কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণে সব বাধা কি কেটেছে

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়ে নাগরিক ও রাজনৈতিক একটি ঐক্য দৃশ্যমান হয়েছে। ইতিহাস ও বর্তমানের আলোকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নে এই ঐকমত্য নিয়ে লিখেছেন মিল্লাত হোসেন লেখা : মিল্লাত হোসেন [প্রকাশ : প্রথম আলো, ০৭ অক্টোবর ২০২৫]

বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণে সব বাধা কি কেটেছে

সুপ্রিম কোর্টের অধীনে একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার শেষ ও সবচেয়ে বড় বাধা কাগজে–কলমে দূর হয়েছে। গত ২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের দ্বৈত বেঞ্চ মো. সাদ্দাম হোসেন ও অন্যান্য বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য (রিট আবেদন নং ১০৩৫৬/২০২৪) মামলায় জেলা আদালতের (অধস্তন আদালত) বিচারকদের পেশাগত নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা–সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে আনীত সংশোধনীগুলোকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন।

 

 

এই রায়ের মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নাগরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পথে বিছিয়ে রাখা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ দ্বৈতশাসনের ‘কাঁটাগুলো’ অপসারিত হয়েছে বলা যায়।

 

 

সর্বোচ্চ আদালত এর আগে অষ্টম ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো (সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে যেগুলো বদলানো যায় না) বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। সেই সব সিদ্ধান্তের আলোকেই সাম্প্রতিক এই রায়ে চতুর্থ ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে করা পরিবর্তগুলো মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে।

 

 

২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার মাধ্যমেও বিচারকদের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নির্বাহী বিভাগ বা সরকারের হাতে রাখা হয়েছিল। আলোচিত এই রায়ে সেটাকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে বাতিল করা হয়।

 

 

এ রায়ে বলা হয়, ১১৬ অনুচ্ছেদ যেমন ছিল, ঠিক তেমনভাবেই তা পুনরুজ্জীবিত হয়ে সংবিধানে পুনঃস্থাপিত হবে এবং এই রায় ঘোষণার দিন থেকেই তা কার্যকর ধরা হবে। আদালত একই সঙ্গে রায়ের অনুলিপি প্রাপ্ত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় গঠন করার নির্দেশ দেন।

 

 

■ অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ তিনবার সংশোধন করা হয়েছিল চতুর্থ, পঞ্চম ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। 

 


■ ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার জন্য আনীত চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন করা হয়। এর ফলে কার্যত বিচারকদের রাষ্ট্রপতির কাছে ‘সোপর্দ’ করা হয়।

 

 

অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ–সংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ তিনবার সংশোধন করা হয়েছিল; চতুর্থ, পঞ্চম ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। এর মধ্যে পঞ্চম সংশোধনী আগেই চূড়ান্তভাবে রদ/রহিত হয়েছিল সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে। এবার বাকি দুটি সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণার ফলে এই অনুচ্ছেদ তার আদিরূপে ফেরে। 

 

 

১১৬ অনুচ্ছেদের আদিরূপটি ছিল : বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকিবে।

 

 

২.
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এ অঞ্চলের মানুষের প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো এক দাবি বা আকাঙ্ক্ষা। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮৫ সালে ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পরপরই এর অন্যতম উদ্যোক্তা এবং প্রথম বাঙালি ব্যারিস্টার মনমোহন দত্ত এই দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে নানা কর্মসূচি পালন ও লেখালেখি শুরু করেন। 

 

 

শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর শতাব্দীপ্রাচীন আকরগ্রন্থ রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ–এ লিখেছেন, ‘...ইণ্ডিয়ান কংগ্রেস স্থাপিত হইলে তিনি (ব্যারিস্টার দত্ত) উৎসাহের সহিত রাজনীতির আন্দোলনে সাহায্য করিতে লাগিলেন। কংগ্রেসের অবলম্বিত আলোচ্য বিষয় সকলের মধ্যে একটা বিষয় তিনি সর্ব্বপ্রথমে অবতারণা করেন; এবং দৃঢ়তার সহিত প্রচার করেন। তাহা বিচার ও শাসন বিভাগকে স্বতন্ত্র করা।’

 

 

বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার রাজনৈতিক অঙ্গীকারও শত বছরের পুরোনো। ১৯২১ সালে অবিভক্ত বাংলার বিধানসভায় এ বিষয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফায়, ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী দলিলে এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ অঙ্গীকার করা হয়।

 

 

১৯৯০ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পরও তিন জোটের রূপরেখায় এর নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম ভাষণ এবং বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের রোডম্যাপেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সংস্কারের দৃঢ় অঙ্গীকার ও প্রত্যয় ব্যক্ত হয়।

 

 


আলোচিত রায়েও হাইকোর্ট বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক ও নাগরিক অঙ্গীকারের প্রশ্নে গুরুত্বারোপ করেছেন। সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে ৩১টি রাজনৈতিক দল সেটা সমর্থন জানিয়েছে। এগুলো উল্লেখ করে হাইকোর্ট বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে এখনই পৃথক সচিবালয় গঠনের উপযুক্ত সময় বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন। এতে আরও বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন কমিশনের মতোই সুপ্রিম কোর্টেরও একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় থাকা উচিত। (সমকাল, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

 

 

বিদ্যমান ১১৬ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করে উচ্চ আদালত আরও বলেছেন যে সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রের অন্য দুটি অঙ্গ (আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগ) থেকে বিচার বিভাগ পৃথক। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের ছাতার নিচে কিংবা মিশে কাজ করতে পারে না। পৃথক বিচার বিভাগ সাংবিধানিক অধিকার; রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে স্বাধীন পরিচয় থাকা জাতীয় সংসদ এবং নির্বাচন কমিশনের পৃথক সচিবালয় থাকলেও বিচার বিভাগের জন্য কোনো সচিবালয় গঠিত হয়নি। (প্রথম আলো, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

 

 


১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বিচারকদের সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে রাখলেও, ফৌজদারি কার্যবিধিতে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদেরই নিয়োগ দেওয়ার বিধান বহাল রাখা হয়। এর ফলে বিচার বিভাগে পরোক্ষ ও আংশিক দ্বৈত শাসনব্যবস্থাই চালু ছিল।

 

 

১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার জন্য আনীত চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন করা হয়। এর ফলে কার্যত বিচারকদের রাষ্ট্রপতির কাছে ‘সোপর্দ’ করা হয় এবং বিচার বিভাগে চালু হয় রাষ্ট্রপতির একক শাসন। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শের শর্ত যোগ করলে শুরু হয় প্রত্যক্ষ দ্বৈতশাসন; চালকের আসনে যথারীতি থেকে যান রাষ্ট্রপতি, তথা সরকার। এ রকম দ্বৈতশাসনের দোর্দণ্ডপ্রতাপের ফলে অর্ধশতাব্দী ধরে নির্বাহী বিভাগের কাছে নাজেহাল হতে হয়েছে বিচার বিভাগ, বিচারক, সর্বোপরি ন্যায়বিচারকে। 

 

 


৩.
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় স্থাপন এবং অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলা বিধানের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে এসবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনার সুপারিশ করেছে। সেই লক্ষ্যে বিচার-কর্ম বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধনসহ সংবিধানের ৮৮ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয়ের আওতায় বিচার-কর্ম বিভাগের বিচারক ও কর্মচারীদের পারিশ্রমিক অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছে।

 

 

অন্যদিকে সংবিধান সংস্কার কমিশন ‘অধস্তন আদালত’-এর পরিবর্তে ‘স্থানীয় আদালত’ নামকরণ প্রস্তাব করে স্থানীয় আদালতের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, ছুটি, শৃঙ্খলাসহ সব সংশ্লিষ্ট বিষয় সুপ্রিম কোর্টের কাছে ন্যস্ত করার কথা বলেছে। সেই লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে একটি বিচারিক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা; সংযুক্ত তহবিলের অর্থায়নে সুপ্রিম কোর্ট এবং স্থানীয় আদালতের প্রশাসনিক কার্যক্রম, বাজেট প্রণয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর এই সচিবালয়ের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকার সুপারিশ করেছে।

 

 


জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অংশ নেওয়া সব দল এই মর্মে একমত হয় যে অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনার জন্য সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ ও সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করা হবে এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং বার্ষিক বাজেট নির্ধারণ করা হবে। অধস্তন আদালতের স্থানান্তর, বদলি, শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক বিষয়ে এর অধিকার থাকবে। 

 

 

আলোচিত এই রায়ের ফলে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের বদলি, পদোন্নতি, পদায়ন, ছুটি, শৃঙ্খলা বিধান ইত্যাদি বিষয় এখন এককভাবে সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফিরে আসার কথা। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বহুল চর্চিত মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করে নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের বদলে বিচারিক কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিযুক্তির বিধান করে এই কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখা হয়েছে। 

 

 

