কল করুন

কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স

বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভূমিকা : বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৫

ড. তোফাজ্জল ইসলাম [প্রকাশ: বণিকবার্তা, ১৬ অক্টোবর ২০২৫]

বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তায় বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভূমিকা : বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৫

আজ ১৬ অক্টোবর, বিশ্ব খাদ্য দিবস। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ১৯৪৫ সালের প্রতিষ্ঠা দিবসকে স্মরণ করে ১৯৭৯ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে। দিবসটি বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও অপুষ্টি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম। ২০২৫ সালটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এ বছর এফএও তার ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করছে। এ বিশেষ বছরটি খাদ্যনিরাপত্তা ও টেকসই কৃষির পথে গত ৮০ বছরের সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রতীক এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন অঙ্গীকারের বার্তাবাহক। এ প্রবন্ধে আমি এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৫-এর তাৎপর্য, মূল প্রতিপাদ্য, বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপরিহার্য ভূমিকা নিয়ে পর্যালোচনা ও আলোকপাত করছি।

 

 


জাতিসংঘের ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) মধ্যে দ্বিতীয়টি হলো ‘‌ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী’। নানা কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি অর্জন করা কঠিন মনে হচ্ছে। কারণ বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ২০০ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে। বাংলাদেশে এ সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশের বেশি। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘হাত রেখে হাতে, উত্তম খাদ্য ও উন্নত আগামীর পথে’। প্রতিপাদ্যটি বিশ্বজুড়ে খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরে সরকার, রাজনৈতিক সংগঠন, সুশীল সমাজ, উৎপাদক, গবেষক, ভোক্তা এবং বিশেষ করে তরুণ সমাজসহ সবার সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর জোর দেয়। ব্যক্তিগত পর্যায়েও খাদ্য অপচয় রোধ, স্থানীয় কৃষকদের পণ্য সরাসরি বা সমবায়ের মাধ‍্যমে ক্রয় ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করে স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া আবশ্যক।

 

 


এবারের বিশ্ব খাদ্য দিবসের মূল প্রতিপাদ্যটি খাদ্য ও কৃষি সংস্থার কৌশলগত কাঠামো ‘ফোর বেটারস’র সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। এ চারটি মূল স্তম্ভ হলো—এক. উন্নত উৎপাদন: স্মার্ট প্রযুক্তি ও টেকসই পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত (উচ্চ তাপমাত্রা, তীব্র শীত, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, বন্যা ইত‍্যদি) মোকাবেলা করে কাঙ্ক্ষিত খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও সংরক্ষণ। দুই. উন্নত পুষ্টি: সবার জন্য পুষ্টিকর, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী খাদ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। তিন. একটি স্বাস্থ্যকর পরিবেশ: পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে খাদ্য উৎপাদন। চার. উন্নত জীবনযাত্রা: খাদ্য ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত প্রান্তিক কৃষকসহ সবার জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। এ ‘‌ফোর বেটারস’ একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে, যেখানে খাদ্য উৎপাদন শুধু ক্ষুধা নিবারণ নয় বরং একটি সুস্থ সমাজ এবং টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি স্থাপন করেছে। এ সংহতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে বিশ্ব খাদ্য সপ্তাহে গ্লোবাল ইয়ুথ অ্যাকশন ইনিশিয়েটিভ, সায়েন্স অ্যান্ড ইনোভেশন ফোরাম এবং হ্যান্ড-ইন-হ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ পরিচালিত হচ্ছে।

 

 

২০২৪ সালের দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (এসওএফআই-২০২৫) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা খুব সামান‍্যই কমেছে। ২০২৩ সালের ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে তা ৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা প্রায় ১৫ মিলিয়ন মানুষের ক্ষুধাহ্রাসকে নির্দেশ করে। তবে এ বৈশ্বিক পরিসংখ্যান একটি গভীর আঞ্চলিক বৈষম্যকে আড়াল করেছে। দক্ষিণ এশিয়া (অপুষ্টির হার ৭ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ) এবং লাতিন আমেরিকার মতো কিছু অঞ্চলে অপুষ্টির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষুধার হার ক্রমাগতভাবে বেড়েছে।

 

২০২৪ সালে আফ্রিকায় ২০ শতাংশেরও বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত ছিল, যার সংখ্যা ৩০৭ মিলিয়ন। এ বৈপরীত্য প্রমাণ করে বৈশ্বিক খাদ‍্যনিরাপত্তার সমস্যার সমাধানে প্রতিটি অঞ্চলের নির্দিষ্ট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও জলবায়ু-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ভিন্ন কৌশল প্রয়োজন। এসওএফআই প্রতিবেদনে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোরও খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় (ভারতকে বাদ দিলে), ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্যহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, যা বাংলাদেশেও গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এ মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও শিশু অপুষ্টি বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

 

 

২০২৫ সালের বিশ্ব খাদ্য দিবস খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিতরণের প্রতিটি ধাপে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান উদ্ভাবন এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ খাদ্য ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর, নিরাপদ পরিবেশবান্ধব ও পুষ্টিকর করে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ক. কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তন: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খাদ্য উৎপাদন ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মাটির ক্ষয় ও স্বাস্থ্যহানী, খরা, লবণাক্ততা ও অম্লতা বৃদ্ধি, ফসলের ফলন হ্রাস এবং মৎস্য, পোলট্রি ও গবাদিপশুর ওপর তাপীয় চাপ বাড়ছে। কৃষিতে রোগজীবাণুর মহামারী ও প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। খ. খাদ্যনিরাপত্তা: খাদ্যবাহিত রোগের বিস্তার রোধে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আধুনিক বিজ্ঞানের মাধ্যমে খাদ্যের মান যাচাই, দূষণ রোধ এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশে অনিরাপদ খাদ্যের কারণে অসংক্রামক রোগ যেমন ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি বাড়ছে, যা নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

 

 

সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, কৃষকরা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করলেও এর নেতিবাচক প্রভাব এতটাই শক্তিশালী যে, তা এককভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। কৃষকরা ফসলের জাত পরিবর্তন, রোপণ ও ফসল তোলার সময় পরিবর্তন এবং সারের ব্যবহার পরিবর্তন করে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু এর পরও উচ্চ গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন পরিস্থিতি বজায় থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ জলবায়ু পরিবর্তন বৈশ্বিক খাদ্যশস্য উৎপাদনকে ৮ শতাংশ কমাবে ও ২১০০ সালের মধ্যে এ ক্ষতি ২৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

 

 

এ তথ্য প্রমাণ করে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কেবল বর্তমানের সমস্যা নয়, বরং ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য একটি মৌলিক হুমকি। এটি নীতিগত পদক্ষেপ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সম্মিলিত আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। খাদ্য ব্যবস্থার এ জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। কৃষি খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন প্রচলিত কৃষিকে একটি স্মার্ট ও জলবায়ুবান্ধব খাদ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর করার এক নতুন হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত নির্ভুল কৃষি পদ্ধতি আবহাওয়া, মাটির স্বাস্থ্য ও ফসলের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে উপকরণের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে বীজ বপন, সেচ এবং কীটপতঙ্গ ও রোগজীবাণু নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, যা সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং একই সঙ্গে উচ্চ ফলন বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া কার্বন সিকুয়েস্টেশন ও কার্বন ক্রেডিট বাজারকে আরো কার্যকর করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে, যা কৃষকদের কার্বন সিকুয়েস্টেশনের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা অর্জনের সুযোগ বৃদ্ধি করছে।

 

 

গবেষণা থেকে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট তথ্যগুলো আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করে। প্রিসিশন ফার্মিং ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পানি ও ২০ শতাংশ পর্যন্ত সারের ব্যবহার কমাতে পারে এবং একই সঙ্গে ফলন ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। অন্যদিকে উল্লম্ব কৃষি ৭০ শতাংশ কম পানি ব্যবহার করে ঐতিহ্যগত পদ্ধতির তুলনায় প্রতি বর্গফুটে ১০ গুণ বেশি ফসল উৎপাদন করতে পারে। এ তথ্য-উপাত্তগুলো প্রচলিত কৃষির সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির একটি সুস্পষ্ট, পরিমাণগত তুলনা তুলে ধরে, যা প্রমাণ করে যে মূল্যবান সম্পদের ওপর চাপ কমিয়ে কীভাবে টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব।

 

 

খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের ভূমিকা কেবল গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো গবেষণাগারের জ্ঞানকে বাস্তব ও কার্যকর সমাধানে পরিণত করা। তারা নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তথ্য ও বিশ্লেষণ ভাগ করে খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও কৌশল প্রণয়নে সরাসরি সহায়তা করতে পারেন। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি ও জ্ঞান হস্তান্তর অত্যন্ত জরুরি, যাতে নতুন উদ্ভাবনগুলো দ্রুত কৃষকদের কাছে পৌঁছানো যায়। ‌ফার্মার ফিল্ড অ্যান্ড বিজনেস স্কুলসের (এফএফবিএস) মতো মডেলের মাধ্যমে এটি করা সম্ভব, যা কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এছাড়া ‘‌ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতি গ্রহণ করা অপরিহার্য, যা মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ ও পরিবেশের আন্তঃসম্পর্ককে স্বীকৃতি দিয়ে একটি সামগ্রিক সমাধানের পথ দেখায়। গবেষণার গণ্ডি পেরিয়ে নীতি ও প্রয়োগের স্তরে শিক্ষাবিদদের এ সক্রিয় অংশগ্রহণ বৈশ্বিক খাদ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী নরম্যান বোরলগের নেতৃত্বে অর্জিত সবুজ বিপ্লবের চালিকাশক্তির নিবিড় প্রয়োগে বাংলাদেশেও একটি নীরব সবুজ বিপ্লব সাধিত হয়েছে, যার ফলস্বরূপ দেশ মঙ্গা ও দুর্ভিক্ষ থেকে মুক্তি পেয়েছে। তবে সীমিত ভূমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে অজ্ঞাতসারেই আমরা মৃত্তিকা, পানি ও বাতাসসহ কৃষির ভিত্তি অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছি। এর মধ্যে মৃত্তিকা স্বাস্থ্যের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। ফলস্বরূপ, সবুজ বিপ্লবের প্রচলিত প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে এখন আর আগের মতো ফসলের ফলন বাড়ানো যাচ্ছে না। এছাড়া দ্রুত কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়া, প্রতি বছর ২০ লাখ নতুন মুখের যোগ হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতসহ অন্যান্য চ্যালেঞ্জ আগামী দিনের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত।

 

 এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় কৃষিতে নতুন জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং টেকসই প্রযুক্তির সময়োপযোগী প্রয়োগ অপরিহার্য। এটা নিশ্চিত যে, প্রচলিত ধারার কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তি দিয়ে উল্লিখিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা কষ্টসাধ্য। তাই কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণে আমূল সংস্কার আনা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া কৃষি পরিসংখ‍্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির লক্ষ‍্যে অনটাইম ডাটা সংগ্রহ এবং এআই-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ডাটা বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া চালুকরণ প্রয়োজন।

 

 

যদিও খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তার প্রায় প্রতিটি সূচকেই বাংলাদেশের অতীত সাফল্য খুবই উজ্জ্বল ছিল, তবু আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন এবং ‘শূন্য ক্ষুধা’ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছতে দেশটি বর্তমানে কয়েকটি গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। জনসংখ্যার ঘনত্ব ও শস্য চাষের নিবিড়তা—উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম থাকা সত্ত্বেও দেশে এখনো এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে, যা একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গতানুগতিক গবেষণা কৌশলে পরিবর্তন এনে ‘‌আউট অব দ্য বক্স থিংকিংয়ের’ মাধ্যমে সুপরিকল্পিত ও সমস্যাভিত্তিক গবেষণা জোরদার করা আবশ্যক। বর্তমানে কৃষি হলো জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে অগ্রসরমান শাখা, যেখানে জিনোম এডিটিং (যেমন ক্রিসপার-কাস প্রযুক্তি), ন্যানোপ্রযুক্তি, মেশিন লার্নিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বিপ্লবী প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। কৃষিকে একটি লাভজনক শিল্প বা এন্টারপ্রাইজে রূপান্তর করতে এবং ‘‌ক্লাইমেট-স্মার্ট’, উচ্চফলনশীল এক নতুন কৃষি বিপ্লবের সূচনা করতে উল্লিখিত অগ্রসরমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগের কোনো বিকল্প বাংলাদেশের নেই।

 

 

 

‘শূন্য ক্ষুধা’ (এসডিজি-২) অর্জনের পথে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাধাগুলো হলো—দুর্বল গবেষণা অবকাঠামো, উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন মানবসম্পদের অভাব এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনে পরিকল্পিত বিনিয়োগের অভাব। এ সংকটময় পরিস্থিতি উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় নীতি ও কার্যক্রমের সমন্বয় প্রয়োজন। কৃষি শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়নকে জাতীয়ভাবে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে নিম্নবর্ণিত পদক্ষেপ গ্রহণ আশু প্রয়োজন। এক. মৃত্তিকা স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার: নিবিড় চাষ ও অতিরিক্ত রাসায়নিক ইনপুট ব্যবহারের ফলে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান প্রাকৃতিক সম্পদ ‘‌মৃত্তিকা স্বাস্থ্য’ পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত জরুরি। ‘‌নেক্সট জেনারেশন ডিএনএ সিকোয়েন্সিং’ ব্যবহার করে জাতীয়ভাবে মৃত্তিকা মাইক্রোবায়োম ম্যাপিং এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে টেকসই ও জলবায়ুবান্ধব কৃষির ভিত্তি স্থাপন করতে হবে। দুই. প্রযুক্তিগত ও জীবপ্রযুক্তিগত অগ্রগতি: জিনোম এডিটিং এবং বায়োটেকনোলজির মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উচ্চফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী এবং জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত দ্রুত উদ্ভাবন করা অপরিহার্য।

 

 

এর জন্য ‘‌বাংলাদেশ ন্যাশনাল জিনোম সিকোয়েন্সিং ও ফাংশনাল জিনোমিকস’ নামে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। তিন. নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়: কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠক্রমে আমূল পরিবর্তন এনে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা এবং কৃষি, খাদ্য, মৎস‍্য, পশু-পাখি পালন, বন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও আইসিটি—এ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বিত নীতিসহায়তা নিশ্চিত করা আবশ্যক। ভূমি ব্যবহার আইনের কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষিজমি রক্ষা করা এবং গবেষণা ও উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করাই হবে ‘শূন্য ক্ষুধা’ অর্জনের মূল চাবিকাঠি। কৃষি ও খাদ‍্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার জাতীয় মিশনের সব স্তরে মেধা ও যোগ‍্যতাকে বিবেচনায় রাখতে হবে।

 

 

ড. তোফাজ্জল ইসলাম: অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো, ফুলব্রাইট, বাংলাদেশ ও বিশ্ব বিজ্ঞান একাডেমি