আইএমএফ ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক [প্রকাশ: খোলা কাগজ, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬]

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে একদিকে দ্রুত অগ্রগতির প্রবল আকাক্ষা রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার চাপ। এই বাস্তবতার কেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। এই সংস্থা আমাদের জন্য একদিকে আর্থিক সহায়তার উৎস, আবার অন্যদিকে কঠোর শর্ত আরোপকারী এক শিক্ষকস্বরূপ। তাদের সহায়তার সঙ্গে সঙ্গে নানা শর্ত মানার বাধ্যবাধকতাও আসে। অনেকের মতে, এই সংস্থার সহায়তা ছাড়া সামনে এগোনো কঠিন, আবার কেউ কেউ মনে করেন, তাদের শর্ত মেনে চললে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাস্তব সত্য হলো, এই দুই মতের মাঝামাঝি অবস্থানেই প্রকৃত বাস্তবতা নিহিত।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালে আইএমএফ থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি ঋণ নেয়। এই ঋণের মূল উদ্দেশ্য ছিল রিজার্ভের ঘাটতি পূরণ করা, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। কোভিড-পরবর্তী সময়, জ্বালানি সংকট এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি তখন এক কঠিন অবস্থায় ছিল। ডলার বাজারে অস্থিরতা, আমদানিতে বাধা, মুদ্রাস্ফীতি এবং রেমিট্যান্সের অনিয়মিত প্রবাহ সব মিলিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি চাপে পড়ে। আইএমএফ তখন আসে এক ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু এই সহায়তা মানে কেবল টাকা নয়, বরং পুরো নীতির দিকনির্দেশনা বদলে দেওয়া।
আইএমএফ মূলত চায় অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা। তারা মনে করে, ভর্তুকি কমাতে হবে, করজাল বাড়াতে হবে, মুদ্রানীতি বাজারভিত্তিক করতে হবে, বিনিময়হার বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনতে হবে। তাদের মতে, এই নীতিগুলো মানলে দেশের অর্থনীতি টেকসই পথে চলবে। আসলে, বিশ্বব্যাপী আইএমএফ একই মডেল অনুসরণ করে- “Fiscal discipline first, welfare later।” অর্থাৎ আগে হিসাবের ভারসাম্য, পরে মানুষের স্বস্তি।
এই পর্যায়েই বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তত্ত্বের স্পষ্ট সংঘাত দেখা দেয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি প্রধানত শ্রমভিত্তিক, আমদানিনির্ভর এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাকেন্দ্রিক। দেশের মানুষের জীবিকা অনেকাংশে ছোট ব্যবসা, কৃষি খাত ও প্রবাসী আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই প্রতিষ্ঠানের শর্ত অনুযায়ী যখন জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হ্রাস করা হয়, তখন গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পায়। এর ফলে শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আর্থিক চাপে পড়ে এবং কৃষকদের ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এর সামগ্রিক পরিণতিতে বাজারে পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী হয়, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়।
তবুও আইএমএফের কিছু দিক নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। প্রথমত, তারা অর্থনীতিতে স্বচ্ছতা আনে। রিজার্ভের হিসাব, রাজস্ব ঘাটতি এবং বাজেট পরিকল্পনায় তারা জবাবদিহি নিশ্চিত করতে চায়। দ্বিতীয়ত, তাদের কারণে সরকারকে কিছু কাঠামোগত সংস্কারের পথে যেতে হয়, যেমন কর প্রশাসন আধুনিক করা, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ কমানো এবং সুদের হার বাজারভিত্তিক করা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে আইএমএফের উপস্থিতি মানে বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি আস্থার সংকেত। যেমন, আইএমএফের ঋণ অনুমোদনের পর বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং জাইকার মতো সংস্থাগুলো নতুন করে সহযোগিতায় আগ্রহ দেখায়। এতে বাজেটে টাকার প্রবাহ কিছুটা বাড়ে এবং স্থিতিশীলতার বার্তা ছড়ায়।
তবে এর পাশাপাশি নেতিবাচক দিকগুলোও স্পষ্ট। আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে সরকারকে ধীরে ধীরে জ্বালানি, সার, বিদ্যুৎ এবং সামাজিক ভর্তুকি কমাতে হচ্ছে। এতে সমাজের নিচের স্তরের মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। একদিকে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, অন্যদিকে আয় বাড়েনি। বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ তারা সামাজিক সুরক্ষার আওতার বাইরে, আবার বাজারের বাড়তি দামের ভারও তাদের বহন করতে হয়।
সুদের হার বাজারভিত্তিক করার বিষয়টিও এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে ব্যাংকগুলো একটি নির্দিষ্ট সীমায় ঋণ দিত, ফলে ব্যবসায়ীরা কিছুটা নিশ্চিন্ত ছিল। এখন সেই সীমা তুলে দেওয়ায় ব্যাংকগুলো ঝুঁকি বিবেচনা করে সুদের হার বাড়াচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা নতুন ব্যবসায়ী ঋণ পেতে সমস্যায় পড়ছে। শিল্পখাতে বিনিয়োগের গতি কমছে, নতুন চাকরির সুযোগও কমছে। অর্থনীতি কাগজে স্থিতিশীল মনে হলেও বাস্তবে তা কিছুটা স্থবির হয়ে পড়ছে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো আইএমএফের নজর রাজস্ব আদায়ে। তারা চায় বাংলাদেশ কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াক। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের রাজাওয়ালি ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম, প্রায় ৯ শতাংশের মতো (সূত্র: Harvard Kennedz School, Rajawali Foundation, ২০২৫). তাই আইএমএফ বলছে করজাল বাড়াতে হবে। কিন্তু যদি তা হয় শুধুই চাপ দিয়ে, তাহলে তা উল্টো ফল দেয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ এখনো জটিল, যেখানে কর রিটার্ন দেওয়া অনেকের জন্য কঠিন। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী কর প্রশাসনকে আধুনিক করা জরুরি, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে করদাতাদের সেবা দেওয়ার অবকাঠামো এখনও দুর্বল।
এই অবস্থায় অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, আইএমএফের সংস্কার নীতি যদি মানবিক হয় তাহলে তা দেশের জন্য আশীর্বাদ। কিন্তু যদি তা যান্ত্রিক হয় তাহলে মানুষের জীবনে কষ্ট বাড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভর্তুকি পুরোপুরি কেটে দিলে কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অথচ খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে কৃষিকে সহায়তা দেওয়া জরুরি। তাই সংস্কার মানে কেবল কাটছাঁট নয়, বরং ভারসাম্য রক্ষা করা।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেও আইএমএফের বিশেষ নজর রয়েছে। তারা চায় খেলাপি ঋণ কমুক, ব্যাংক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আসুক এবং বোর্ড ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত হোক। এটি একদম প্রয়োজনীয়, কারণ খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ এখন ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। ব্যাংকের সুশাসন না থাকলে অর্থনীতির মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে যায়। আইএমএফ এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, যা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হতে পারে যদি তা বাস্তব প্রয়োগে রূপ নেয়।
তবে প্রশ্ন হলো, আইএমএফ ছাড়া কি আমাদের বিকল্প নেই? বাস্তবে বিকল্প আছে, তবে তা সহজ নয়। প্রথমত, নিজস্ব রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। কর প্রশাসন সহজ করতে হবে এবং ঝামেলামুক্ত রিটার্ন ব্যবস্থা আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, রেমিট্যান্সে স্থায়ী প্রণোদনা দিতে হবে যাতে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হয়। তৃতীয়ত, রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করতে হবে যাতে পোশাকের পাশাপাশি ফার্মাসিউটিক্যালস, চামড়া, কৃষিপণ্য ও আইটি খাতে নতুন বাজার তৈরি হয়। চতুর্থত, জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা দরকার। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক বা অন্য উৎস থেকে ঋণ নিলেও প্রকল্পগুলো বেছে নিতে হবে উৎপাদনশীলতার ভিত্তিতে। এমন প্রকল্প নিতে হবে যা থেকে আয় বাড়বে, যেমন রপ্তানি বৃদ্ধি বা আমদানি কমানো। বর্তমানে অনেক প্রকল্প আছে যেগুলো বৈদেশিক ঋণে চলছে কিন্তু রিটার্ন নেই। এসব প্রকল্প বন্ধ করতে হবে, না হলে ঋণ বাড়বে অথচ আয় বাড়বে না।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো নীতি ও বাস্তবতার ভারসাম্য রক্ষা করা। আইএমএফের সংস্কার প্রয়োজন, তবে তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে। দাম বাড়ানোর আগে বিকল্প দিতে হবে, কর বাড়ানোর আগে করদাতার সেবা নিশ্চিত করতে হবে এবং ঋণ নেওয়ার আগে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। মানুষ যেন নীতির ফল নিজের জীবনে দেখতে পায়, সেটিই হবে প্রকৃত সংস্কার।
সবশেষে বলা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলকে শত্রু হিসেবে দেখার যেমন সুযোগ নেই, তেমনি একে নিখুঁত বন্ধু ভাবাও বাস্তবসম্মত নয়। এটি এমন এক প্রতিষ্ঠান, যা আমাদের ভুলত্রুটি স্পষ্টভাবে চোখের সামনে তুলে ধরে, তবে সেই আয়না পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই নিতে হয়। এই প্রতিষ্ঠানের অর্থ সহায়তা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু তাদের শর্ত মানার ক্ষেত্রে চাই সুপরিকল্পনা, দূরদর্শিতা এবং যথাযথ সময় নির্বাচন। অতিরিক্ত তাড়াহুড়ো করলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, আবার অযথা দেরি করলে সম্ভাবনার দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি তার ওপর। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা প্রয়োজন, তবে সেই স্থিতিশীলতা যেন জীবনের স্বাভাবিক গতি থামিয়ে না দেয়। কারণ উন্নয়ন কেবল হিসাবের শৃঙ্খলায় সীমাবদ্ধ নয়, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক