কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বহুমেরু বিশ্ব : নেতৃত্বে চীন

জিয়াউদ্দিন সাইমুম [সূত্র : কালের কণ্ঠ, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫]

বহুমেরু বিশ্ব : নেতৃত্বে চীন

সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) ২৫তম শীর্ষ সম্মেলন অভূতপূর্বভাবে তার বৈচিত্র্যময় ভবিষ্যৎ উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পুনর্নির্ধারণ করে বৈশ্বিক শাসন, টেকসই উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আর চীন এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের অগ্রভাগে রয়েছে। পরিবর্তিত বৈশ্বিক আবহে ইউরেশিয়ান চিন্তাধারার পটভূমিতে এসসিও তার কৌশলগত জোটের সঙ্গে, বিশেষত ভারত ও রাশিয়া, এসসিওর আঞ্চলিক সদস্য এবং গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক ও ন্যায্য বিশ্ব প্রতিষ্ঠার জন্য অবিচলভাবে পরিপূরক ভূমিকা পালন করতে চাইছে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে কাজ করছে। 

 

 

এসসিও শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তৃতায় চীনের রাষ্ট্রপতি শি চিনপিং নিশ্চিত করেছেন, ‘এসসিও একটি নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মডেল উপস্থাপন করেছে।

 

 


আমাদের অবশ্যই বিশ্বে সমান ও সুশৃঙ্খল বহুমেরুত্ব, অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন এবং আরো ন্যায়সংগত ও অর্থবহ বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নির্মাণের পক্ষে সমর্থন করতে হবে।’

 


শি চিনপিংয়ের ভাষণ সব অংশগ্রহণকারী নেতা সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন করেছেন। বিশেষ করে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও জোর দিয়ে বলেছেন, ‘চীন বৈশ্বিক বহুপাক্ষিকতাকে সমর্থন করার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক ভূমিকা পালন করেছে।’ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন ভূ-রাজনৈতিক স্থাপত্যের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য চিনপিংয়ের কৌশলগত অবস্থান মূলত বিরাজমান পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত একমেরু ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।

 

 


তাঁর ‘শান্তি বা যুদ্ধ’ আখ্যানটি বিশ্বব্যাপী সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় চীন ও তার অংশীদারদের প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্বশান্তি এবং টেকসই উন্নয়নে ধারাবাহিকভাবে সাহসী প্রতিশ্রুতি অনুসরণ করার জন্য শি চিনপিংয়ের প্রস্তাব বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোতেও (জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকসহ) অনুসৃত হতে পারে। এর একটি বাস্তব উদাহরণ হলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের আহবান, যেখানে চীন আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং এশিয়ার দেশগুলোসহ আজকের বিশ্বকে আরো ভালোভাবে প্রতিফলিত করার জন্য প্রতিনিধিত্ব সম্প্রসারণকে সমর্থন করছে।

 

 

এটি বিশ্বজুড়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান যে চীনের তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ও সুসংহত অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।

 

 

কয়েক বছর ধরে চীন লাতিন আমেরিকান, আফ্রিকান এবং এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে নির্বিচারে তার অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করেছে। অন্যদিকে রাশিয়াও তার নিজস্ব ‘নির্ভরযোগ্য অংশীদার’ নির্বাচন করতে পেরেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আকস্মিক পতনের পর রাশিয়া এখন তার অর্থনৈতিক রূপান্তর, আধুনিকীকরণ এবং আপগ্রেডিং অন্বেষণ করছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার চ্যালেঞ্জ ও বাধা রয়েছে। তবে বাস্তবিক অর্থে, রাশিয়া তার বর্তমান পেরেস্ত্রোইকা (পুনর্নির্মাণ বা পুনর্গঠন) ও গ্লাসনস্ত (স্বচ্ছতা) এবং সাবেক সোভিয়েত প্রতিবেশীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ও বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক নীতি সুসংহত করার সঙ্গে সঙ্গে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পেরেছে।

 

 

 

এসসিও শীর্ষ সম্মেলনের উপসংহারে ভ্লাদিমির পুতিন ৩ সেপ্টেম্বর মিডিয়া কনফারেন্সে রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের দ্বারা গৃহীত বেশির ভাগ নথি উদীয়মান নতুন বিশ্বে এসসিও ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পেরেছে। তিনি বলেন, ‘এই প্রসঙ্গে আমি চীনের বৈশ্বিক শাসন উদ্যোগের কথা উল্লেখ করতে চাই। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই উদ্যোগটি চীনে শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ইতিবাচক অনুভূতি প্রচারের লক্ষ্যে এবং সেই দেশগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য অংশীদারদের মধ্যে, যারা আজ নতুন অংশীদারির জন্য তাদের প্রস্তুতি ঘোষণা করতে ইচ্ছুক নয়।’

 

 

বহুমেরু বিশ্ব গঠিত হয়েছে কি না, এর সরাসরি উত্তর দেওয়া হয়তো কঠিন। তবে এটি বলতে বাধা নেই, বহুমেরু বিশ্বের

রূপরেখা অবশ্যই দাঁড়িয়েছে। বহুমেরুত্ব মানে নতুন আধিপত্যের উত্থান নয়। একই দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন অন্য অনেক দেশের মধ্যে রাশিয়া ও চীন ধারাবাহিকভাবে বিশ্বব্যাপী সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর ভিত্তি করে একটি ন্যায্য বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে কথা বলে আসছে। আবার ভারত ও চীনের মতো অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশ মনে করে, এসসিও হোক বা ব্রিকস—আন্তর্জাতিক বিষয়ে সব অংশগ্রহণকারীর সমান অধিকার থাকা উচিত এবং আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে সবার একই অবস্থান থাকা উচিত।

 

 

 

এসসিও শীর্ষ সম্মেলনজুড়ে পুতিনের অভিব্যক্তি ছিল বেশ দৃঢ় ও সাবলীল। তিনি বলেছেন, উদীয়মান বিশ্ব তথা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে মিশে থাকা উচিত বিশ্বের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এবং মিথস্ক্রিয়া। তিনি বলেন, ‘ধারণাটি আমি আগে উল্লেখ করেছি। সেটি হলো বিশ্ব বহুমেরু হওয়া উচিত, যার অর্থ আন্তর্জাতিক যোগাযোগে সব অংশগ্রহণকারীর সম্মান সমান হওয়া উচিত এবং অন্যদের চেয়ে বেশি সমান হওয়া উচিত নয়। একমেরু বিশ্বের অস্তিত্ব বন্ধ হওয়া উচিত, যার মধ্যে রয়েছে তাদের স্বার্থে, অন্তত সেসব দেশের জনগণের স্বার্থে, যাদের নেতৃত্বে এখনো এই ক্ষয়িষ্ণু এবং এরই মধ্যে অপ্রচলিত ব্যবস্থাকে বহাল রাখা হচ্ছে।’ 

 

 

চীন তার অর্থনীতির সব দিক এবং বহিরাগত বিনিয়োগের পদক্ষেপের ওপর ব্যাপক কাজ করেছে। এর ওপর চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। চীনের বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ ও বাণিজ্য কেবল অকল্পনীয়ই নয়, এটি দেশটিকে বিশ্বব্যাপী শক্তিও এনে দিচ্ছে। এটি একই সঙ্গে তার অর্থনীতিকে পদ্ধতিগতভাবে রূপান্তর করেছে এবং রাজনৈতিক কাঠামো বজায় রেখেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার অঞ্চলগুলো সাধারণ সোভিয়েত যুগের থেকে খুব বেশি আলাদা বলে মনে হচ্ছে না।

 

 

 

বিশেষজ্ঞরা জোরালোভাবে যুক্তি দেন, ১.৫ বিলিয়ন জনসংখ্যার চীন ইতিহাসের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি মানুষকে (৮০ কোটি) চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা ৩৮ কোটি, যা রাশিয়ার দ্বিগুণেরও বেশি। এর আগের এক ভাষণে পুতিন ঘোষণা করেছিলেন যে ২০২৫ সালের মধ্যে রাশিয়ার জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাতে পারে, মূলত অভিবাসনের ফলে। রাশিয়া এখন বহির্বিশ্বে তার পণ্যের বাজার খুঁজছে। তবে তাদের অঞ্চলগুলোকে উন্নত করতে হবে এবং সোভিয়েত যুগের বেশির ভাগ শিল্পকে আধুনিক করতে হবে। চীনের তুলনায় ভোগ্যপণ্যে তাদের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য কচ্ছপের গতিতে বিকশিত হচ্ছে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বিগত বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত হয়েছে। রাশিয়া রপ্তানি পণ্য হিসেবে তেল ও গ্যাসের ওপর বেশি মনোযোগী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া চীন, ভারত, উত্তর কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে। এসসিও শীর্ষ সম্মেলনে স্বাক্ষরিত নতুন চুক্তির মাধ্যমে চীন ও ভারত রাশিয়ার সুদূর প্রাচ্যে তাদের অর্থনৈতিক সীমানা প্রসারিত করবে।

 

 

 

নিশ্চিতভাবেই ব্যাবহারিক, বহুমুখী, টেকসই উন্নয়ন এবং বিশ্বের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রেখে পরাশক্তির মর্যাদা অর্জন করতে হবে। বৈচিত্র্যময় উত্তেজনার আধিপত্যে, বেইজিং এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য একটি স্থিতিশীল এবং নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করছে। বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, চীন কার্যত এই বিশ্বের নেতৃত্বের জন্য নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে।

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক