
আদিবাসী পরিচয়ের দোলাচলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী
এইচ আর খান [সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১১ আগস্ট ২০২৬]
বাংলাদেশ বহু জাতির, বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতির বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি দেশ। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি ছাড়াও এ দেশে ৪৫টিরও বেশি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছে, যার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১১টি গোত্র বাস করে। বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোকে উপজাতি, নৃগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা সম্প্রদায় হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। তবে সম্প্রতি দেশি ও বিদেশি স্বার্থান্বেষী একটি চক্র তাদের ভূরাজনৈতিক নীলনকশা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এই জনসম্প্রদায়গুলোকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠেপড়ে লেগেছে। সে লক্ষ্যে তারা কিছু অপতৎপরতাকামী বেসরকারি সংস্থা ও ধর্মীয় মিশনারিজকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করছে। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো নৃতাত্ত্বিক, জাতিতাত্ত্বিক, ভাষাতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনোভাবেই আদিবাসী নয়।
‘আদিবাসী’দের সংজ্ঞায়িত করা ও তাদের অধিকার নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক চলমান। এমনকি জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসীদের বিষয়ে আলোচনার পরও সব দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনো সংজ্ঞায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। তবে প্রখ্যাত নৃতাত্ত্বিক মর্গ্যানের মতে, আদিবাসী হচ্ছে ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ার অনড়ৎরমরহ, নিউজিল্যান্ডের মাওরি, রাশিয়ার মেনেট, জাপানের আইনু, ফ্রান্স ও স্পেনের বাসকু, দক্ষিণ আমেরিকার ইনকা ও মায়ান, আরবের বেদুইন প্রভৃতি যারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত ও সুপরিচিত। তবে জাতিসংঘের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানInternational Labour Organisation (ILO)-Gi Indigenous and Tribal Population Convention 1957 (No 107) I
1989 (No 164) ও ১৯৮৯ (ঘড় ১৬৪)-এ আদিবাসীকে সংজ্ঞায়িত করে বলা হয়েছে, ‘যেসব জনগোষ্ঠী একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস করছে বা অধীকৃত হওয়া অথবা উপনিবেশ সৃষ্টির আগ থেকে বসবাস করছে এবং যারা তাদের কিছু বা সব নিজস্ব সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো ধরে রাখে তারা আদিবাসী বলে গণ্য হবে।’ একই সঙ্গে সনদ দুটিতে উপজাতিদেরও সংজ্ঞায়িত করে বলা হয়েছে, ‘একটি দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অন্যদের চেয়ে অনগ্রসর এবং যারা তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য কৃষ্টি আইন অথবা বিশেষ আইন দ্বারা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পরিচালিত তারা উপজাতি বলে গণ্য হবে।’ এই সংজ্ঞা অনুযায়ী উপজাতি ও আদিবাসীর মধ্যে মূল পার্থক্য হলো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রে বংশানুক্রমে বসবাস বা অধীকৃত হওয়া বা উপনিবেশ সৃষ্টির আগ থেকে বসবাস করা।
অন্যদিকে ৯ আগস্ট ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘের ঐচ্ছিক প্রতিষ্ঠান, ‘Working Group on Indigenous People’-এর রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘের ৬১তম অধিবেশনে (১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭)United Nations Declaration on the Rights of Indigenous People (UNDRIP) বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র অনুমোদিত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের এই ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম অধিবেশনের দিনটিকেই (৯ আগস্ট) ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে UNDRIP-এর ঘোষণাপত্রটিতে আদিবাসীদের নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা না হলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য অকল্পনীয় অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। যার মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, স্বায়ত্তশাসন অধিকার, ভূমি অধিকার, সামরিক অধিকার তথা এসব অধিকার নিশ্চিতকল্পে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ পাওয়ার অধিকার অন্যতম। আর মূল সমস্যাটা এখানেই।
জাতিসংঘের এ ঘোষণাপত্রটি মূলত গৃহীত হয়েছে বিশ্বের স্বীকৃত সুবিধাবঞ্চিত ও বিভিন্ন সময়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের দ্বারা নির্যাতিত আদিবাসীদের (Aborigin, রেড ইন্ডিয়ান, মাওরি প্রভৃতি) অবস্থা উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিতে। তবে বাস্তবতা হলো, ঘোষণাপত্রটিতে অবাস্তবায়নযোগ্য অধিকার সংযোজনের ফলে উত্থাপনের সময়ই যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ চারটি দেশের বিপক্ষে ভোট দেয়, বাংলাদেশসহ ১১টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে ও ৩৪টি দেশ অনুপস্থিত থাকে। তাই বাস্তবতার নিরিখে যেকোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে ঘোষণাপত্রটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
এবারে আসা যাক, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ১১টি জাতিগোষ্ঠীর বিষয়ে। নৃতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক বা অন্য কোনো বিচারেই পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশের আদিবাসী নয়। কারণ একটি অঞ্চলের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির জন্য অপরিহার্য তিনটি বিষয় ‘স্মরণাতীতকাল’ ‘বংশানুক্রম’ ও ‘উপনিবেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকে বসবাস’-এর কোনোটিই আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো পূরণ করে না। বরং পার্বত্য চট্টগ্রামে এদের বসবাসের ইতিহাস ৩০০ বছরের নিচে। এরা ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুর, বার্মার (বর্তমানে মিয়ানমার) আরাকান ও চীন প্রদেশ, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আনুমানিক ১৭৩০ সালের পর থেকে বিভিন্ন যুদ্ধে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় গ্রহণ করে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. আবদুর রব, অধ্যাপিকা ড. খুরশীদা বেগমের মতো বিশিষ্ট গবেষকরা স্পষ্টভাবে তাঁদের লেখনীতে উল্লেখ করেছেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনন্দ বিকাশ চাকমা তাঁর ‘কার্পাস মহল থেকে শান্তি চুক্তি’তে উল্লেখ করেন, ‘তারা আদিবাসী না, তারা পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে এ দেশে আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করে বসতি স্থাপন করেছে। তাদের অধিকাংশেরই আদিনিবাস বার্মা ও বার্মার চম্পক নগর।’ এমনকি ব্রিটিশ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম জেলা প্রশাসক Captain Thomas Herbert Lewin-এর মতে, ‘A greater portion of the hill tribes, at present living in CHT hills, undoubtedly came about two generations ago from Arakan. This is asserted both by their own traditions and by records in the Chittagong Collectorate.’
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা করিবেন।’ সংবিধানের আলোকে বাংলাদেশে আদিবাসীর কোনো অস্তিত্ব নেই। একই সঙ্গে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে (CHT Agreement) পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘উপজাতি’ অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবেই পার্বত্যবাসীর পক্ষে জনসংহতি সমিতির চেয়ারম্যান সন্তু লারমা স্বাক্ষর করে উপজাতি পরিচয়টি মেনে নিয়েছেন। চুক্তির ‘খ’ খণ্ডের ১ নম্বর ধারায় পার্বত্য জেলা পরিষদের আইনে উপজাতি শব্দটি বলবৎ থাকবে মর্মে উল্লেখ রয়েছে। এমনকি সর্বশেষ ২৮ জানুয়ারি ২০১০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বিভিন্ন উপজাতির সম্প্রদায়কে কোনো অবস্থাতেই যেন উপজাতির পরিবর্তে আদিবাসী হিসেবে উল্লেখ করা না হয়, সে বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশনা জারি করে।
এত সব দালিলিক প্রমাণ থাকার পরও স্বভাবতই মনে প্রশ্ন আসে, তাহলে হঠাৎ করে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়ার অপপ্রয়াস কেন? মূলত দেশি ও বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহল তাদের ভূরাজনৈতিক নীলনকশা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে আদিবাসী হিসেবে ঘোষণা, প্রচার ও প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে সুনিপুণ কৌশলে। যেখানে উন্নত অনেক দেশই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে জাতিগত নিধনের মাধ্যমে (Ethnic Cleansing) নিজস্ব দেশের স্বীকৃত আদিবাসীদের প্রায় নির্মূল করে দিয়েছে সেখানে ‘আদিবাসী সংরক্ষণ’ (Conservation of Aboriginals)-এর অজুহাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। একটি বৃহৎ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই এই অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে বিভিন্ন ধর্মীয় মিশনারির মাধ্যমে ধর্মান্তর করা হচ্ছে।
যার চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হতে পারে, ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তসংলগ্ন একই জাতি গোষ্ঠীর আবাস ভূমি নিয়ে ধর্মীয় ছত্রছায়ায় একত্র করে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তাই এটা স্পষ্ট আদিবাসী পরিচয়টি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের কোনো চাওয়া নয়, বরং স্বার্থান্বেষী মহলের সঙ্গে যোগসাজশে বৈদেশিক প্রভু শ্রেণির একটি বিশেষ ষড়যন্ত্র (Secret Conspiracy)। তাই দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এ ব্যাপারে আমাদের সবারই সজাগ দৃষ্টি রাখা একান্ত প্রয়োজন।



