আরপিও সংশোধনীতে কার ক্ষতি, কার লাভ
সোহরাব হাসান [প্রকাশ: প্রথম আলো, ২৫ অক্টোবর ২০২৫]

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দ্রুত অনেক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ এখনো স্পষ্ট না হলেও বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী জোট গঠনের চেষ্টা চলছে। কোনো কোনো দল এখনই কোনো দরজা বন্ধ না করে সব দরজা খোলা রাখার কৌশল নিয়েছে।
রাজনীতিতে নীতির চেয়ে এখন কৌশলের দাম বেশি। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের ১৯৪৭ থেকে সব ঘটনার জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা কিংবা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বোচনোত্তর জাতীয় সরকার গঠনের ঘোষণা এই কৌশলেরই অংশ।
জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি তৈরির আগেই আরপিও বা জনপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে যেসব সংশোধনের প্রস্তাব নির্বাচন কমিশন দিয়েছিল, উপদেষ্টা পরিষদ বৃহস্পতিবার তার অনুমোদন করেছে। আরওপি সংশোধনীতে যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার বেশির ভাগের সঙ্গে আমরা একমত। যেমন প্রার্থীদের দেশের ভেতরে ও বিদেশে থাকা সব আয় ও সম্পদের হিসাব দেওয়া, অনিয়মের কারণে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল করা, পলাতক আসামিদের প্রার্থিতা থেকে বিরত রাখা, ৫০ হাজার টাকার বেশি চাঁদা নেওয়া হলে ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন করা। এসবের মাধ্যমে নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে ধারণা করি।
কারও বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিলের অর্থ এই নয় যে তিনি অপরাধী। অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী না নিরপরাধ; সেটি সাব্যস্ত করবেন আদালত। নির্বাচন কমিশন বা সরকার নয়।
প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করার যৌক্তিক কারণ আছে বলে মনে করি না। এর ফলে অর্থসম্পদে হীনবল মানুষেরা নির্বাচন করতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশন কি ধরে নিয়েছে, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থী ধনবান?
আরপিওর যেই সংশোধনী সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়েছে, তা হলো কেউ জোটগতভাবে নির্বাচন করলেও তাঁকে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে। এমন বিধান যুক্ত করে নির্বাচন কমিশন তো কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও দলগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। কয়েকটি উদাহরণ দিই।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের অনেকগুলো শরিক দল ছিল, যারা সবাই নৌকা প্রতীকে ভোট করেছে। ২০০১ সালে বিএনপি, জাতীয় পার্টির একাংশ, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোট জোটগতভাবে নির্বাচন করেছিল। তাদের কেউ দলীয় প্রতীকে, কেউ জোটের কোনো শরিকের প্রতীকে ভোট করেছে।
চলতি মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। সেই সংশোধনী অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে সেই ব্যক্তি জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে মহাজোট হয়েছিল, তাদের কেউ নৌকা প্রতীকে, কেউ লাঙ্গলে ভোট করেছে। এমনকি ২০১৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে থেকে জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কিছু দল ধানের শীষে ভোট করেছে। কোনো সমস্যা হয়নি। এবার সমস্যা হবে কেন? ২০১৮ সালে জামায়াতের নিবন্ধন না থাকায় তারা ধানের শীষে ভোট করেছে। এবারও যদি কোনো অনিবন্ধিত দল অন্য কোনো নিবন্ধিত দলের সঙ্গে জোট করে নির্বাচন করে, তাহলে কি তারা কোনো প্রতীক পাবে না?
দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে আপত্তি আছে বিএনপির। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো নিবন্ধিত দল জোটভুক্ত হলে জোটের যেকোনো দলের প্রতীক নেওয়ার স্বাধীনতা ছিল আরপিওর ২১ ধারায়। সেটি বাতিল করলে আমরা মানব না। কারণ, আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম, জোটভুক্ত হলে আগের যে বিধানটা ছিল, ওইটাই থাকুক।’
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন না হলে যা ঘটবে, সেটা বহন করার মতো শক্তি আমাদের নেই
তবে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের জোটগত নির্বাচনের ক্ষেত্রে নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করার বিধান অন্তর্ভুক্তিতে দ্বিমত নেই জামায়াতের। দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিটি দলের একটা নিজস্বতা আছে। দলীয় প্রতীক দলের প্রতিনিধিত্ব করে। তাই নিবন্ধিত দলগুলোর নিজস্ব পরিচয়ে যাওয়াই উত্তম।
কোনটি উত্তম ও কোনটি অধম, সেটি বেছে নেওয়ার দায়িত্ব অতীতের মতো জোটভুক্ত দলগুলোর ওপরই ছেড়ে দেওয়া হোক।
চলতি মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধনী আনা হয়েছে। সেই সংশোধনী অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধের কোনো মামলায় কারও বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হলে সেই ব্যক্তি জাতীয় সংসদ এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) অনেক নেতার বিচার চলছে। এ ছাড়া অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির বহু নেতা আত্মগোপনে চলে গেছেন, যাঁদের মধ্যে সাবেক অনেক মন্ত্রী-এমপিও রয়েছেন। তাঁদের প্রায় সবার বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে মামলা হয়েছে।
আরপিওর অনুমোদিত খসড়ায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকেও যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের মতো ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তিন বাহিনীকে নির্বাচনী দায়িত্ব দিতে আলাদা কোনো আদেশের প্রয়োজন হবে না।
বিষয়টির দুটি দিক আছে। একটি বাস্তবতা, আরেকটি আইনি। সম্প্রতি সেনাবাহিনীতে কর্মরত ১৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে, সেটি সামরিক বাহিনীর কোনো কাজে গাফিলতির জন্য হয়নি। হয়েছে তাঁদের বেসামরিক কাজে ব্যবহার করতে গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে। নির্বাচনের কাজটিও পুরোপুরি বেসামরিক। এই নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি কোনো পক্ষ সশস্ত্র বাহিনীর কোনো সদস্যকে অনিয়মে যুক্ত করে থাকে, তার জন্য যদি মামলা হয়, তাহলেও কি তাঁদের একইভাবে বেসামরিক বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে? সেনাবাহিনীর দায়িত্ব দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা ও বহিঃশক্তির আক্রমণ ঠেকানো। দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার কাজে ব্যবহার করলে তাদের নিয়ে বিতর্ক উঠবেই।
অন্যদিকে বাস্তবতা হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে অবস্থায় আছে, তাতে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন করতে পারবে না। এ অবস্থায় নির্বাচনে তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো ব্যবহার করার হয়তো বিকল্প নেই; কিন্তু এই দায়িত্ব পালনকালে তাদের নিরপেক্ষতা ও পেশাগত সততা নিশ্চিত করতে হবে। উত্তম হতো সামরিক বাহিনীকে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যুক্ত করা ছাড়াই যদি নির্বাচনের যজ্ঞটি আমরা সম্পন্ন করতে পারতাম। কিন্তু এই নির্বাচনে এটি সম্ভব না হলেও ভবিষ্যতে যাতে তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকায় নামতে না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া রাষ্ট্র ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যকর্তব্য বলে মনে করি।
সোহরাব হাসান সাংবাদিক ও কবি