বিশ্ব এখন বহুমেরুকেন্দ্রিকতার পথে
ড. ফরিদুল আলম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫]

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বরাজনীতিতে এক ধরনের এককেন্দ্রিকতা বিরাজ করছিল। সে সময় থেকে কয়েক বছর আগ পর্যন্ত বিশ্বব্যবস্থায় ‘হেজিমন’ বলতে যুক্তরাষ্ট্রকেই বোঝানো হতো, যার অর্থ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যবস্থায় তার নিজস্ব কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল। কয়েক বছর ধরেই রাজনৈতিকভাবে রাশিয়া এবং অর্থনৈতিকভাবে চীনের উত্থান—এই দুই দেশের সঙ্গে আরো কিছু মধ্যম সারির অ-ইউরোপীয় রাষ্ট্রের বিভিন্ন জোটবদ্ধতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছুটা প্রতিকূলতা সৃষ্টি করতে পারলেও ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের মৈত্রীর বন্ধন কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের প্রভববলয়ের জায়গায় খুব একটা সজোরে আঘাত করতে পারেনি। উপরন্তু চীনের মতো বড় দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে গেলেও তাদের অর্থনীতিতে এখনো মার্কিননির্ভরতা রয়েছে।
ফলে রাজনীতিতে তাদের নিজস্ব প্রভাবের জায়গাটি তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কারণে তাদের ‘এক চীন’ নীতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও রাজনৈতিকভাবে তারা তাদের দাবীকৃত এই অংশটিতে নিজেদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। এই সবকিছু ছাপিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি বিশ্বরাজনীতির সব হিসাব যেন পাল্টে দিচ্ছে। ফলে চীন ও রাশিয়ার মতো দেশ, সেই সঙ্গে ভারতের মতো এশিয়ায় চীনের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র এখন একই নিরাপত্তার ছাতার নিচে আসার পরিকল্পনা করছে।
সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নেতৃত্বের কিছু আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বিশ্বে নতুন এক মেরুকরণের সৃষ্টি করতে পারে। এককেন্দ্রিকতা, দ্বিকেন্দ্রিকতা বা ত্রিকেন্দ্রিকতা নয়, বিশ্ব এখন হাঁটছে বহুমেরুকেন্দ্রিকতার দিকে।
বিশ্ব এখন বহুমেরুকেন্দ্রিকতার পথেবলা চলে, এর আনুষ্ঠানিক শুরুটা হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত ধরেই এবং তা ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে, যদিও অনেক বছর ধরেই চীন অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং এই লক্ষ্যে তাদের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) যথেষ্ট সফল হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূর করতে তারা খুব একটা সফল হয়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু করা যদি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেনের দায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে এই যুদ্ধকে আজকের এই পর্যায়ে এসে রাশিয়ার পক্ষে ঠেলে দেওয়ার চূড়ান্ত দায় বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে হামাস, হুতি, হিজবুল্লাহসহ ইসলামী অন্যান্য গ্রুপকে নিষ্ক্রিয় করে ইসরায়েলকে আরো শক্তিশালী করে তোলা এবং এর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থানকে আরো দৃঢ় করতে যে কৌশল তারা অবলম্বন করছে, দিনশেষে তারা তাদের দীর্ঘদিনের মিত্রদের কাছ থেকেও এ নিয়ে সমর্থন পাচ্ছে না। অবশ্য এর পেছনে অন্যান্য কারণও রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের শুল্কনীতি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আসলে এক ধরনের পারস্পরিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমমেয়াদি বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের সৃষ্টি হয়। ইউরোপের সঙ্গে মার্কিন সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের আপাত অবসান ঘটতে চলছে বলে ধরে নেওয়া যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারস্পরিক নিরাপত্তার স্বার্থে যে সম্পর্কের সূচনা হয়, ন্যাটোর বহাল থাকা এবং এর বিস্তারের মাধ্যমে এটি আরো গভীরতর হয়। ন্যাটোকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে গিয়ে এবং ইউরোপের নিরাপত্তাস্বার্থকে আরো শক্তিশালী করতে গিয়ে ইউক্রেনকে ঘিরে যে যুদ্ধের সূচনা ঘটল, মার্কিন অর্থনীতি এখন আর তার ব্যয়ভার বহনে সক্ষম নয় এবং অনিশ্চিত এই যুদ্ধ আর চালিয়ে যাওয়ার কোনো যুক্তি দেখছে না। এই জায়গা থেকে সরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও কম পীড়াদায়ক নয়, তবে ইউরোপের আবদার রক্ষা করে চলাকে ট্রাম্প প্রশাসন অদূরদর্শী বিবেচনা করছে। আর তাই এই যুদ্ধ থেকে সম্মানজনক প্রস্থানের একটি উপায় হিসেবে ট্রাম্প এখন অবতীর্ণ হয়েছেন যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায়।
ইউরোপের সমস্যাটি এখানেই। তারা এটিকে তাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরো বড় হুমকি বলে মনে করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিজ স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ উভয়ের নিজের গা বাঁচানোর উপায় হিসেবে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি কতটুকু সম্মানজনক হবে এই হিসাব কষতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে ট্রাম্প-পুতিন সাক্ষাতের বিষয় নিয়ে ইউরোপের নেতারা নাখোশ। তাঁদের বিষয় নিয়ে কথা হলো, অথচ তাঁদের উপস্থিত রাখা হলো না। আবার যুক্তরাষ্ট্র যদি রাশিয়ার দিকে বেশি আনুকূল্য প্রদর্শন করে, তাহলে ইউরোপের মুখ লুকানোর আর কোনো জায়গা থাকবে না। ট্রাম্প-পুতিন সাক্ষাতের পর তাই ইউরোপীয় নেতারা আগ্রহ নিয়ে হোয়াইট হাউসে গেলেন তাঁদের দাবি নিয়ে কথা বলতে, জানালেন ইউক্রেনের এক ইঞ্চি ভূমিও ছাড় দেওয়া হবে না, ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ কিংবা সামরিক সামর্থ্যের সীমিতকরণ, যা রাশিয়ার অন্যতম দাবি ছিল, সেটি নিয়েও তাঁরা তাঁদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন। তাঁদের উপস্থিতিতেই ট্রাম্প ফোনে কথা বলেছেন পুতিনের সঙ্গে। পুতিন হয়তো বা মুচকি হেসেছেন। তিনি সবাইকে নিয়েই খেলছেন। তাঁর সঙ্গে অনেক বছর ধরেই রয়েছে চীন। সম্প্রতি প্রকাশ্যেই যুক্ত হয়েছে ভারত, বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির পর রাশিয়া যখন আরো সস্তা মূল্যে তেল বিক্রির প্রস্তাব দিল, চীনের পর রশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রেতা হয়ে ওঠে ভারত।
রাশিয়া জানে, তার নতুন করে হারানোর কিছু নেই। উপরন্তু মার্কিন শুল্কনীতি, যা মার্কিন অর্থনীতিকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি নীতি বলে ট্রাম্প প্রচার করছেন। এর মধ্য দিয়ে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এবং ব্রিকসের মতো সংস্থাগুলো নতুন করে প্রাণসঞ্চারের উদ্যোগ নিয়েছে, যেখানে রয়েছে চীন, রাশিয়া, ভারত—এর সঙ্গে ব্রিকসে রয়েছে লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল। আফ্রিকার দক্ষিণ আফ্রিকা। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে আরো ছয়টি দেশ। বর্তমানে ১১টি গুরুত্বপূর্ণ দেশ, যারা ডলারের আধিপত্য খর্ব করার কথা প্রকাশ্যে না বললেও নিজস্ব মুদ্রায় নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য করার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি এসসিওর সম্মেলনে পুতিন, শি ও মোদির ঘনিষ্ঠতা জানান দেয় অনেক কিছুই। শোনা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির এই অবস্থায় ইউরোপ নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চাইছে এবং এসসিও ও ব্রিকসের মতো সংস্থাগুলোর সঙ্গে একত্রে কাজ করতে চাইছে। হয়তো মূল উদ্দেশ্য, এর মাধ্যমে মার্কিননির্ভরতার বলয় থেকে নিজেদের বের করে প্রকারান্তরে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়ে নিজেরাই নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপের নিরাপত্তাবিষয়ক ভাবনা-চিন্তা বা উদ্যোগ থেকে বের হয়ে আসতে চায়, তাহলে কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও নতুন বৈশ্বিক সমীকরণকে মোকাবেলা করা কঠিন হতে পারে। যে ন্যাটো ছিল তাদের জন্য সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ, মার্কিন ইচ্ছার ওপর এখন এর অস্তিত্ব নির্ভর করছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশ সাম্প্রতিককালে আসন্ন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, যা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ইউরোপবিরোধী অবস্থানের একটি জবাব বলে মনে করা যায়।
তবে এটিও শোনা যাচ্ছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক কমানোর চিন্তা করছেন। যদি এটি সত্যও হয়, তাহলে ভারতকেও চিন্তা করতে হবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের কাছে নিজেদের অবস্থানকে বলি দেবে কি না। একবার ভারত যদি এসসিও কিংবা ব্রিকস থেকে বের হয়ে আসে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দেয়, তাহলে বাদবাকি বিশ্ব থেকে যুক্তরাষ্ট্র যেমন নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে, ভারতকেও এমন পরিণতি বরণ করতে হবে। ভারতের রাজনীতি অনেক পরিণত। দীর্ঘদিন পর ভারত-চীনের মধ্যকার সম্পর্কের দূরত্ব যদি কমে আসে, তাহলে এশিয়াই আগামী দিনে শাসন করবে বিশ্ব। তবে পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, বিশ্বকে অদূরভবিষ্যতে বহুমেরুকেন্দ্রিকতার পথেই হাঁটতে হবে।
লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়