কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার উত্থান

সাইফুল খান [সূত্র : যুগান্তর, ০৪ অক্টোবর ২০২৫]

বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার উত্থান

পৃথিবী বর্তমানে এক জটিল যুগে প্রবেশ করেছে। একদিকে স্নায়ুযুদ্ধের পুরোনো কাঠামো গলে নতুন ক্ষমতার সংঘর্ষের পথ উন্মুক্ত হচ্ছে; অন্যদিকে যুবসমাজ, বিশেষত জেন-জি, ডিজিটাল যোগাযোগের শক্তি নিয়ে দ্রুতভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক ফ্রেমগুলো বদলে দিচ্ছে। এ পরিবর্তনকে আমরা একক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে ভুল হবে। এখানে কাজ করছে এখনো শক্তিশালী পরাশক্তি, যাদের একতরফা বিশ্বব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা ও কার্যকলাপ স্পষ্ট। অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলো তাদের নিজস্ব মর্যাদা ও অঞ্চলে প্রভাব প্রতিষ্ঠায় তৎপর; পাশাপাশি উঠে আসছে একটি ভিন্ন ধরনের বিকল্প; জেন জি-র জাগরণ, যা অনভিপ্রেতভাবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ ও রাজনৈতিক আচার-ব্যবহারকে প্রভাবিত করছে।

 

 

 

অনেক শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারক মনে করেন, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যের সময় শেষ হতে যাচ্ছে। তবে অন্য একদল গবেষক সতর্ক করে বলেছেন, ‘ইউনিপোলারিটি এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।’ কারণ সামরিক, আর্থিক ও নেটওয়ার্ক ক্ষমতার একটি কেন্দ্রীকরণ বিদ্যমান। এই একতরফা আচরণ স্পষ্ট হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোট, বাণিজ্যনীতি চাপিয়ে দেওয়া, প্রযুক্তিগতমান নির্ধারণ, কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থা নিয়ন্ত্রণে। পশ্চিমা গণমাধ্যমই বলছে, ‘গ্লোবাল লিডারশিপ বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্র নিয়মগুলো এমনভাবে সাজায়, যাতে তাদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো বহাল থাকে।’

 

 

আঞ্চলিক শক্তির উত্থান : কেস-স্টাডি

 

 

চীন : চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে এশিয়া-আফ্রিকা-ইউরোপজুড়ে অবকাঠামো, বন্দর, রেললাইন ও শিল্পক্ষেত্র গড়ে তুলছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়; বরং একে অনেক বিশ্লেষক ‘২১ শতকের সিল্ক রোড সাম্রাজ্য’ হিসাবে দেখছেন। দক্ষিণ চীন সাগরে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, আফ্রিকায় ‘ডেট ট্র্যাপ ডিপ্লোমেসি’ ইস্যু, এবং প্রযুক্তিতে (এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, ইভি ব্যাটারি) স্বনির্ভরতা চীনকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার কার্যকর বিকল্প হিসাবে দাঁড় করাচ্ছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বিকল্প হিসাবে এশিয়ান অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক গড়ে তোলাও চীনের সফট পাওয়ার বাড়িয়েছে।

 

 

রাশিয়া : রাশিয়া সামরিক শক্তি ও জ্বালানি রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে টিকে আছে। ইউক্রেন যুদ্ধ পশ্চিমা চাপ সৃষ্টি হলেও মস্কো তার ‘পূর্বমুখী’ কৌশল নিয়েছে। গ্যাস ও তেলের বাজারকে ইউরোপ থেকে এশিয়ায় সরিয়ে নেওয়া, ব্রিকস ও এসসিও-এর মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণের সঙ্গে জোটবদ্ধতা, এবং আফ্রিকায় সামরিক সহযোগিতা (ওয়াগনার গ্রুপের মাধ্যমে) রাশিয়াকে টিকে থাকতে সাহায্য করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রিচার্ড সাকওয়া লিখেছেন, ‘রাশিয়া একক সুপার পাওয়ার হতে না পারলেও বহুমেরু বিশ্ব গড়ার সে সবচেয়ে বড় কণ্ঠস্বর।’

 

 

ভারত : অভ্যন্তরীণ সমস্যা জর্জরিত ভারত নিজেকে বৈশ্বিক দক্ষিণের ‘প্রান্তিক কণ্ঠস্বর’ হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক চন্দ্রযান-৩ মহাকাশ অভিযান, ডিজিটাল ইন্ডিয়া প্রজেক্ট ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ সবই ভারতের শক্তি বাড়ার ইঙ্গিত। তবে ভারতের জোটনীতি দ্বিধাবিভক্ত-একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত জোট কোয়াড ও ইন্দো-প্যাসিফিক ফ্রেমওয়ার্কে সক্রিয়তা, অন্যদিকে ব্রিকস ও এসসিও ও রাশিয়া-ইরানের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তির দিকেও তাকিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত একটি ‘ব্যালান্সিং পাওয়ার’, যে নিজের অবস্থান দিয়ে উভয় মেরুকেই কাজে লাগায়। অবশ্য, ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক নেই এবং কূটনৈতিকভাবেও প্রচণ্ড ব্যর্থ হয়েছে ইতোমধ্যে।

 

 

তুরস্ক : তুরস্কের আঞ্চলিক শক্তি হয়ে ওঠার পথকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘নব্য উসমানিয়াবাদ’ বলে অভিহিত করছেন। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান, লিবিয়া ও সিরিয়ায় সক্রিয় সামরিক ভূমিকা, আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক, এবং ন্যাটোতে এক ধরনের ‘কিংমেকার’ ভূমিকা তাকে আলাদা মর্যাদা দিচ্ছে। বিশেষত, ড্রোন প্রযুক্তি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধেও তা দারুণ সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার হয়েছে। এতে তুরস্ক সামরিক শিল্পে নতুন পরিচয় তৈরি করেছে।

 

 

সৌদি আরব : সৌদি আরব তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে ভিশন ২০৩০ প্রজেক্ট চালাচ্ছে। এতে মেগাসিটি নিয়ম, পর্যটন, প্রযুক্তি, খেলা, এমনকি মহাকাশ গবেষণাও যুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তি তার নিরাপত্তা রাজনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সৌদি আরব এখন একদিকে মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার ভেতরে থাকলেও, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও অস্ত্রচুক্তি করছে।

 

 

ইরান : ইরান আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে ভিন্ন ধাঁচের। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে থেকেও ইরান নিজস্ব মডেল দাঁড় করিয়েছে, যাকে অনেকে ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ বলেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ (হিজবুল্লাহ, হামাস, হুথি) মাধ্যমে। ইরান নিজেকে শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং আদর্শিক কেন্দ্র হিসাবেও উপস্থাপন করেছে। পরমাণু কর্মসূচি, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে অগ্রগতি, এবং চীন-রাশিয়ার সঙ্গে জোট ইরানকে আঞ্চলিক শক্তির শীর্ষে রেখেছে। ইরান সম্প্রতি ব্রিকসে যোগ দিয়েছে (২০২৩), যা তাকে মার্কিন একতরফা চাপ মোকাবিলার নতুন প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। তেল ও গ্যাস রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা এবং হরমুজ প্রণালির কৌশলগত অবস্থান ইরানকে বৈশ্বিক শক্তির দাবার ছকের প্রধানতম খেলোয়াড়ের সুযোগ করে দিয়েছে।

 

 

জেন জি : বিশ্ব রাজনীতির অপ্রত্যাশিত বিকল্প

 

 

জেন জি-রা সাধারণত ১৯৯৭-২০১২ সময়ে জন্মগ্রহণকারী নাগরিক। তারা সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও বিশ্বায়িত সংস্কৃতির সন্তান। তাদের রাজনৈতিক সক্রিয়তা কয়েকটি দিক থেকে নজরকাড়া। ক. বিক্ষোভ ও আন্দোলন : ২০১৯-২০২০ সালের হংকং প্রতিবাদে জেন জি নেতৃত্ব দেয়। গবেষকরা লিখেছেন, ‘তাদের ডিজিটাল সংগঠন ও দ্রুত মোবিলাইজেশন আন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে’। খ. ভোটের প্রভাব : যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ ও ২০২৪ নির্বাচনে জেন জি ভোটাররা জলবায়ু পরিবর্তন, শিক্ষা ঋণ ও স্বাস্থ্যনীতি ইস্যুকে এজেন্ডায় এনেছে। হার্ভার্ড জনমত জরিপ বলছে, ‘জেন-জি-এর ভোটিং শুধু সংখ্যা নয়, বরং বার্তা ও ইস্যু প্রাধান্যের পরিবর্তন।’ খ. সোশ্যাল মিডিয়া মুভমেন্ট : ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার, ফ্রাইডেস ফর ফিউচার (গ্রেটা থুনবার্গ), আরব বসন্ত-পরবর্তী অনলাইন অ্যাক্টিভিজম এসব জায়গায় জেন জি অগ্রণী ভূমিকা রাখে। গ. অর্থনৈতিক আচরণ : গবেষণা বলছে, জেন জি ব্র্যান্ড বয়কট, নৈতিক ভোগবাদ ও টেকসই পণ্যের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। এটি করপোরেট নীতি পরিবর্তনে চাপ তৈরি করছে।

 

 

জেন জি : অঞ্চলভিত্তিক ইস্যু

 

 

দক্ষিণ এশিয়া : বাংলাদেশ ও ভারতের জেন জি জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার। বাংলাদেশ ও নেপালে জেন জি আন্দোলনে সরকারের পতন ঘটেছে। মধ্যপ্রাচ্য : ইরান, লেবানন ও সৌদিতে জেন জি রাজনৈতিক স্বাধীনতা, নারী অধিকার ও ধর্মীয় স্বায়ত্তশাসন চাইছে। ইউরোপ : ফ্রাইডেস ফর ফিউচার আন্দোলনে জেন জি সবচেয়ে দৃঢ়; তারা ক্লাইমেট পলিসি বদলাতে সরাসরি চাপ দিচ্ছে। আমেরিকা : বন্দুকনিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যনীতি, বর্ণবৈষম্য ও সম-অধিকারের প্রশ্নে জেন জি প্রভাবশালী। ল্যাটিন আমেরিকা : দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে জেন জি নেতৃত্ব দিচ্ছে, বিশেষ করে চিলি ও কলম্বিয়ায়।

 

 

পূর্বাভাস : ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা একটি হাইব্রিড সিস্টেম হতে পারে-যেখানে পরাশক্তি তাদের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখবে; আঞ্চলিক শক্তি নিজ নিজ অঞ্চলে ভারসাম্য গড়বে এবং জেন জি ডিজিটাল গণতন্ত্র, ভোট ও সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিকে প্রভাবিত করবে। ব্রিকসের সম্প্রসারণে সৌদি-চীন-রাশিয়া-ভারতের নতুন সংযোগ এবং জেন জি-র বৈশ্বিক এজেন্ডা এসব মিলেই হয়তো আগামীদিনের বিশ্বব্যবস্থা বহুমাত্রিক ও বিকল্পমুখী হবে।

 

 

বর্তমান পরাশক্তির একতরফা আকাঙ্ক্ষা, আঞ্চলিক শক্তির আত্মপ্রকাশ এবং জেন জি-র সক্রিয়তা-এ তিনটি সমান্তরালে বিশ্বকে একটি অচেনা পথে নিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে যুব প্রজন্মের নতুন নৈতিক ও ডিজিটাল রাজনৈতিক মানদণ্ড-এসব মিলে ইতিহাস নতুন গতিপথ নির্মাণ করছে। প্রশ্ন শুধু এতটুকুই -আমরা কি এ পরিবর্তনকে সংঘর্ষমুখী হতে দেব, নাকি বহুপক্ষীয় সুবিচার, আঞ্চলিক সংহতি ও তরুণদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব?

 

 

সাইফুল খান : ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক