আমলাতন্ত্র : সরকারের কার্যবিধিমালা ও নির্বাহী বিভাগ
সিকদার আনোয়ার [প্রকাশ: বণিকবার্তা, ২২ আগস্ট ২০২৫]

সরকারের ‘রুলস অব বিজনেস’ বা কার্যবিধিমালার বিষয়বস্তু হচ্ছে মূলত নির্বাহী বিভাগের কর্মবণ্টন ও কর্মপদ্ধতি। বলা হয়ে থাকে রাষ্ট্রের সংবিধান যেমন সব নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য, তেমনি কার্যবিধিমালা নির্বাহী বিভাগের সবার জন্য প্রযোজ্য। সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে এ কার্যবিধিমালা সব নাগরিকের জন্যই প্রযোজ্য। কারণ সেবাপ্রত্যাশীদের নির্বাহী বিভাগ সম্পর্কে ধারণা না থাকলে তারা সেবা গ্রহণের জন্য কোথায়/কার কাছে যাবেন এবং কীভাবে সেবা নেবেন?
বিধি ২৪-এর বিধান অনুযায়ী মন্ত্রিসভা বৈঠকের সব প্রসিডিংস এবং রেকর্ডপত্রাদি ২৫ বছরের জন্য গোপনীয় (Secret) হিসেবে বিবেচিত হবে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গতিশীল কার্যসম্পাদনের লক্ষ্যে ঢালাওভাবে সব প্রসিডিংস বা রেকর্ড গোপনীয় হিসেবে বিবেচনা না করে নিরাপত্তা শ্রেণীভুক্ত করে প্রয়োজনানুসারে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রাদি গোপনীয় হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
বিবিধ বিষয়াবলি পর্যায়ে বিধি ২৮-এর বিধানটিও সংশোধন দরকার। বিধিটি অনেকটা বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোর মতো। বিধানমতে, একজন সরকারি কর্মকর্তা যেকোনোভাবে দাপ্তরিক ‘যেকোনো তথ্য’ জেনে থাকুক, ক্ষমতাপ্রাপ্ত না হলে সে তথ্য অন্য কাউকে এমনকি অন্য কোনো সরকারি কর্মকর্তাকেও জানাতে পারবেন না। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের তথ্য, ক্ল্যাসিফায়েড কিংবা ননক্ল্যাসিফায়েড তার কোনো ব্যাখ্যা, সংজ্ঞা বা শ্রেণীবিন্যাস করা হয়নি অর্থাৎ সব তথ্যই এর অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে এক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা অন্য মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তাকেও যেকোনো তথ্য দিতে পারবেন না। ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন, ১৯৭৯ সালের সরকারি কর্মচারী আচরণবিধি এমনকি ১৯২৩ সালের দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইনের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অপ্রায়োগিক। এর প্রতিপালন সম্ভব নয়, কাঙ্ক্ষিত নয়, যুক্তিসংগতও নয় এবং কোথাও সম্পূর্ণরূপে প্রতিপালিত হচ্ছে না। সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারাও এখন সর্বত্র বিশেষ করে উন্নয়নমূলক তথ্য মিডিয়াসহ সবাইকে প্রদান করছেন। কিছু আইন ও বিধিমালায় সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড প্রচারের লক্ষ্যে মিডিয়ায় কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সেজন্য বিধিটির সংশোধন করা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় দলিলপত্রের নিরাপত্তা ও হেফাজতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক জারি করার কথা উপবিধি ২৮(২)-এ উল্লেখ রয়েছে। এটি অবশ্য কার্যবিধিমালার ১নং তফসিল অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দায়িত্ব। কিন্তু ক্ল্যাসিফায়েড দলিলপত্রের নিরাপত্তা ও হেফাজতের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত “Security of Classified Matters in Government Departments” অনুযায়ী সম্পাদিত হবে মর্মে নির্ধারিত আছে। বিষয়টি স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।
বিধিমালার ২৯(২)(৪) উপবিধি অনুযায়ী বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশী মিশনগুলোর নির্দিষ্ট পর্যায়ের কর্মকর্তারা যুগ্ম সচিবের অধস্তন কোনো কর্মকর্তার নিকট দাপ্তরিক প্রয়োজনে যোগাযোগ বা দেখা করতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় যে এ নিয়মনীতি কোথাও অনুসৃত হচ্ছে না। দূতাবাসগুলোর প্রথম সচিব, এমনকি প্রোগ্রাম অফিসাররা হরহামেশা দাপ্তরিক কাজে মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব থেকে শুরু করে এমনকি মন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা-সাক্ষাৎ করছেন। বিষয়ের গুরুত্ব অনুযায়ী সহকারী সচিব বা উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দূতাবাসের প্রথম সচিব বা দ্বিতীয় সচিব সাক্ষাৎ করতে পারবেন মর্মে বিধান করা যেতে পারে।
