কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র-জাপান বাণিজ্য চুক্তি

ড. মো. আইনুল ইসলাম [সূত্র : জনকষ্ঠ,

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র-জাপান বাণিজ্য চুক্তি

বিশ্ববাণিজ্যের পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি এবং স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ ‘উত্তর-ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক কাঠামো’র নতুন এক সমীকরণ তৈরি করেছে, যেখানে অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডোর তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব কিংবা রাউল প্রেবিশের কেন্দ্র-পরিধি মতবাদ এক নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হচ্ছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দুটি পৃথক বাণিজ্য চুক্তি কেবল পণ্য আদান-প্রদানের দলিল নয়, বরং এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের এক অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে জাপানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি’ বা ইপিএ যেখানে সহযোগিতামূলক ও বহুমাত্রিক উন্নয়নের রূপরেখা দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ‘পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’ বা এআরটি মূলত অসম ক্ষমতার দ্বন্দ্বে টিকে থাকার এক কঠোর ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকারনামা’ হিসেবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

 

 

এই দুই চুক্তির প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জাপানের সঙ্গে সম্পর্কটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ আইনি কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেখানে যৌথ কমিটির মাধ্যমে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে, যা আলবার্ট হির্শম্যানের ‘ভয়েস’ বা মতপ্রকাশের তত্ত্বকে সমর্থন করে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং মূলত বাংলাদেশের একতরফা ছাড় দেওয়ার ওপর ভিত্তি করে রচিত, যা বড় অর্থনীতির কাঠামোগত ক্ষমতার বহির্প্রকাশ এবং এখানে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটা প্রভু-ভৃত্যের মতো।

 


বাজার প্রবেশাধিকার ও শুল্ক কাঠামোর ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায় যে, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের প্রায় ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য তৎক্ষণাৎ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার পথ সুগম করেছে, যা দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য প্রধান রপ্তানি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ গড় শুল্কহার কার্যকর থাকার বিষয়টি একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, এটি বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলে। যদিও চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পণ্য যেমন- ওষুধ, কৃষিপণ্য ও প্লাস্টিককে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে তার নিজস্ব বাজারে ৭ হাজার ১৩২টি ট্যারিফ লাইনের মধ্যে ৪ হাজার ৯২২টি ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ শুল্ক তুলে নিতে হয়েছে, যা দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য নিশ্চিতভাবে অসম প্রতিযোগিতার ঝুঁকি তৈরি করবে। এই শুল্ক ছাড়ের প্রক্রিয়াটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে অনেকটা ‘দ্রুত দৌড়’ দেওয়ার মতো হলেও বাংলাদেশের জন্য তা ধাপে ধাপে ৫ থেকে ১০ বছরের রূপান্তরকাল দাবি করে, যা দেশীয় রাজস্ব আয়ের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

 

 


তৈরি পোশাক খাতের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ‘শূন্য শুল্ক’ সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি কঠিন শর্ত, যা বাংলাদেশের কাঁচামাল সংগ্রহের স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যদি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম সুতা আমদানি করে পোশাক তৈরি করে তবেই কেবল শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে, যা মূলত আমেরিকান তুলা চাষিদের জন্য একটি সুরক্ষিত বাজার নিশ্চিত করেছে। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ‘ডিপেন্ডেন্সি থিওরি’ বা নির্ভরশীলতা তত্ত্বের একটি ক্ল্যাসিক উদাহরণ, যেখানে কাঁচামালের জন্য কেন্দ্র বা উন্নত দেশের ওপর পরিধি বা উন্নয়নশীল দেশকে বাধ্য করা হয়। ধ্রুপদী অর্থনীতিশাস্ত্রের জনক অ্যাডাম স্মিথও খুব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন এসব। এ জন্যই তিনি উপনিবেশ নীতিতে তার দেশকে সুবিধা দিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আমদানি-রপ্তানি নিয়ে সুপারিশে বলেছিলেন- ‘তোমরা (উপনিবেশের অর্থনীতি) আমদানি করবে শিল্পপণ্য এবং রপ্তানি করবে চূড়ান্ত দ্রব্য’। দুর্বল দেশের শ্রম উৎপাদিত পণ্যের মূল্য আত্মসাৎ করতেই আধুনিককালে ‘ভ্যালু চেইন’ সৃষ্টি করে প্রভু-ভৃত্য ধারা অটুট রাখা হয়েছে। উপরন্তু বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৮০ শতাংশের মধ্যে যেখানে ১৯ শতাংশ শুল্কের কবলে পড়ে, সেখানে এই শর্তসাপেক্ষ সুবিধাটি গ্রহণ করতে গেলে অন্যান্য সস্তা উৎস থেকে তুলা আমদানির সুযোগও বাংলাদেশ হারাবে, যা শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেবে। অন্যদিকে জাপানের সঙ্গে চুক্তিতে এ ধরনের কোনো কঠোর বাধ্যবাধকতা ছাড়াই একক পর্যায়ের প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের জন্য অনেক বেশি নমনীয় ও লাভজনক।

 


কৃষি খাতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির ফল স্থানীয় কৃষকদের জন্য এক অশনি সংকেত হয়ে দেখা দেবে। কারণ, এখন বাংলাদেশকে একতরফাভাবে মার্কিন কৃষি পণ্য যেমন- সয়াবিন, গম, দুগ্ধ ও মাংসের জন্য বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে। চুক্তিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে বছরপ্রতি কমপক্ষে ৭ লাখ মেট্রিক টন গম এবং ১.২৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সয়াবিন পণ্য আমদানি করতে হবে, যা বাংলাদেশকে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বৃত্ত কৃষি উৎপাদনের নিশ্চিত বাজারে পরিণত করবে। হেকশার-ওহলিন মডেল অনুযায়ী, দেশগুলোর উচিত তাদের প্রাচুর্যপূর্ণ উপাদানের ওপর ভিত্তি করে উৎপাদন করা। ফলে কৃত্রিমভাবে আমদানির লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়ায় এখন বাংলাদেশের কৃষিখাতের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। এর পাশাপাশি মার্কিন খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সনদকে সরাসরি স্বীকৃতি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ও কারিগরি সক্ষমতাকে অবজ্ঞা করার স্পষ্ট শামিল, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর প্রমাণ, জেনেটিক্যালি মোটিভেটেড ফুডের আধিক্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ৪১ শতাংশ স্থ’ূলকায় নাগরিক, যারা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায় মহাশক্তিধর হয়েও কোভিড-১৯ মহামারিতে সর্বোচ্চ মৃত্যু নিয়ে বিশ্বে ১ নম্বর হয়েছে। শুধু কি তাই, মেধাস্বত্ব অধিকার বা আইপিআর সংক্রান্ত বিধানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি মূলত একটি ‘ট্রিপস-প্লাস’ বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মানদণ্ডের চেয়েও কঠোর নিয়ম আরোপ করেছে।

 

 

বাংলাদেশকে পেটেন্ট সহযোগিতা চুক্তি ও মাদ্রিদ প্রোটোকলসহ মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত প্রায় ৯টি থেকে ১২টি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত হতে বাধ্য করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জেনেরিক ওষুধ শিল্পের অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেবে। যেখানে জাপানের সঙ্গে চুক্তিতে ট্রিপস চুক্তির নমনীয়তা বজায় রেখে ১০ বছরের একটি দীর্ঘ ট্রানজিশন পিরিয়ড বা রূপান্তরকাল দেওয়া হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, যা বাংলাদেশের আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করবে। মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় এই কঠোরতা মূলত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মুনাফা নিশ্চিত করবে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের দাম বাড়িয়ে স্বাস্থ্য খাতের লোকসান বয়ে আনবে।

 


বিনিয়োগ ও কৌশলগত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন এই দুই চুক্তিতে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রতিফলিত হয়েছে। যেখানে জাপান বিনিয়োগে একটি আইনসম্মত ও পূর্বাভাসযোগ্য পরিবেশের ওপর জোর দিয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে বাণিজ্যের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে সরাসরি যুক্ত করেছে। এটি বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির স্বাধীনতাকে স্পষ্টভাবেই সংকুচিত করবে। বাংলাদেশকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন এলএনজি ক্রয় এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জন্য বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়ের অঙ্গীকার করতে হয়েছে। এটি মূলত কোনো বাণিজ্যিক চুক্তির চেয়ে একটি ‘কৌশলগত মিত্রতা’ বা জোট গঠনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে, যা বাংলাদেশের মতো জোটনিরপেক্ষ উন্নয়নশীল দেশের জন্য ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি। বিশেষ করে নির্দিষ্ট দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় সীমিত করার শর্তটি বাংলাদেশের সার্বভৌম প্রতিরক্ষা নীতির ওপর হস্তক্ষেপ। 

 


বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াটি এই দুই চুক্তির ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতাকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। যেখানে জাপানের সঙ্গে একটি দ্বি-পক্ষীয় ও স্বচ্ছ সালিশি ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি একটি ‘ইউনিল্যাটারাল এনফোর্সমেন্ট’ বা একতরফা প্রয়োগ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হলে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই শুল্ক পুনরায় আরোপের ক্ষমতা রাখে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে একটি অসম চুক্তি বা ‘ইক্যুইটি কন্ট্রাক্ট’ যেখানে একপক্ষ বিচারকের ভূমিকা পালন করে এবং অন্যপক্ষ কেবল নির্দেশ পালনে বাধ্য থাকে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলেছে, বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধে যুক্ত করা ‘এক্সিট ক্লজ’ বা চুক্তি বাতিলের সুযোগ, যা অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে সচরাচর থাকে না। কথাটি সত্য।

 

 

তবে এখানে কথার বড় ছলচাতুরি আছে। কারণ, সম্প্রতি ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা একই রকম ‘রেসিপ্রোকাল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (আরটিএ)’-এতে পারস্পরিক বাণিজ্য ব্যতীত অসম চুক্তি বা ইক্যুইটি কন্ট্রাক্টের মতো কোনো ধারাই সন্নিবেশিত হয়নি। উপরন্তু, যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে এমন একটি উদাহরণও পাওয়া যায় না, যেখানে বিশ্বের দুর্বল বা সবল কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের দুঃসাহস দেখিয়েছে। এমনকি পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়া আগ বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চুক্তি বাতিল করেছে, এমন উদাহরণও খুঁজে পাওয়া দুস্কর।
লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়