দৃশ্যত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়ে নাগরিক ও রাজনৈতিক একটি ঐক্য গড়ে উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের অধীনে বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় আইন–বিধিবিধান প্রণয়ন, আর্থিক-প্রশাসনিক স্বশাসন, জনবল নিয়োগসহ অবকাঠামো নির্মাণের যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।

 

 

 


প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা দরকার যে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসি আলাদা করার পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে, সচেতনভাবে কিংবা অচেতনভাবে এ দাবি উচ্চারিত হতে থাকে যে সেদিন থেকেই বিচার বিভাগ বা স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ ধারণা যথাযথ নয়; আসলে বিচার বিভাগ আলাদা হয়নি, স্বাধীনও হয়নি।

 

 

প্রকৃত পরিস্থিতি হলো, আগে ম্যাজিস্ট্রেটদের বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন মূলত সরকারের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা, যাঁদের নিয়ন্ত্রক ছিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের (পূর্বনাম সংস্থাপন মন্ত্রণালয়) কাছে।

 

 

২০০৭ সালের ১ নভেম্বর থেকে বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা ম্যাজিস্ট্রেটের বিচারিক ক্ষমতা পেলেও, বাস্তবে তাঁদের ওপর নির্বাহী বিভাগের বাস্তবিক নিয়ন্ত্রণই বহাল থাকে। আর সেটি করা হয় সরকারেরই আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। ফলে দেখা যায়, বিচারিক ক্ষমতা কেবল এক শ্রেণির কর্মকর্তার কাছ থেকে অন্য শ্রেণির কর্মকর্তার কাছে স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি থেকে গেছে নির্বাহী বিভাগ, তথা সরকারের হাতেই।

 

 

 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি বেশ জটিল। এ বিষয়ে রিদওয়ানুল হকের একটি বক্তব্য উল্লেখ করতে চাই, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়টি খুব সরলভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এটা বহুধা অর্থ বহন করে এবং এর বিভিন্ন ধরনের আঙ্গিক আছে।

 

 

বিচারকদের সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, স্বাধীন মনমানসিকতা, পেশাদারত্ব, দায়বদ্ধতা, জবাবদিহি—এই সবকিছুই বিচারিক সংস্কৃতির অংশ। সেই সংস্কৃতির চর্চা আমাদের এখানে খুব বেশি নেই। তাই শুধু সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করলে, আইনের কিছু ধারা বদল করলে, এমনকি এ–সংক্রান্ত নতুন আইন করলেও বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়ে যাবে, বিচারকেরা স্বাধীনভাবে বিচার করবেন বা করতে পারবেন—এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই।’ (বিশেষ সাক্ষাৎকার: রিদওয়ানুল হক,  প্রথম আলো,২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

 

 


৪.
আলোচিত ওই রায় ও তার পটভূমিতে থাকা বিরল রাজনৈতিক ঐক্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে প্রকৃত বিচারিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে এখন। অন্যদিকে বিচার বিভাগের কাঁধেও চেপেছে দায়িত্ব-কর্তব্যের ‘গুরুভার’। এই গুরুভার হলো দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা। 

 

 

নাগরিকদের করের টাকায় ঢেলে এত রাষ্ট্রীয় আয়োজন তো বিচারিক সেবা দেওয়ার জন্যই। সরকারি ও বেসরকারি সব ধরনের ক্ষমতাবানের কাছ থেকে জনগণকে প্রাথমিক সুরক্ষা দেওয়ার গোড়ার কাজটি অধস্তন বিচার বিভাগের। কারণ, জনগণের দোরগোড়ায় থাকা স্থানীয় আদালত হিসেবে সব আইনগত কার্যধারা, মামলা দায়ের, গ্রেপ্তার, পুলিশি রিমান্ড, জামিন, উদ্ধার, তদন্ত, বিচার, নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীদের প্রথমেই দ্বারস্থ হতে হয় বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা ও জেলা আদালতগুলোর কাছে। 

 

 

আলোচিত এই রায় প্রতিপালিত হওয়ার পর বিচারকেরা আর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের অজুহাতটি দিতে পারবেন না। তবে নাগরিকদেরও রাতারাতি সবকিছু বদলে যাওয়ার প্রত্যাশায় লাগাম টেনে রাখতে হবে। কারণ, সব ব্যবস্থাকেই ‘ট্রায়াল অ্যান্ড এরর’ পদ্ধতিতে নিজেদের ভুল-ত্রুটি-সীমাবদ্ধতা শুধরে এগোতে হয়।

 

 

● মিল্লাত হোসেন আইন–আদালত–সংবিধানবিষয়ক গবেষক


* মতামত লেখকের নিজস্ব