কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বাংলাদেশে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে কী?

ড. মো. সিরাজুল ইসলাম প্রকাশ : বণিক বার্তা, ২০ অক্টোবর ২০২৫়

বাংলাদেশে একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে কী?

এক সপ্তাহের মধ্যে তিন তিনটি বড় আগুন। তাও আবার যদি এবারই প্রথম হতো ! প্রতি বছরই আগুন লাগছে, মানুষ মরছে, সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে। তাতেও কারো কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। এর সর্বশেষ পরিণতি বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে আগুন। এবার আর শুধু দেশে না, খবর ছড়িয়ে পড়বে সার বিশ্বে।

 
 

প্রভাব পড়বে দেশের ভাবমূর্তি, আমদানি-রফতানিতে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেরই যদি এ দশা হয়, সারা দেশের অবস্থা না জানি কী? প্রভাব পড়তে পারে বিমান চলাচলের ওপরও। নিশ্চিত করেই বলা যায়, আগুন লেগেছে অব্যবস্থাপনার কারণে। কারণ খুঁজলে দেখবেন ভবনের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ঠিক ছিল না, বিদ্যুতের লাইনে সমস্যা, দাহ্য পদার্থের জায়গায় হয়তো কেউ সিগারেট খাচ্ছিল, ছিল না সেখানে ভেন্টিলেটর, হোস পাইপ নষ্ট—আরো কত কী!

 
 
 
 
 

অথচ যেকোনো দুর্যোগের সময় এই প্রথম ১ ঘণ্টাকে বলা হয় গোল্ডেন আওয়ার। আগুনের ক্ষেত্রে আওয়ার না মিনিট ধরে দ্রুত কাজ করতে হয়। এর ছিটেফোঁটাও ব্যস্ততা দেখলাম না তাদের মাঝে। টিভিতে দেখছিলাম, বাইরে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আর পণ্যের মালিকরা চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলেন এই বলে যে এরা যদি না পারে, আমাদের ভেতরে ঢুকতে দিক, আমরা আগুন নেভাই। মজার কথা হচ্ছে, প্রাইভেট টিভি চ্যানেলগুলো যত দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়েছে, সেই দ্রুততায় ঘটনাস্থলে উপস্থিত তথা কাজ শুরু করতে পারেনি সরকারি ফায়ার সার্ভিস।

 

 

জনগণের জানমাল রক্ষায় এ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ব্যর্থ। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এদের বেতন দেয়া হয়। হোক ফায়ার সার্ভিস বা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ; দুর্নীতি, অদক্ষতা আর অব্যবস্থাপনাই এদের আসল পরিচয়। তথাকথিত এ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নিয়ে জনগণের অভিযোগের শেষ নেই। এখানে খেটে খাওয়া প্রবাসীদের শেষ সম্বল লুট করা হয় লাগেজ কেটে। ইমিগ্রেশন থেকে আরম্ভ করে কাস্টমস বা লাগেজ বেল্ট, কোথাও আন্তর্জাতিক মানের ছিটেফোঁটাও নেই। বহুদিন ধরে দেখছি যে কার্গো অঞ্চলটিতে খোলা আকাশের নিচে পণ্য রাখা আছে। যে দেশে বছরে ১০০ দিনের বেশি বৃষ্টি হয়, সেখানে শেড ছাড়া কীভাবে খোলা আকাশের নিচে মূল্যবান পণ্য এভাবে দিনের পর দিন খোলা রাখা হচ্ছে। নিরাপত্তার তো বালাইও নেই। রানওয়ের ভেতরে গরু-ছাগল ঢোকার খবর হামেশাই পত্রিকায় আসে। কার্গো এলাকা থেকে পণ্য চুরি নিত্তনৈমিত্তিক ঘটনা।

 

 

অন্যদিকে দেশে আগুন নিয়ন্ত্রণ তথা এ-সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগের ভার আছে ফায়ার সার্ভিস বিভাগের ওপর। এটি একটি সম্পূর্ণ দুর্নীতিগ্রস্ত বিভাগ। বাংলাদেশ নির্মাণ বিধিমালা বিএনবিসিতে স্পষ্ট বলা আছে, একটি ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কী ধরনের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নিতে হবে। এক্ষেত্রে রেস্টুরেন্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিমানবন্দর কোথায় কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা আছে।

 

 

আগুন নেভানোর পানি কোথা থেকে আসবে, ভবনের গুরুত্ব অনুযায়ী গ্যাস সিলিন্ডার, হোস পাইপ সিস্টেম নাকি স্প্রিঙ্কলার রাখতে হবে। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে যেকোনো আগুন নেভানোর সক্ষমতা এর চৌহদ্দির ভেতরেই থাকতে হবে ইত্যাদি।

 

 

এগুলো দেখভাল করার দায়িত্ব এই ফায়ার সার্ভিস বিভাগের ওপর। তাদের কাছ থেকে লাইসেন্স লাগে এসব ক্ষেত্রে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, কোনো ধরনের পরিদর্শন বা যাচাই না করে টাকার বিনিময়ে তারা এ লাইসেন্সগুলো দিয়ে থাকেন। পরিদর্শন করলেও নামকাওয়াস্তে। বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় যেভাবে নিয়ম করে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর তাদের পর্যবেক্ষণ করার কথা, তার কিছুই তারা ঠিকভাবে করেছেন বলে মনে হয় না।

 

 

এক্ষেত্রে নিজের দু-একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি। ঢাকার একটি নামকরা সুপারশপে বাজার করছি। একদল লোক হঠাৎ ঢুকল। পরে জানলাম, ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা এসেছেন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর দেখলাম তারা চলে গেলেন। জিজ্ঞেস করলাম পরিদর্শন কোথায় করেছেন। দোকানের কর্মচারীরা হেসে জানালেন, চা-পানি খেয়ে টাকা নিয়ে চলে গেছেন।

 

 

বেইলি রোডের আগুনের পর পর, গুলশানে একটি রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে তাদের ফায়ার এক্সিট দেখতে চাইলাম। পরে যা আবিষ্কার করলাম তা হচ্ছে এই যে রেস্টুরেন্টটি থেকে বের হওয়ার সিঁড়ি একটাই এবং সেখানে যেতে হবে কিচেনের ভেতর দিয়ে। অথচ রেস্টুরেন্টটি গুলশানের একটি ‘পশ’ খাবার ঘর হিসেবে পরিচিত এবং সেখানে তখন একাধিক বিদেশীও খাবার খাচ্ছিল। একইভাবে সিঁড়িঘরে গ্যাস সিলিন্ডার আপনি পাবেন ধানমন্ডিসহ ঢাকার প্রায় সব বহুতল ভবনের খাবারের দোকানে। পত্রিকায় দেখা যায়, নেট দুনিয়ায় রেস্টুরেন্টের নামসহ ছবি আসছে। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসই শুধু দেখে না! রাজউকেরও দায়িত্ব আছে বিল্ডিংয়ের অনুমোদন দেয়ার সময়। এরা তো আরো বড় দুর্নীতিবাজ।

 

 

জনগণের সচেতনতাও এখানে একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারত। নিজের আপার্টমেন্টের কথাই বলি। কোটি টাকা খরচ করে আপার্টমেন্ট করেছেন। কিন্তু ২০ হাজার টাকা খরচ করে ফায়ার ডোর লাগাতে নারাজ। এখানে থাকেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিত, ডাক্তার আর প্রকৌশলীরাও। বিশ্ববিদ্যালগুলোয়ও দেখেছি পরিবেশ কিংবা দুর্যোগ বিষয়ে কোর্স পড়াতে অনীহা। মান্ধাতার আমলের গৎবাঁধা সিলেবাস। বেইলি রোডের আগুন কিংবা বনানী, ফায়ার ডোরগুলো যদি ঠিকঠাকমতো থাকত আর সিঁড়িগুলো পরিচ্ছন্ন—কোনো আগুনে, কখনো একটি মানুষও প্রাণ হারাত না। নিয়ম হচ্ছে, এই ফায়ার ডোরগুলো ২-৩ ঘণ্টা পর্যন্ত আগুন প্রতিরোধক বস্তু দিয়ে তৈরি হতে হবে। আপনি ধাক্কা দিয়ে বের হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজে শক্ত হয়ে লেগে যাবে। ফলে আগুন কিংবা ধোঁয়া কখন সিঁড়িঘরে ঢুকতেই পারবে না। দরজা খুলে আপনি নিরাপদে দৌড়ে বেরিয়ে যাবেন নিচ পর্যন্ত।

 

 

সর্বশেষ খবর হচ্ছে আগুনের কারণ অনুসন্ধানে কমিটি করা হয়েছে আর এতে যারা সদয় তাদের সবাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ভাবুন একবার, একটি অপরাধ তদন্তে, সম্ভাব্য অপরাধীদেরই তদন্ত কমিটির সদস্য করলেন। রিপোর্ট কেমন হবে। এখানে তো দরকার ছিল ভুক্তভোগী আমদানিকারক, প্রবাসী ভাই কিংবা নিদেনপক্ষে আগুন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করা। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এদের বেতন হলেও জনগণের কাছে জবাবদিহি করার কোনো ব্যবস্থাই এ আমলাতন্ত্রে রাখা হয়নি।

 

 

এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে আমাদের উন্নতি হতে যাচ্ছি। আমরা নিজেরাই বলছি আমরা নাকি এর যোগ্য নই, আরো কিছুদিন সময় প্রয়োজন ছিল। খয়রাতির টাকার ভাগ আর পাব না! আসলে, সভ্য হতে গেলে শুধু মাথাপিছু আয় নয়, স্বভাব-চরিত্রেরও কিছু উন্নতি প্রয়োজন। যত্রতত্র ময়লা ফেলা, ওপরে ওভারব্রিজ রেখে নিচে দৌড়ে রাস্তা পার হওয়া কিংবা অগ্নিনির্বাপণের ন্যূনতম ব্যবস্থা ছাড়া বাড়িতে বাস, আর সর্বোপরি সরকারি অফিসগুলোর সর্বগ্রাসী দুর্নীতি—এগুলোর কোনোটিই সভ্য দেশের আচরণ নয়। হয়তো অদূরভবিষ্যতে আরেকটি গণজাগরণ প্রয়োজন হবে এসবের বিরুদ্ধে।

 

 

ড. মো. সিরাজুল ইসলাম: অধ্যাপক, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়