কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস আজ

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও তথ্য ঘাটতির কারণে নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি বিবিএস নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ: বণিক বার্তা, ২০ অক্টোবর ২০২৫

বিশ্ব পরিসংখ্যান দিবস আজ

জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা হিসেবে দেশের নানা খাতের নানা বিষয়ভিত্তিক পরিসংখ্যান তৈরি করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। কৃষি, গৃহস্থালি, শ্রম, জনসংখ্যা, মূল্যস্ফীতি, জিডিপি, ট্যুরিজম, ব্যবসা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিবেশ, জলবায়ু, পরিচ্ছন্নতা, তামাক, অভিবাসন, আবাসন, দুর্যোগসহ নানা খাতের হালনাগাদ তথ্য ও জরিপ করে সংস্থাটি। যদিও তাদের তথ্য নিয়ে বরাবরই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বিবিএসের তথ্যের বড় ধরনের অমিল দেখা যায়। ফলে সরকারি হিসাব-নিকাশ থেকে শুরু করে জিডিপি ও দারিদ্র্য সূচকের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, তথ্য সংগ্রহে ঘাটতি ও মূল্যায়ন কাঠামোর দুর্বলতায় প্রতিষ্ঠানটি আস্থা হারিয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা ছিল অতীতের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে উদ্যোগ নেবে বিবিএস। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সে রকম কিছু হয়নি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিসংখ্যান তৈরির আগের কাঠামো বহাল থাকার পাশাপাশি অতীতের অতিরঞ্জিত সব পরিসংখ্যান সংশোধনে সার্বিক উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। এ দুটো কারণেই সংস্থাটি এখনো আগের অতিরঞ্জিত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান থেকে বের হতে পারছে না। বিবিএসের তথ্যে সন্দেহের কথা স্বীকার করেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদও। চলতি বছরের শুরুতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক সভায় বিবিএসের জরিপ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘এখন পর্যন্ত যেহেতু আগের নিয়ম বলবৎ আছে, কাজেই চোখ বন্ধ করে প্রকাশ করে দিতে হয় আমাকে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন খাতে পরিচালিত বিবিএসের তথ্য-উপাত্তের ওপর নির্ভর করে সরকার ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিকৌশল নির্ধারিত হয়। ফলে এসব তথ্য-উপাত্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও আস্থার সংকট থাকলে এগুলোর ওপর ভিত্তি করে নেয়া নীতিকৌশলও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ত্রুটিপূর্ণ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নেয়া নীতিকৌশলের কার্যকারিতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জিডিপি বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। কমিয়ে দেখানো হয়েছে মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, জনসংখ্যার হার। তবে গত বছরের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অতিরঞ্জিত অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান, বিভিন্ন খাতের সঠিক তথ্য-উপাত্তের প্রত্যাশা ছিল সবার। সে লক্ষ্যে বিবিএসকে শক্তিশালী করতে একটি টাস্কফোর্স কমিটিও গঠন করা হয়। বিবিএসের নাম পরিবর্তন, স্বাধীন বিবিএস গঠন, আইন সংশোধন, দক্ষ জনশক্তি নিয়োগসহ বিভিন্ন সুপারিশ করেছে টাস্কফোর্স। পরিসংখ্যানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সাত সদস্যের একটি কাউন্সিল গঠনেরও প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এসব সুপারিশ এখনো খসড়া পর্যায়ে রয়েছে।

 

 

 

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দূর হলেও দক্ষ জনবলের অভাবে বিবিএস আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারছে না বলে মনে করেন বিবিএস টাস্কফোর্সের সদস্য ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উৎপাদন প্রবৃদ্ধি, জিপিডির ভুল তথ্য দিয়ে দেশের উন্নয়নের পরিকল্পনা করলে সেখানে একটি ভ্রান্ত পরিস্থিতি তৈরি হবে। বিবিএসকে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সে পদক্ষেপ নিতেই টাস্কফোর্স করা হয়েছিল। হস্তক্ষেপ ছাড়াও বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করার বিষয় রয়েছে। সেখানে হিউম্যান রিসোর্স স্কিল, নতুন নিয়োগ, প্রমোশনের বিষয়গুলো থাকে। জরিপ করার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য যে অপেক্ষা সেটা দূর করতে হবে। বিবিএস মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে সেটার ওপর মন্ত্রণালয়ের প্রভাব থাকবে। সেখানে টাস্কফোর্স স্বাধীন বিবিএসের কথা বলেছে। এছাড়া একটা কাউন্সিল থাকবে যেটি সবকিছুতে তদারক করবে।’

 

 

 

তিনি আরো বলেন, ‘‌তথ্যের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি পূরণ করতে হলে বিবিএসের কর্মরতদের দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে। আমাদের সুপারিশে সে বিষয়ে বলেছি। এখন আগের চেয়ে অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু আরো আধুনিক হতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’

 

 

সম্প্রতি দেশের জনসংখ্যার পরিসংখ্যান নিয়ে বিবিএসের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জনসংখ্যা পরিসংখ্যানে। নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা অনুযায়ী দেশে মোট জনসংখ্যা ১৯ কোটি। যেখানে বিবিএসের স্যাম্পল ভাইটাল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসভিআরএস) ২০২৩-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার। ফলে প্রশ্ন ওঠে বিবিএসের পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে।

 

 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জাতীয় পরিসংখ্যান সক্ষমতা নিয়ে কাজ করে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর অফিশিয়াল স্ট্যাটিস্টিকস (আইএওএস) ও বিশ্বব্যাংক। ২০২৪ সালে আইএওএসের ‘কান্ট্রি স্ট্যাটিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি: আ রিসেন্ট অ্যাসেসমেন্ট টুল অ্যান্ড ফিউচার রিফ্লেকশন অন দ্য ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পরিসংখ্যান সক্ষমতায় বাংলাদেশের স্কোর ৭০ দশমিক ৮। যেখানে সর্বোচ্চ স্কোর লুক্সেমবার্গের ৯১ দশমিক ৫। এছাড়া মালয়েশিয়ার স্কোর ৮০ দশমিক ৪, শ্রীলংকার ৮০ দশমিক ২ এবং ভারতের ৭৩ দশমিক ৬। এছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের স্কোর ৬৮ দশমিক ৬ এবং মালদ্বীপের ৬৫ দশমিক ৩।

 

 

এছাড়া বিশ্বব্যাংকের ‘মেথাডোলজি অ্যাসেসমেন্ট অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি স্কেল’ শীর্ষক জরিপে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পরিসংখ্যানগত সক্ষমতার পদ্ধতিগত মূল্যায়নে বিশ্বব্যাপী গড়ের তুলনায় মাঝারি স্তরের সক্ষমতা রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয়। যেখানে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল ও ভুটানের তুলনায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। ১০০-এর মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ৩০। যেখানে শ্রীলংকা ৫০, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও ভুটানের স্কোর ৪০ এবং আফগানিস্তানের স্কোর ২০। এছাড়া সেনেগালের ৪০, মিসরের ৮০, মরক্কোর ৬০, নামিবিয়ার ৪০। শীর্ষে থাকা দেশের মধ্যে চীনের ১০০, জার্মানির ৯৮, যুক্তরাষ্ট্রের ৯৫ ও দক্ষিণ আফ্রিকার স্কোর ৯০।

 

 

 

দেশে প্রধান এ পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য নিয়ে ঘাটতির কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়ও। বিবিএসের তথ্যে মানুষের অসন্তুষ্টির কথা উঠে এসেছে তাদের নিজস্ব জরিপেই। ২০২৩ সালে বিবিএসের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর করা এক জরিপে দেখা যায়, বিবিএসের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে সন্তুষ্ট নয় ৬৫ শতাংশ তথ্য ব্যবহারকারী সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান। গত বছর সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস) ও বিবিএসের যৌথভাবে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, বিবিএসের সরকারি পরিসংখ্যানের মান নিয়ে মাত্র ২৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ ব্যবহারকারী সন্তুষ্ট।

 

 

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিবিএসের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান দাবি করেন, তথ্য প্রকাশে এখন আর ম্যানিপুলেশনের সুযোগ নেই। সম্প্রতি তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেকে বলে, আমরা ম্যানিপুলেটেড তথ্য প্রকাশ করছি। এটা ভুল ধারণা। আমরা নিজস্ব পদ্ধতি ব্যবহার করে জরিপ করে সেটি প্রকাশ করি। এখানে প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ নেই।’