বিধি ৩২(৪) বর্ণিত বিধানানুসারে যুগ্ম সচিবের অধস্তন কোনো কর্মকর্তা দাপ্তরিক প্রয়োজনে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন না। বাস্তবে প্রতিনিয়ত মন্ত্রণালয়ের যেকোনো কর্মকর্তাকেই মন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করতে দেখা যায়। জরুরি প্রয়োজনে মন্ত্রীর নিকট বিষয়াবলি সঠিকভাবে উপস্থাপন বা ব্যাখ্যা করার জন্য অধস্তন কর্মকর্তারা সচিবের সঙ্গে বা সচিব ব্যতিরেকে মন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করেন। উপবিধি ৩২(৫)-এর ন্যায় এ উপবিধিটি সংশোধন করে বিধান করা যায় যে সচিবের অধস্তন কোনো কর্মকর্তা দাপ্তরিক প্রয়োজনে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার আগে সচিবের সঙ্গে দেখা করতে হবে এবং সচিবের সঙ্গে কিংবা সচিবের অনুমতি নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।
কার্যবিধিমালার ৩৩ বিধিটি গুরুত্বপূর্ণ যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে তার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় মনে হলে বিধিমালার ব্যত্যয় করার এখতিয়ার দেয়া হয়েছে। এটির অপপ্রয়োগের/অতিপ্রয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনায় বিধিটি বাতিল করা যেতে পারে কিংবা অন্তত কোনো কোনো পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী ব্যত্যয় করতে পারবেন তার দিকনির্দেশনা থাকা উচিত।
প্রথম তফসিল অর্থাৎ ‘বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের মধ্যে কার্যবণ্টন’টি সময় সময় পরিবর্তন হয়, দরকারও আছে। তবে কয়েকটি বিষয় কেন যে পরিবর্তনের আওতায় আসছে না বোধগম্য নয়। দুই-একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। যেমন চলচ্চিত্র নির্মাণ, আইন, অনুদান, সেন্সর বোর্ড, চলচ্চিত্র পুরস্কার, আর্কাইভ এবং চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন বিষয়টি তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বাংলাভাষা বাস্তবায়ন কোষ এবং আইন সেল থাকলেও তথ্য মন্ত্রণালয়কে আইন ও বিধি বাংলায় অনুবাদ করার দায়িত্ব দেয়া আছে।
সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত আইন বিধি প্রণয়ন, সংশোধন এবং বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি-সংক্রান্ত দায়িত্বাবলি আইএমইডিকে দেয়া হয়েছে, যা অর্থবিভাগকে দেয়া যুক্তিসংগত। অন্যদিকে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও সার্ভে বাংলাদেশকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাখা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনকে একই মন্ত্রণালয়ে রাখা হয়েছে যদিও পর্যটনকে আলাদা মন্ত্রণালয়/বিভাগ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন অনেকেই। জাতীয় শিশুনীতি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাভুক্ত, কিন্তু শিশু আইন প্রণয়ন করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি, সিটিজেন চার্টার, প্রভৃতি বিষয়গুলো কোনো মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি, যদিও এ দায়িত্বগুলো পালন করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
তফসিল ৫ অনুযায়ী সচিবালয়ে উপসচিব থেকে সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার নিয়োগ এবং যুগ্ম সচিব ও তদূর্ধ্ব কর্মকর্তার বদলি ও পদায়নের বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর নিকট উপস্থাপনের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে সব সংযুক্ত দপ্তর এবং অধস্তন দপ্তরে তৃতীয় ও তদূর্ধ্ব গ্রেডের কর্মকর্তার নিয়োগের বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রী নিকট উপস্থাপনের বিধান রয়েছে। এত অধিকসংখ্যক কর্মকর্তার নিয়োগ, বদলি পদায়নে প্রধানমন্ত্রীকে সম্পৃক্ত না রেখে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ করে প্রথম গ্রেড, বড়জোর দ্বিতীয় গ্রেড পর্যন্ত তাকে সম্পৃক্ত রাখা যেতে পারে।
আগেই বলা হয়েছে, কার্যবিধিমালাটি নির্বাহী বিভাগ পরিচালনার মূল ভিত্তি ও গাইডলাইনস। বর্তমান কার্যবিধিমালাটির প্রকৃতি অনেকাংশে রেগুলেটরি, পদ্ধতিগত দিকনির্দেশনা, যার প্রয়োজনীয়তা নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সেবাদান নিশ্চিতকরণের জন্য অপরিহার্য। কিন্তু তার সঙ্গে বিশ্বরাজনীতি, বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশ্ব বাণিজ্য কাঠামো এবং প্রযুক্তির যে দ্রুতলয় পরিবর্তন হচ্ছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্বাহী বিভাগ পরিচালনার দিকনির্দেশনা কার্যবিধিমালায় থাকা দরকার। অন্যদিকে সরকারের ভিশনগুলো অর্জন করার পূর্বশর্ত হিসেবে প্রশিক্ষিত ও ইতিবাচক মনোভাবাপন্ন জনবল, উদ্ভাবনী সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রয়োগ, আইসিটি দক্ষতার প্রসার ও প্রয়োগ এবং দুর্নীতিমুক্ত গতিশীল নির্বাহী বিভাগ গড়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দিকনির্দেশনা কার্যবিধিমালায় থাকা দরকার।
সিকদার আনোয়ার: অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও সাবেক রেক্টর, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমি