ন্যাটোতে প্রাচ্য ও পশ্চিমের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করছে তুরস্ক। দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতি, প্রাচুর্যময় প্রাকৃতিক সম্পদ, ভূকৌশলগত অবস্থানের অনন্যতা প্রভৃতি কারণে তুরস্ক একইসঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র রাশিয়া ও চীনের নিকটও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

 

 


লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়