আগামী সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
অর্জিতা সূত্রধর [প্রকাশ : দেশ রূপান্তর, ১০ জানুয়ারি ২০২৬]

বাংলাদেশের অর্থনীতি এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাগজে-কলমে কিছু সূচকে উন্নতির ইঙ্গিত মিললেও, বাস্তবে তার প্রতিফলন স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি সরকার জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। আগের বছরের তুলনায় সামান্য উন্নতি হলেও, দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্য ও কর্মসংস্থান চাহিদার তুলনায় এই প্রবৃদ্ধি যে অপর্যাপ্ত, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে অর্থনীতির এই পরিসংখ্যানের বাইরে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলছে। বাজার ঘুরে দেখলে, সাধারণ মানুষের কষ্ট চোখে পড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে; সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ ইত্যাদিও বৃদ্ধির খাতায়। কিন্তু বেতনের হার তার পুরনো সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে না। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, দেশে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে। এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করছেন, নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষ। দেশে দারিদ্র্যের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, দেশের দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সূচকের ওঠানামার আড়ালে বাস্তবে মানুষের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার কেবল কমছে না, রাজস্ব ও কর্মসংস্থান ঘাটতির কারণে ক্রমে নিচের দিকে ধাবমান।
বিশ্বব্যাংক জানায়, দিন দিন দারিদ্র্য আরও বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে নিম্ন আয়ের ঘরে মানুষের সংখ্যা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। সুতরাং কর্মসংস্থান না বাড়লে এবং আয় স্থিতিশীল না হলে, দারিদ্র্য কমানোর প্রচেষ্টা যে কাগুজে হিসাবেই আটকে থাকবে, এতে সন্দেহ নেই। দিন দিন বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ কারণে বিনিয়োগ কমছে; আবার ব্যাংকিং খাতে ঋণঝুঁকি বাড়ছে। বিএনপি-জামায়াত যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, মানুষের আস্থা ফেরানো অত সহজ হবে না। তার মতে, ‘প্রবাসীদের রেমিট্যান্স সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এটিকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ধরা যাবে না।’ এখানে রেমিট্যান্সের অঙ্ক সত্যিই উল্লেখযোগ্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে, যা তার আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সামলাতে সহায়তা করছে, তবে রপ্তানি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে কাক্সিক্ষত গতি না এলে একে অর্থনীতির স্থায়ী ভরসা বলা কঠিন। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে সংকটের মূল জায়গাটি আরও গভীরে। বিনিয়োগের স্থবিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণ সমস্যার সমন্বয়ে দেশীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অথচ তার পরও, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কিছু ব্যবস্থাপনা সমস্যা এখনো নিস্তেজ হয়ে আছে। ফলস্বরূপ, প্রাইভেট খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কম এবং বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে, যা শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি বন্ধ করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থা মুডিস ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে ‘নেগেটিভ আউটলুক’ বা নেতিবাচক পূর্বাভাসের আওতায় রেখেছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে।
বর্তমানে দেশের রপ্তানি খাতও প্রত্যাশিত শক্তি দেখাতে পারছে না। বৈশ্বিক বাজারে শুল্ক, অশুল্ক বাধা এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসী অবস্থানের কারণে রপ্তানি আয় চাপের মধ্যে রয়েছে। রপ্তানি যখন স্থবির হয়, তখন উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হয়। আর এই বাস্তবতাই এখন বাংলাদেশ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। অথচ ভেবে দেখলে, এই রপ্তানি খাত আমাদের দেশজ অর্থনীতির প্রাণ। গত বছর রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও তা এখনো লক্ষ্যমাত্রার নিচে আছে এবং ক্রমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপও বাড়ছে। বৈদেশিক বাণিজ্যে চ্যালেঞ্জ থাকায় রপ্তানি খাতের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য এক জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। আবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কর্মসংস্থানের সংকট। শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ হার কমছে, কিছু খাতে চাকরি হারানোর প্রবণতা বাড়ছে; সেই সঙ্গে তরুণদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না বললেই চলে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, কর্মসংস্থান হার নেমে এসেছে ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশে, যা ভবিষ্যৎ জনশক্তি ব্যবস্থাপনার জন্য বেশ উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। এই প্রেক্ষাপটে আসন্ন নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতির সংখ্যার বাইরে মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা। শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর চেষ্টা যথেষ্ট নয়। রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করা, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কার্যকর নীতি গ্রহণই হতে হবে সরকারের মূল লক্ষ্য।
নতুন সরকারের জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, সেগুলো নিঃসন্দেহে বহুস্তরীয় ও জটিল। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, নবনির্বাচিত সরকারকে দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ সংকোচন, রপ্তানি চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ হ্রাস, দারিদ্র্য ও জ্বালানি-পরিবেশগত ঝুঁকি সব একসঙ্গে সুষ্ঠুভাবে মোকাবিলা করতে হবে। তবে যথার্থ নীতিমালা প্রণয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন, শক্তিশালী প্রশাসন গঠন ও সুষ্ঠু অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সবকিছু যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করা সম্ভব। বিশেষ করে যদি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসে, তবে এটি দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটি ঐতিহাসিক সময় হতে পারে। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের উন্নয়ন আর কোনো একক খাতের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। একটি খাত দুর্বল হলে তার প্রভাব অন্য সব খাতেই পড়ে। তাই পরিকল্পনা প্রণয়ন নয়, বরং বাস্তবায়নই এখন মূল পরীক্ষা। দেশের আগামী রাজনৈতিক সরকার যদি শক্ত হাতে এই কঠিন পরীক্ষা মোকাবিলা করে উত্তীর্ণ না হতে পারে, তবে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি কেবল পরিসংখ্যানের পাতায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। তখন হয়তো নতুনভাবে উন্নয়নের সংজ্ঞা নির্ধারিত হবে। কিন্তু আমাদের চাওয়া তা নয়। সব রাজনৈতিক দলের কাছে আন্তরিক আহ্বান থাকল পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য ঐক্যবদ্ধ হোন। সততার সঙ্গে সবাইকে নিয়ে দেশটা গড়ে তুলুন।
লেখক : শিক্ষার্থী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়